kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

ছোট মাঠে বড় স্বপ্ন

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৭ জুন, ২০১৯ ০৯:১৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ছোট মাঠে বড় স্বপ্ন

সেমিফাইনালের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আজ জিততেই হবে বাংলাদেশকে। দলের সেরা তারকা সাকিব আল হাসানের সঙ্গে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা সে নিয়েই হয়তো কৌশল আঁকছেন। ছবি : মীর ফরিদ

কুপারস অ্যাসোসিয়েটস কাউন্টি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের তিনতলা প্রেসবক্সে বসে একটু ভয়ই হচ্ছে, বোলারের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে এসে যদি বল পড়ে! ক্রিস গেইল লং অফ দিয়ে ছক্কা হাঁকালে টন্টনের প্রেসবক্স আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, যেখানে মাশরাফি বিন মর্তুজাও মনে করছেন যে ক্যারিবীয়দের মিস হিটও ছক্কা হতে পারে।

টন্টনের এই ছোট মাঠেই বড় স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। চার ম্যাচে ৩ পয়েন্টে সেমিফাইনালে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই। বরং আজ টন্টনে জিততে না পারলে ৬ জুলাই দেশে ফেরার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া বাংলাদেশের দলের শুরু হয়ে যাবে বলেই মনে হচ্ছে। যদিও শেষ চারটি ম্যাচ জিতে নকআউট পর্বে ওঠার সুযোগ থাকবে। তবে সম্ভাবনা তো আর স্রেফ ম্যাচ সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল নয়, প্রতিপক্ষও বিবেচনায় রাখতে হয়। টন্টনের গত পাঁচ দিনে বাংলাদেশ দলের শরীরী ভাষাই জানিয়ে দিচ্ছে যে, আজ ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হারলেই প্রিয়জনদের জন্য টুকটাক শপিং শুরু হয়ে যেতে পারে!

একই অবস্থা ক্যারিবীয়দেরও। বাংলাদেশের সমান ৩ পয়েন্ট নিয়ে তাদের সেমির স্বপ্নও বিলীন হওয়ার পথে। একই সমতলে দাঁড়িয়ে থাকা দুই দলের জন্য তাই এটা বাঁচা-মরার লড়াই। জেসন হোল্ডারের অবস্থা আরো খারাপ। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এসে বারবারই যে ক্যারিবীয়দের মনে করিয়ে দেওয়া হলো বাংলাদেশের বিপক্ষে তাঁর দলের সাম্প্রতিক রেকর্ড। গত জুলাই থেকে ধরলে স্কোরলাইন ৭-২। স্যার ভিভ রিচার্ডস আর জোয়েল গার্নারের কাউন্টি মাঠে অবশ্য এটা কোথাও ঝোলানো থাকবে না। মাশরাফি বিন মর্তুজাও সেটাই মনে করিয়ে যাচ্ছেন গ্রামসদৃশ এ শহরের পা রাখার পর থেকেই, গতকালও শেষবার বলেছেন, ‘দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আর বিশ্বকাপ এক না। দ্বিপক্ষীয় সিরিজে এসব হয়তো কাজে দেয়। তবে বিশ্বকাপ ভিন্ন মঞ্চ। এখানে আপনি একেক দিন একেক দলের সঙ্গে খেলছেন। এখানে প্রতিটি ম্যাচই নতুন। তাই যেকোনো কিছুই হতে পারে।’

বাংলাদেশের অধিনায়ক হওয়ার হেপা একালেও কম নয়। আগে যখন জয় অনিয়মিত ছিল বাংলাদেশের, সে সময়কার অধিনায়ককে ম্যাচের আগে জয়ের প্রত্যাশা শোনানোর জন্য নিন্দামন্দ শুনতে হতো। এখন বাংলাদেশ দলের জয়ের হার অনেক বেড়েছে। তবে তার সঙ্গে উসাইন বোল্টের গতিতে বেড়েছে প্রত্যাশাও। ইংল্যান্ডের সঙ্গে একটি বাজে দিনের জন্যই তো বিস্তর সমালোচনা শুনতে হচ্ছে মাশরাফিকে। সেখানে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে আজ পা পিছলালে শূলে চড়বেন তিনি, নয়তো তাঁর দলেরই কেউ না কেউ। টন্টনের ছোট মাঠে ক্যারিবীয়রা দানবীয় ব্যাটিং করে ম্যাচ জিতে গেলেও আত্মরক্ষার ঢাল পাবেন না মাশরাফি। তখন সেই ৭-২ স্কোরলাইনটাই বুমেরাং হয়ে রক্তাক্ত করবে পুরো দলকে।

ক্রিকেট এমনই একটা খেলা, যেখানে আনুষ্ঠানিক আর অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তায় আকাশ-পাতাল ফারাক! ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে সাম্প্রতিক অতীত নিয়ে আত্মবিশ্বাসের ডানা মেলেও চিন্তিত দলের অনেকে, ‘এই ম্যাচটি জিততে না পারলে অনেক কথা হবে!’ কখনো কখনো মনে হচ্ছে, সেমির স্বপ্নে ছেদ পড়ার মতোই সুতীব্র সমালোচনার ইস্যুতে সমান চিন্তাগ্রস্ত অনেকে। আর যা-ই হোক, মনের এমন অবস্থা সেরা নৈপুণ্য প্রদর্শনীর উপযোগী নয়।

মাশরাফি অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে গেছেন যে, দলের সবাই শারীরিক এবং মানসিক—দুইভাবেই ভালো অবস্থায় আছেন। কেউ যদি ভালো না-ও থাকেন, সেটি তাঁরা গোপন রাখছেন যেন অন্যদের মন বিষাদাক্রান্ত না হয়। দুটি হার, একটি পণ্ড ম্যাচ আর জয়ের মাঝে এটাকেই দলকে চাঙ্গা রাখার সর্বোত্তম ‘স্টপগ্যাপ’ বন্দোবস্ত বলে মনে করছেন মাশরাফি, ‘একটি ম্যাচ জিতলেই দেখবেন অনেক কিছু বদলে গেছে।’

আপাতত ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের একাদশে অদল-বদল হবে কি না, সেটিই দেখার। ক্যারিবীয় ব্যাটিংয়ের শীর্ষ ছয়ের পাঁচজনই বাঁহাতি। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চিরায়ত ছক অফস্পিনার দিয়ে ব্যাটিং ভেঙে দাও। মেহেদী হাসান মিরাজ দারুণ বোলিং করছেন, কাল হয়তো শুরুও করবেন বোলিং। প্রতিপক্ষ দলে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের সংখ্যাধিক্য অফস্পিনার  মোসাদ্দেক হোসেনের গুরুত্বও বাড়িয়ে দিয়ে থাকবে। এ দুজন তো শুরু থেকেই খেলছেন। তবে যে টন্টনের ম্যাচ দেখতে দেশ ছাড়ার আগে বোর্ড সভাপতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন! মাশরাফি পরিবর্তন নিয়ে সরাসরি কিছু বলেননি। তবে টন্টনের উইকেটে ঘাস আছে, হালকা বৃষ্টি কিংবা মেঘলা আকাশই দিনের বেশির ভাগ সময় নিয়ে নিচ্ছে। তাতে বাড়তি পেসার খেলানোর সম্ভাবনাও কি আছে? যদিও সেটি করতে গেলে একজন ব্যাটসম্যান ছাঁটাই করতে হবে বাংলাদেশকে। তেমনটা হলে টসের আগেই মোহাম্মদ মিঠুনের ‘উইকেট পতন’ অবশ্যম্ভাবী, যদিও তাঁর দায় সামান্যই। তবে শেষবেলার প্রস্তুতির ছক বলছে, বোলিং কম্বিনেশনে কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। পরিবর্তন যদি হয়, সে ক্ষেত্রে মিঠুনের জায়গা নেবেন লিটন কুমার দাস।

যাক, অধিনায়কসহ টিম ম্যানেজমেন্টই একাদশের কূল-কিনারা যেখানে করতে পারছে না সেখানে টন্টনের সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করাই শ্রেয়। জানা গেছে, কোচ স্টিভ রোডসকে আজ সকাল সাড়ে ৬টায় হোটেল হলিডে ইনের টিম রুমে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। আগের রাতে লন্ডনে এসে পৌঁছানো বোর্ড সভাপতি টন্টনে পৌঁছেই সভা করতে চান কোচের সঙ্গে। দুয়ে-দুয়ে চার মিলে গেলে মনে হয় তখনই নিশ্চিত হবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের জন্য বাংলাদেশ একাদশ!

মাশরাফি প্রতিবারই মনে করিয়ে দেন যে, তাঁর দলের চিন্তাভাবনা পুরোপুরি নিজেদের-কেন্দ্রিক। অথচ প্রতিটি দলীয় সভাতেই কিন্তু ভিডিও অ্যানালিসিস হয়, যেখানে সমান ফোকাস থাকে প্রতিপক্ষের ওপর। সব দলের বেলাতেই তাই।

এই যেমন, আন্দ্রে রাসেল আজ খেলতে পারবেন না ভেবে কিছুটা স্বস্তির হাওয়া খেলে যাচ্ছে বাংলাদেশ দলে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই ওভার বোলিং করেই নিজের ‘কুখ্যাত’ হাঁটুর চোট নিয়ে খুঁড়িয়ে মাঠ ছেড়েছেন ক্যারিবীয় এ অলরাউন্ডার। গতকাল তাঁকে টন্টনের সবুজ মাঠে দেখাই যায়নি। হোল্ডার জানিয়েছেন যে তাঁকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে। তবে খেলবেনই, এমন কোনো আশাবাদ ব্যক্ত করেননি ক্যারিবীয় অধিনায়ক। যদি খেলেনও, বোলিং করতে পারবেন না সম্ভবত।

তবে ব্যাটসম্যান রাসেলও কম রোমহর্ষক নন, প্রতিপক্ষ এবং টন্টনের প্রেসবক্সের জন্যও। তাঁর লং অন বরাবর যে কাচঘেরা প্রেসবক্স!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা