kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

রবিনহুডের শহরেও সাকিবে চোখ সবার

সাইদুজ্জামান, নটিংহাম থেকে   

২০ জুন, ২০১৯ ১০:১০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রবিনহুডের শহরেও সাকিবে চোখ সবার

এমন একক ব্র্যান্ডিং আর কোথাও চোখে পড়েনি! ব্রিটিশ পাউন্ড স্টার্লিং নোটের গায়ে রানি এলিজাবেথের একচ্ছত্র আধিপত্যের সঙ্গেই তুলনীয় নটিংহামের রবিনহুড। বিশ্বকাপের বাংলাদেশ দলে যেন ঠিক তেমনটাই সবাই দেখছেন সাকিব আল হাসানের প্রভাব-প্রতিপত্তিকে। গতকাল মাশরাফি বিন মর্তুজাকে তো একজন বলেই ফেললেন, ‘বাংলাদেশকে ওয়ানম্যান আর্মি মনে হচ্ছে।’

চার ম্যাচে ৩৮৪ রান আর ৫ উইকেট নেওয়া সাকিবকে কলকাতার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার দীপ দাশগুপ্ত ‘বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা’র মর্যাদা দিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য এ নিয়ে খুব বেশি তর্কের সুযোগও নেই। মাশরাফি নিজেও সাকিব প্রসঙ্গে একই কথা বলেন, গতকালও বলেছেন, ‘সাকিব সব সময়ই স্পেশাল।’ বিশ্বকাপপূর্ব প্রস্তুতি থেকে শুরু করে মাঠের নৈপুণ্যে এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন যে সাকিবময় বাংলাদেশকেই দেখছে ক্রিকেট বিশ্ব।

এসব পরিস্থিতিতে একটা আবহ তৈরি হয় দলে, সাকিবের একটি বাজে দিনে আবার ভড়কে যাবে না তো বাংলাদেশ? মাশরাফি তখন মনে করিয়ে দেন, ‘আমি বাংলাদেশ দলকে মোটেও ওয়ানম্যান আর্মি মনে করি না। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচেই তামিম আর সৌম্য ভালো শুরু দিয়েছে। লিটন দুর্দান্ত ব্যাটিং করেছে। সাইফউদ্দিন শুরুতে উইকেট নিয়েছিল। আর এক ওভারে মুস্তাফিজ ওই দুই উইকেট না নিলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংস আরো বড় হতো। মিরাজও ভালো বোলিং করছে। মুশফিকের দুটি ভালো ইনিংস আছে। আসলে সাকিব এক্সট্রাঅর্ডিনারি খেলছে বলেই এমনটা মনে হচ্ছে। প্রয়োজনের সময় দায়িত্ব নেওয়ার জন্য সবাই তৈরি। শারীরিক ও মানসিকভাবে সবাই ফিট আছে।’

আসলে নেই। টন্টন থেকে ফেরার আগেই মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন অনুযোগ করেন যে তাঁর পিঠে ব্যথা। সেই ব্যথা নিয়েই নাকি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বোলিং করেছিলেন এই অলরাউন্ডার। যদিও দল সংশ্লিষ্ট কেউ ম্যাচ চলাকালে তাঁর ব্যথা পাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হননি। তবে একই ম্যাচে ফিল্ডিংয়ের সময় কাঁধে চোট পেয়েছিলেন মোসাদ্দেক হোসেন। এঁদের দুজনের কেউই আসেননি গতকালের অনুশীলনে। বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, সাইফউদ্দিনকে ফিট করে তোলার ‘চেষ্টা’ আজও চালিয়ে যাবে টিম ম্যানেজমেন্ট। তবে মোসাদ্দেকের খেলার সম্ভাবনা কম। তাতে বিশ্বকাপ ম্যাচ পেতে যাচ্ছেন সাব্বির রহমান।

তবে এসব তো নটিংহামের নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নিছকই প্রাসঙ্গিক ব্যাপার। এখানকার নগরবাসীরা বিশ্ববিদ্যালয় টাউন হিসেবে গর্ব করে। তবে রেলস্টেশন থেকে সিটি সেন্টার, স্যুভেনির শপ, পাব থেকে ব্যাংকের এটিএম বুথ—সর্বত্রই যেভাবে ‘গরিবের বন্ধু’ রবিনহুডকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তাতে নটিংহামের নামটা শেরউড ফরেস্ট হলেই বেশি মানানসই হতো! তীরন্দাজ রবিনহুডকেই চোখে ভাসে সবার। তবে তিনি তলোয়ারবাজিতেও দক্ষ ছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রের অলরাউন্ডার আর কি!

বাংলাদেশ দলেও নটিংহাম ইউনিভার্সিটির মতো নামিদামি প্রতিষ্ঠান কিংবা ইংল্যান্ডের সবচেয়ে পুরনো পাবের মতো উল্লেখযোগ্য ক্রিকেটার আছেন। কিন্তু গত চার ম্যাচে সাকিবের প্রভাবশালী নৈপুণ্য ক্রিকেট ইতিহাসবিদদের ‘মিথ’ রচনার উপাদান জোগান দিয়ে থাকবে। অবশ্য এ ‘মিথ’ রবিনহুডেরটির মতো গোলমেলে হবে না। কারণ রবিনহুড বাস্তবে ছিলেন নাকি নিছকই কল্পকাহিনি, তা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। বাংলাদেশ দল এখানকার যে পার্ক প্লাজা হোটেল আছে, সেটি মেইড ম্যারিয়ান স্ট্রিটে। সড়কের নামকরণ যাঁর নামে, তিনি রবিনহুডের কথিত স্ত্রী কিংবা বান্ধবী। যদিও এর ঐতিহাসিক সত্যাসত্য নেই।

২০১৯ বিশ্বকাপের সাকিব আল হাসানের চোখ ধাঁধানো অলরাউন্ড নৈপুণ্য নিয়ে অবশ্য কোনো ধোঁয়াশা নেই। ইনজুরির কারণে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় ফাইনাল খেলা হয়নি। তবে সেই থেকে নিরন্তর অনুশীলন করে চলেছেন তিনি। বিশ্বকাপে চারটা ম্যাচে দাপট দেখিয়েছেন। সবশেষটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২ উইকেট নেওয়ার পর ম্যাচ জেতানো সেঞ্চুরির পথে বারবার ‘ক্র্যাম্পে’র জন্য শুশ্রূষা নিয়েছেন ফিজিওর কাছ থেকে। তাতে মনে হচ্ছিল গতকালের ঐচ্ছিক অনুশীলনে সাকিবের আবির্ভাব ঘটবে না ট্রেন্ট ব্রিজে। কিন্তু কিসের কী? বোলিং-ব্যাটিং—সবই করেছেন নিয়মমাফিক।

হয়তো একটু বেশিই। যত বড় প্রতিপক্ষ তত বড় চ্যালেঞ্জ। আর যত বড় চ্যালেঞ্জ তত ভালো খেলার নেশায় পেয়ে বসে বড় ক্রিকেটারকে।

সাকিব আল হাসানকে আজকাল দেখেটেখে আর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মাশরাফি ‘ওয়ানম্যান আর্মি’ তত্ত্বে বিশ্বাস না-ই করতে পারেন। তবে সাকিব যে বিশ্বকাপে ‘ম্যান অন আ মিশন’, এটা নিয়ে তাঁর এবং পুরো দলেরই কারোর কোনো সংশয় নেই। অন্য কারোর আছে বলেও শোনা যায়নি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা