kalerkantho

বুধবার । ২৪ জুলাই ২০১৯। ৯ শ্রাবণ ১৪২৬। ২০ জিলকদ ১৪৪০

আমাদের চারে না থাকাই দুঃখজনক : মাশরাফি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৯ জুন, ২০১৯ ১০:০২ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



আমাদের চারে না থাকাই দুঃখজনক : মাশরাফি

বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের স্বপ্ন বাঁচিয়ে হোটেলে ফিরেছেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই তিনি হাজির বিদেশ সফরে অবধারিত সন্ধ্যাকালীন আড্ডায়। তারই এক ফাঁকে টন্টনের হলিডে ইন হোটেলের লবিতে কালের কণ্ঠের সাংবাদিক সাইদুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলেছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। মনের তালা খুলে দিয়ে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। একবার গর্বে উজ্জ্বল অধিনায়ক পরক্ষণেই আক্ষেপে পুড়েছেন ইংলিশ সামারের রোদ-বৃষ্টির মতোই— 

প্রশ্ন : বাংলাদেশের সেমিফাইনাল সম্ভাবনা এখন কতটা?

মাশরাফি বিন মর্তুজা : খুব কঠিন সমীকরণ। নিউজিল্যান্ড ম্যাচ জিতলে হয়তো কিছুটা সহজ হতো। এখন ১১ পয়েন্ট পেলেও আপনি নিশ্চিত না। সেই সঙ্গে রান রেটের ব্যাপারও আছে। প্রথমত সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়ে গেছে নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরে। দ্বিতীয় ক্ষতি শ্রীলঙ্কা ম্যাচটি না হওয়া। তার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়ে গেছে ভারত-নিউজিল্যান্ড ম্যাচটি ভেসে যাওয়ায়। ভারত যেমন ফর্মে আছে, তাতে ম্যাচটি হলে নিউজিল্যান্ড হারতেও পারত। হারলে ওদের রান রেটেও প্রভাব পড়ত। কিন্তু ম্যাচ না হওয়ায় ১ পয়েন্টও পেয়েছে, আবার রান রেটও স্থিতিশীল থেকে গেছে। আমরা এই ম্যাচে (ওয়েস্ট ইন্ডিজ) ৪১ ওভারে ৩২২ রান করেও রান রেট কিন্তু প্লাসে আনতে পারিনি। আমরা যদি এরপর চার ম্যাচের তিনটিতেও জিতি এবং নিউজিল্যান্ড পাঁচটির দুটিতে, তাহলে পয়েন্ট ১১ হবে। রান রেটে তখন ওরাই এগিয়ে যাবে। এদিকে ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের যাদের সঙ্গে ম্যাচ আছে, ওদের সেমিতে যাওয়া তো মোটামুটি নিশ্চিতই। বিশ্বকাপের আগে থেকে একটি জায়গা নিয়েই কথা হচ্ছিল। যেটি নিয়ে লড়াই নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের। নিউজিল্যান্ড ম্যাচটি জিতে থাকলে আমাদের পয়েন্ট হতো ৭ আর ওদের ৫। আমরা তাহলে সেফ জোনেই থাকতাম। এখন সুযোগ যে নেই, তাও বলব না। নিউজিল্যান্ড তো হারতেও পারে। আমরা দেখা গেল বাকি সব ম্যাচ জিততেও পারি। কাজেই এটি বলব না যে সুযোগ নেই। অধিনায়ক হিসেবে তো আরো বলব না। আপনাকে তো বড় দল আরেকটিকে হারাতেই হবে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ বাকি চারটি ম্যাচ জিতলে তো আর কোনো চিন্তাই নেই।

মাশরাফি : না, এরপরও থাকে। অস্ট্রেলিয়ার ৮ পয়েন্ট। ইংল্যান্ড এরপরও আরো চারটি ম্যাচ জিতবে। ভারতের মতো ওদেরও ১৪-১৫ পয়েন্ট হয়ে যাবে। এখন নিউজিল্যান্ডেরও যদি ১৩ পয়েন্ট হয়ে যায়, তাহলে তো আপনার সমান পয়েন্ট পেয়ে কোনো লাভই নেই। কারণ ওরা রান রেটে অনেক এগিয়ে। যদি না ওরা দেড় শ রান করে হারে। এসব উইকেটে সেই সুযোগও খুব কম। আর ওদের ম্যাচও বাকি ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে।

প্রশ্ন : ওয়েস্ট ইন্ডিজকে এভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া জয়ের পর চারটি ম্যাচ জেতার আত্মবিশ্বাস কি আছে?

মাশরাফি : আত্মবিশ্বাস না থাকার কোনো কারণ নেই। তবে আবার চার ম্যাচের দিকে তাকালেও কঠিন মনে হয়। এখন একটা করে ম্যাচ ধরে ধরে এগোনো ছাড়া উপায় নেই। এখন সমীকরণ এমন দাঁড়িয়েছে যে আমাদেরও জিততে হবে এবং একই সঙ্গে এই দোয়াও করে যেতে হচ্ছে, নিউজিল্যান্ডও যেন হারে (হাসি...)। আমাদের সুবিধার্থেই। একটি করে ম্যাচ খেলতে হবে আর ওদিকে নিউজিল্যান্ডের দিকেও চোখ রাখতে হবে।

প্রশ্ন : জেতার কথা ভাবার পাশাপাশি এই চাপও কি আছে যে রান রেটও ঠিক করতে হবে?

মাশরাফি : আজও (ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে) যেমন ২৫০ বা ২৬০ রানের সময় বার্তা পাঠানো হয়েছিল ম্যাচটি তাড়াতাড়ি শেষ করে আসার। সেটি রান রেটের জন্যই। পরিস্থিতি তৈরি হলেই না রান রেট বাড়ানোর কথা ভাবা যায়। কিন্তু ম্যাচের টান টান অবস্থা হলে তো সেই সুযোগ থাকে না। আর ম্যাচের আগে তো রান রেটের কথা ভাবা যায় না। পরিস্থিতি এলেই শুধু রান রেট নিয়ে চিন্তা করা যায়।

প্রশ্ন : সাকিব আল হাসান যে ফর্মে আছেন, অধিনায়ক হিসেবে এমন একজন খেলেয়াড়কে পাওয়া কতটা স্বস্তির? বা এবার তাঁর মধ্যে বিশেষ কোনো কিছু চোখে পড়ছে কি না?

মাশরাফি : সাকিব সব সময়ই স্পেশাল। বাংলাদেশ দলের হয়ে এমন কোনো দিন নেই যে ও স্পেশাল ছিল না। আমার বরং ওর জন্যই খারাপ লাগছে। নিউজিল্যান্ড ম্যাচে যদি মুশফিক রান আউট হয়ে না যেত। কিংবা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে না হয়ে ওর সেঞ্চুরিটা যদি নিউজিল্যান্ড ম্যাচেই হতো। এসব ‘যদি-কিন্তু’ এখন আমার মাথায় আসছে। সেঞ্চুরিটা ওই দিন হলেই আমাদের ২৮০-২৯০ রান হয়ে যায়। যদিও সবই ওর একার দায়িত্ব নয়। ও একা দলকে সেমিফাইনালে ওঠাতে এখানে আসেনি। অন্যরাও যদি আরেকটু অবদান রাখত। আজকে যেমন ওর সঙ্গে ব্যাটিংয়ে অন্যরাও অবদান রেখেছে। আবার আমাদেরও কিছু দুর্ভাগ্য আছে। নিজেদের ভুলেই আমরা নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরেছি। সেই ভুল স্বীকার করে নিয়েই বলছি, এ জয়ের পর ওদের বিপক্ষে খেলতে হলে আমরা অন্য রকম আত্মবিশ্বাস নিয়েই নামতে পারতাম।

প্রশ্ন : এই দলে প্রতিভার অভাব নেই। সবাই বিশ্বকাপ সামনে রেখে প্রস্তুতিও নিয়েছে। কিন্তু সাকিবের সঙ্গে অন্যদের পার্থক্যটা কোথায়?

মাশরাফি : মানসিকতা। মানসিকভাবে ও ভীষণ শক্ত। তা ছাড়া ও জানে যে ওর সাফল্যের সম্ভাবনাও অনেক বেশি। কারণ ব্যাটিং আর বোলিং—দুটিতেই অবদান রাখার সুযোগ আছে। নিজের ওপর আস্থা রাখে। আর আইপিএলে থাকার সময় থেকেই আলোচনা হচ্ছিল যে ওকে তিনে খেলানো হবে। এ জায়গার জন্য সে নিজেকে সেভাবেই তৈরি করেছে। সেই সঙ্গে ভাগ্যও সঙ্গে ছিল ওর। সব কিছুই ওর অনুকূলে যাচ্ছে। আশা করছি, সেটি অব্যাহতও থাকবে। প্রস্তুতির দিক থেকে ওর সঙ্গে হয়তো অন্যদের তেমন পার্থক্য নেই। কিন্তু মানসিকতার জায়গায় পার্থক্য বিশাল। সে দুই ম্যাচে দ্রুত আউট হয়ে গেলেও পরেরটিতে নেমে নিজের ন্যাচারাল খেলাই খেলত। অন্যরা হয়তো এ ক্ষেত্রে নিজেকে একটু গুটিয়ে রাখার কথা ভাবত। কিন্তু সাকিব জানে, ‘এটিই আমার ব্যাটিং। আমাকে এভাবেই রান করতে হবে।’

প্রশ্ন : তামিম তো এ ম্যাচে ভালো শুরু পেলেন। আপনার কি মনে হয়, তাঁর ক্ষেত্রে ভাগ্য অনুকূল নয়?

মাশরাফি : সাকিবের ইনিংসে তবু দু-একবার একটু এদিক-সেদিক হয়েছে; কিন্তু তামিমের ৪৮ রানের ইনিংসটি ছিল নিশ্ছিদ্র। একটি সুযোগ ছিল, তাতেই পায়ের পাশ দিয়ে বল ঢুকে রান আউট হলো। ভাগ্য সহায় না হলে অনেক ব্যাটসম্যান দুমদাম মেরে দ্রুত কিছু রান আগে তুলে ফেলতে চায়। তামিম সেটিও করছে না। তার মানে ও ধৈর্য ধরছে। অর্থাৎ সে প্রক্রিয়ার মধ্যেই আছে। আজকে ওর সব কিছুই ঠিক যাচ্ছিল; কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি।

প্রশ্ন : মাঝখানে তো আপনার পারফরম্যান্স নিয়েও মানুষ অধৈর্য হয়ে পড়েছিল। এ ম্যাচে আপনার অন্য রকম বোলিংয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ঝড়ের কোনো প্রভাব আছে?

মাশরাফি : কথাবার্তায় আমাকে বদলানোর সুযোগ নেই। ওটা আমাকে বদলায়ওনি। এটিই আমার ন্যাচারাল বোলিং। বাইরের কথা নিয়ে ভাবলে আজ প্রথম বলটি আমি জায়গায়ই ফেলতে পারতাম না। প্রথম স্পেলে আমি দুটি উইকেট পেতেই পারতাম। কিন্তু ভাগ্য ছিল না। আমি চেষ্টা করি রান আটকে রাখার। প্রথম ৫ ওভারে ৯ রান দিয়েছি। ধরুন, আজ ওরা ভালো শুরু পেলে কিন্তু রান হয়ে যেতে পারত ৩৬০-ও। তা হয়নি। আবার কেউ বলবে না যে এই ম্যাচে বাংলাদেশের সেরা বোলার মুস্তাফিজ। কিন্তু আমি বলব সাকিবকে যতখানি কৃতিত্ব দিচ্ছেন, এর সমান প্রাপ্য মুস্তাফিজেরও। ও সেই সময় দুটি উইকেট না নিলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩৮০ রান করে ফেলে! ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পগুলো এভাবেই তৈরি হয়। যেটি মুস্তাফিজ তৈরি করেছে। গেম চেঞ্জার হিসেবে ব্যাটিংয়ে দুজনের নাম তো আপনি বলবেনই। তার আগে বোলিংয়ে গেম চেঞ্জার মুস্তাফিজই। বোলিংয়ের পাশাপাশি এদিকে আবার আমি অধিনায়কও। মাঠে ফিল্ড প্লেসিং থেকে শুরু করে কাজ তো কম নয়। টস জিতলে কী করব, সেটি নিয়েও সমস্যা আছে আমাদের। দল নির্বাচন নিয়েও আছে সমস্যা। এত কিছু মাথায় নিয়ে কাজ খুব সহজও নয়। অনেকে ভাবে বাংলাদেশের অধিনায়কত্ব না জানি কত সহজ! আবার প্রত্যাশার জায়গাও আছে। ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে পাঁচ কোটি টিভিতে খেলা দেখছে। আরো পাঁচ কোটি খেলা না দেখলেও খবর রাখছে। অধিনায়ক হিসেবে আমার প্রথম ভূমিকা দলকে জেতাতে হবে। জেতার বিশ্বাস আমাকে এবং আমার দলকে রাখতে হবে। দ্বিতীয় ভূমিকা খেলোয়াড় হিসেবে। আমাদের আবার এমন কিছু সমস্যা আছে, যেগুলো অন্য কোনো দলে নেই। এসব আপনারাও জানেন, আমিও জানি।

প্রশ্ন : বিশ্বকাপের আগে ৩৫০ রানের সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়েছে অনেক। এটি কি আতঙ্কের ছিল?

মাশরাফি : আমার কথা হলো, ‘যে রকম দেশ, সে রকমই বেশ।’ আমাদের দেশের উইকেট তো এখানে না। এখানে এ রকমই রান হবে। শুরুতে আমি একটু কনফিউজড ছিলাম অবশ্য। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৩০ রান করার পর আর কোনো দ্বিধা নেই। কারণ প্র্যাকটিক্যালি কোনো কিছু করার চেয়ে বড় আত্মবিশ্বাস আর কিছু হয় না। এখন যেমন সামনে অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ। নিজেদের মধ্যেই আলোচনা হচ্ছে যে ‘ওদের ৩১০-৩২০ রানের মধ্যে আটকাও আগে, তারপর দেখা যাবে...।’

প্রশ্ন : বিশ্বকাপের মাঝামাঝি সময়ে ১০টি দলের মধ্যে আপনারা পঞ্চম স্থানে আছেন। বিশ্বকাপ শুরুর সময় কি এটি ভেবেছিলেন?

মাশরাফি : সত্য কথা বললে আমি আমার দলকে চারেই দেখেছিলাম। আমার বরং এই ভেবে খারাপ লাগছে যে আমরা চারে নেই কেন! চারে না থাকাই আমার জন্য দুঃখজনক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা