kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

ফিল্ডিংয়ের দুশ্চিন্তাটা রয়েই গেছে

সাইদুজ্জামান, টন্টন থেকে    

১৭ জুন, ২০১৯ ০৮:৩৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফিল্ডিংয়ের দুশ্চিন্তাটা রয়েই গেছে

কার্ডিফে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফিল্ডিং নিয়ে বিস্তর সমালোচিত হয়েছে বাংলাদেশ দল, দেশে এবং বিদেশেও। সমালোচনা কারোরই ভালো লাগে না, বাংলাদেশ দলেরও ভালো লাগেনি। সবার অকাট্য যুক্তি, এমন অদ্ভূতুড়ে আকৃতির মাঠে সেদিন প্রচণ্ড বাতাসও ছিল। এমন কন্ডিশনে ফিল্ডিংয়ের অভ্যাস নেই বলেই সেদিন লোক হাসানো হয়েছে। তবে বাংলাদেশের ফিল্ডিং মোটেও হাস্যরসাত্মক নয়।

খুব যে একতরফা অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ দলের অন্দর মহল থেকে, তা বলা যাবে না। মাঝেমধ্যে দলটি তুখোড় ফিল্ডিংও করে। তবে বছরজুড়ে ফিল্ডিংয়ের সালতামামি করতে বসলে কখনোই মাশরাফি বিন মর্তুজার দলকে বিশ্বমানের বলা যাবে না। ব্যাটিং-বোলিংয়ের মতো ফিল্ডিংয়েও বিশেষ বিশেষ দিনে বাংলাদেশ দুর্দান্ত। তবে পরিসংখ্যানে ফিল্ডিংয়ের চেয়ে ব্যাটিং-বোলিংয়ে মাশরাফিদের ‘সুদিন’ এগিয়ে থাকবে অবশ্যই।

ফিল্ডিংটা বাংলাদেশ দলের আজন্ম ‘কার্স’! যদিও ক্রিকেটের এই একটা বিভাগে দ্রুততম সময়ে উন্নতি সম্ভব বলে বিশ্বাস করে সবাই, বাংলাদেশ দলও। এ বিশ্বাস থেকেই বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর ফিল্ডিংয়ের ওপর ভীষণ জোর দিয়েছিলেন ট্রেভর চ্যাপেল। এখনো চোখে ভাসে, ২০০১ সালে জিম্বাবুয়ে সফরে সন্ধ্যা গড়িয়ে যাওয়ার পরও মুশফিকুর রহমান কিংবা মোহাম্মদ শরিফকে ফিল্ডিং অনুশীলন করাতেন এ অস্ট্রেলীয়। বড় ভাই গ্রেগ চ্যাপেলের মতোই কাটখোট্টা ট্রেভরের ব্যাখ্যা ছিল, ‘ব্যাটিং-বোলিংয়ে উন্নতি সময়সাপেক্ষ। সে তুলনায় ফিল্ডিংটা দ্রুত রপ্ত করা যায়। ফিল্ডিংটা ভালো হলে কিছু রান তুমি আটকাতে পারবে। আবার ফিল্ডিং ভালো হলে বিশ্বকে একটা ইতিবাচক বার্তাও দেওয়া যাবে।’ তো ফিল্ডিংয়ে উন্নতির লক্ষ্যে সেকালের সিনিয়রদের সরিয়ে জুনিয়রদের কোলে টেনে নেন ট্রেভর চ্যাপেল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সাধারণ বিশ্বাসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশের সিনিয়র-জুনিয়র এক কাতারে। দলের অপেক্ষাকৃত তরুণরাও ফিল্ডিংয়ে সাকিব আল হাসানের চেয়ে পিছিয়ে। ক্যাচিংয়ে বয়ঃকনিষ্ঠদের চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের হাতে অধিক বিশ্বস্ত। এক-দুটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে ক্ষিপ্রতায় তারুণ্যের প্রতিফলন নেই।

অথচ বাংলাদেশ দলে যিনি ফিল্ডিং কোচ হিসেবে আছেন, সেই রায়ান কুক প্রচণ্ড খাটাখাটনি করছেন। খেলোয়াড়দের মুখে মুখেও তাঁর অন্তহীন প্রশংসা। নেট থেকে বেরোলেই আলাদা অনুশীলন করাচ্ছেন সবাইকে। রিলে ক্যাচ, আরো কত কি অনুশীলন করাচ্ছেন এই দক্ষিণ আফ্রিকান। তবু ফিল্ডিং প্রত্যাশিত মানে পৌঁছেনি এখনো। তাই মাশরাফি বিন মর্তুজাকেও ইংল্যান্ড ম্যাচে দেখা গেছে সীমানা দড়ির ওপরে ফিল্ডিং করতে; যদিও দল পরিচালনার জন্য অধিনায়কের বৃত্তের কাছাকাছি ফিল্ডিং করাই রীতি। মাশরাফির ক্ষেত্রে বৃত্তের ভেতর তাঁর থাকার অন্যতম কারণ ফিটনেস। তবে কাভার কিংবা মিড উইকেটের দাবি অনেকাংশেই পূরণ করতে জানেন তিনি। কিন্তু সীমানা দড়ির কাছে ‘প্যাট্রলিং’য়ের দায়িত্ব নেওয়া মাশরাফির জন্য একটু কঠিনই।

আশ্চর্যের ব্যাপার, অধিনায়ক যখন ডিপে ফিল্ডিং করছিলেন তখন শর্ট থার্ডম্যানে মাহমুদ উল্লাহ। আধুনিক ক্রিকেটে শর্ট থার্ড ম্যাচ আর শর্ট ফাইন লেগ ফিল্ডারের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পজিশন। ব্যাটসম্যান ‘ইম্প্রোভাইজ’ করে খেলতে গেলে ক্যাচ আসবে কম গতিতে। আবার মাথার ওপর কিংবা দূর দিয়ে গেলে দৌড়ানোরও দরকার নেই, নিশ্চিত বাউন্ডারি হয় যে। অনেকটা ফুটবলে ছোট দলের বিপক্ষে বড় দলের গোলরক্ষকের মতো ‘আরাম’ আর কি! সে তুলনায় উইকেটরক্ষক, স্লিপ, পয়েন্ট, গালির ফিল্ডারদের জীবন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। মুহুর্মুহু বল ধেয়ে আসে, মুহূর্তের ভুলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।

আচ্ছা, বাংলাদেশের স্বীকৃত স্লিপ ফিল্ডার কে? আপাতত সৌম্য সরকার। পয়েন্ট-গালিতে মোসাদ্দেক হোসেন কিংবা মেহেদী হাসান মিরাজ। মিড অন কিংবা মিড অফে নিয়মিত তামিম ইকবাল। তবে বাংলাদেশ দলের যে হালচাল, তাতে অদূর ভবিষ্যতে ফিল্ডারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাই হয়তো নিতে হবে বাঁহাতি ওপেনারকে। সেদিন একজন ফিল্ডিং সংক্রান্ত আলোচনায় এমন সংশয়ের কথাই বলছিলেন। কারণ ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় যে ফিল্ডিংই করতে চান না কেউ কেউ!

নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া বাদ দিলে প্রায় সব দলেই এমন কেউ একজন আছেন, যাঁকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় দাঁড় করান সংশ্লিষ্ট দলের অধিনায়ক। বোলার-উইকেটরক্ষক বাদ দিলে পুরো মাঠ পাহারায় থাকেন মোটে ৯ জন। ‘৩৬০ ডিগ্রি’ ক্রিকেটের জমানায় অতি নগণ্য বলেই মনে হয়। তাই ফিল্ডিংয়ে দক্ষতাও দলে থাকার অন্যতম শর্ত এখন। ‘বাজে’ ফিল্ডারের সংখ্যা যত বেশি ততই বিপদ ওই দলের। ইংল্যান্ড ম্যাচে জেসন রয়ের একটি ড্রাইভ মিড উইকেট ফিল্ডারের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে, তিনি চেষ্টাই করেননি। করার কথাও নয়। কারণ মুস্তাফিজুর রহমানের তো ওখানে দাঁড়ানোর কথাই নয়! বাঁহাতি এ পেসার তো এখনো শর্ট থার্ড ম্যান কিংবা শর্ট ফাইন লেগের ফিল্ডার!

আসলে সাকিব, মোসাদ্দেক, সাব্বির রহমান, মোহাম্মদ মিঠুন, লিটন কুমার দাশ, তামিম—এমন কয়েকজন বাদ দিলে বাংলাদেশের ফিল্ডিং ইউনিট উচ্চমার্গীয় নয়, বরং প্রায়ই ভোগান্তির কারণ হয়েছে অতীতে।

ট্রেভর চ্যাপেল পারেননি, রায়ান কুক পারবেনই—তেমনটা মনে হচ্ছে না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা