kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

স্টিভ রোডসের এক বছর : সাফল্যের পাল্লাটাই ভারী

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ জুন, ২০১৯ ১৪:৫০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্টিভ রোডসের এক বছর : সাফল্যের পাল্লাটাই ভারী

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের পর হুট করে চন্ডিকা হাথুরাসিংহে চলে যাওয়ার পর পল ফারব্রেস, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, টম মুডিসহ আরো বেশ কিছু কোচের দ্বারস্থ হয়েও যখন খোঁজ মিলছিল না বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচের, তখনই দৃশ্যপটে আবির্ভাব স্টিভ রোডসের। ব্রিটিশ এই কোচকে কোচ হিসেবে নেওয়ার পেছনে ইংল্যান্ডে চলমান ক্রিকেট বিশ্বকাপকে কারণ হিসেবে দেখেছিলেন অনেকেই। গত বছর জুনে টাইগারদের দায়িত্ব নিয়ে এক বছর পার করে ফেললেন রোডস। আপাতদৃষ্টিতে নীরবে-নিভৃতে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজটা তিনি করে যাচ্ছেন বেশ ভালোভাবেই। কেমন গেল কোচ হিসেবে রোডসের গত ১২ মাস? সাফল্য-ব্যর্থতার পাল্লা ভারি কোনদিকে? 

রোডস দায়িত্ব নিয়েছিলেন টাইগারদের উইন্ডিজ সফরের ঠিক আগে আগে। তার আগে টাইগাররা আফগানিস্তানের কাছে টি-টোয়েন্টি সিরিজে ধবলধোলাই হওয়ায় চারিদিকে তখন 'গেল গেল' রব। দায়িত্ব নিয়ে প্রথমেই খেলেন বিরাট এক হোঁচট। টেস্ট সিরিজে উইন্ডিজদের সামনে দাঁড়াতেই পারল না বাংলাদেশ। উইন্ডিজের কাছে টেস্ট সিরিজে একদম উড়েই গেল এককথায়। ইনিংস পরাজয়ে হার, নিজেদের সর্বনিম্ন টেস্ট ইনিংস সবই হলো ওই সিরিজে। রোডসের কোচিং নিয়ে তাই ঢের প্রশ্ন তখন ক্রিকেটপাড়ায়। তবে ওয়ানডে সিরিজে ঠিকই ঘুরে দাঁড়াল টাইগাররা। শুধু ওয়ানডে নয়, টি-টোয়েন্টির বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের টি-টোয়েন্টি সিরিজেও হারিয়ে বেশ ভালোভাবেই সফর শেষ করে বাংলাদেশ। হাথুরাসিংহের রেখে যাওয়া সাফল্য টপকানো বিরাট এক চ্যালেঞ্জ ছিল রোডসের সামনে, প্রথম অ্যাসাইনমেন্টে সেখানে ভালোমতোই সফল বলা যায় ব্রিটিশ এই কোচকে। 

রোডসের কোচিংয়ে এখন পর্যন্ত খেলা ২৫ ওয়ানডের ১৫টিতে জয়লাভ করেছে বাংলাদেশ। আছে উইন্ডিজকে তাদের এবং নিজেদের মাটিতে সিরিজ হারানোর সুখস্মৃতি। উইন্ডিজকে ঘরের মাঠে টেস্ট সিরিজেও হারিয়েছে স্টিভ রোডসের শিষ্যরা। তা ছাড়া গত বছর অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপে দারুণ প্রতিকূল অবস্থা পাড়ি দিয়ে তার অধীনেই ফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ দল। এত সাফল্যের মাঝে ব্যর্থতাও রয়েছে কিছু। নিজেদের মাঠে জিম্বাবুয়ের কাছে টেস্ট ম্যাচে হার সাফল্যের খাতায় বিশাল এক লাল দাগ দিয়ে রেখেছে। বছরের শুরুতে নিউজিল্যান্ড সিরিজটাও হয়েছে যাচ্ছেতাই। ওয়ানডেতে দাঁড়াতেই পারেনি নিউজিল্যান্ডের সামনে। টেস্ট সিরিজেও প্রথম ম্যাচে বড় হারের পর সন্ত্রাসী হামলায় পড়ে দেশে ফিরে আসে সিরিজ সম্পন্ন না করেই। 

রোডস যুগে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত টাইগারদের পঞ্চপাণ্ডবের সাথে তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়মিত ম্যাচ জেতানো পারপরমেন্স। মিরাজ, সৌম্য, লিটন, মুস্তাফিজ অবদান রাখছেন প্রায় প্রতি জয়েই। এখন শুধু পঞ্চপাণ্ডবের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে না টাইগারদের। রোডসের ভাষ্যমতে সৌম্য, লিটন, মিরাজদের মতো খেলোয়াড়দের তিনি নিজেদের মতো খেলার স্বাধীনতা দিয়েছেন, যা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে মাঠে ভালো করতে ভূমিকা রাখছে। তার অধীনেই মিরাজ, সাইফুদ্দিন, সৌম্যরা দলে তাদের জায়গা পাকাপোক্ত করতে পেরেছেন। এর বড় কারণ হিসেবে তিনি শুধু তাদের চেষ্টা ও পারফরমেন্স ছাড়াও তাদের নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক দৃঢ়তাকে বড় করে দেখছেন। 'আমি পরিকল্পনা করে ট্রেনিং সেশনে তরুণ ক্রিকেটারদের প্রত্যেককে আলাদা আলাদা কিছু দায়িত্ব দিই। এতে তারা নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং শিখতে পারে। এটা হয়তো তাদের সচরাচর করা ট্রেনিং থেকে কিছুটা ভিন্ন, তবে এতে তারা তাদের নিজেদের সীমাবদ্ধতা আর দায়িত্ব সম্পর্কে অবগত হতে পারছে'- রোডস বলেন। 

বাংলাদেশ দলের স্কোয়াড গভীরতা নিয়ে একসময় হাহাকার ছিল বেশ। রোডস এসে সেটিও পূরণ করার দায়িত্বে নেমেছেন। রোডসের মতে তরুণ কিছু ক্রিকেটার তাদের খেলার দারুণ উন্নতি ঘটিয়েছে যা স্কোয়াড গভীরতা বেশ বাড়িয়েছে। 'সৌম্য কিছুটা অফফর্মে থাকার পর নিজের ছন্দ ফিরে পেয়েছে। লিটন দারুণ খেলেও কিন্তু আমাদের একাদশে ঢুকতে পারছে না। সাব্বির-সৈকত-মিরাজদের মধ্যে একাদশে সুযোগ পাওয়া নিয়ে চলছে দারুণ এক লড়াই। সাইফুদ্দিন নিজের পারফরমেন্স দিয়ে দলে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। সাব্বির সৈকত সবাই সাম্প্রতিক সময়ে ম্যাচ জেতানো পারফরমেন্স দিয়েও একাদশে জায়গা নিশ্চিত করতে পারছে না। এই সুস্থ লড়াই বলে দেয় আমাদের স্কোয়াড গভীরতা বেড়েছে।' 

তরুণদের পাশাপাশি পঞ্চপাণ্ডবের ধারাবাহিক ভালো খেলাটাও এক সুখবর গোটা দলের জন্যই। সাকিব তো এই বিশ্বকাপে রয়েছেন দারুণ ছন্দে। মুশফিক-রিয়াদ-তামিমকে নিয়ে রোডসের আলাদাভাবে কাজ করা চোখে পড়েছে সবারই। অধিনায়ক মাশরাফির সাথেও রোডসের রসায়নটা জমে উঠেছে দারুণভাবে। 

বিশ্বকাপ এবার হচ্ছে ইংল্যান্ডে, স্টিভ রোডসের জন্মভূমিতে। এখানকার মাঠ আবহাওয়া সবই দারুণ পরিচিত তার। তার জানাশোনা কতটা তিনি ছড়িয়ে দিতে পারেন খেলোয়াড়দের মাঝে আর সেটি কতটা কাজে লাগে সেটিই ছিল দেখার বিষয়। বিশ্বকাপে টাইগারদের শুরুটাও হয়েছিল দারুণ। প্রথম ম্যাচেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে বাঘের হুংকার বেশ জোরেশোরেই শুনিয়ে দেয় বাংলাদেশ দল। দ্বিতীয় ম্যাচেও জয়ের খুব কাছাকাছি গিয়ে হারলেও তৃতীয় ম্যাচে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি বাংলাদেশ। পরের ম্যাচে সম্ভাব্য একটি জয় বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ায় সংবাদ সম্মেলনে নিজের হতাশা লুকিয়ে রাখতে পারেননি রোডস। ১৭ জুন টনটনে বাংলাদেশ মুখোমুখি হবে উইন্ডিজের। সম্ভবত গত ১২ মাসে রোডসের সবচেয়ে প্রিয় প্রতিপক্ষ এই উইন্ডিজ যাদের রোডসের অধীনে হোম-অ্যাওয়ে-নিউট্রাল সব মাঠেই হারিয়েছে বাংলাদেশ। 
রোডস মনে করেন বড় দলগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশ এখন মুখ্য প্রতিপক্ষ হিসেবেই মাঠে নামে। 

'আপনি যদি এই বিশ্বকাপে দলগুলোর দিকে তাকান তাহলে বুঝবেন এবারের বিশ্বকাপে বড় দলগুলোর বিপক্ষে মুখ্য প্রতিপক্ষ হিসেবে মাঠে নামার অধিকার রয়েছে এই দলের। হয়তো আমরা বড় মঞ্চের অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে থাকব, তবে আমাদের যেসব খেলোয়াড় রয়েছে তারা তাদের সেরাটা খেললে আমরা বড় দলগুলোর চেয়ে কোনো অংশেই কম না।' 

রোডসের গত ১২ মাসের আরেকটি বড় সফলতা হয়তো বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সাথে তার কথাবার্তা বা পরিকল্পনা বাইরে খুব একটা না যাওয়া বা বড় সংবাদের শিরোনাম না হওয়া, যেটি চন্ডিকার আমলে খুব বাজে প্রভাব ফেলেছিল দলের ওপর। ব্রিটিশ এই কোচ নিজের কাজের মাধ্যমেই খবরের শিরোনাম হতে বেশি পছন্দ করেন বলেই ক্রিকেটপাড়ার সবার বিশ্বাস। 

রোডসের হাত ধরে গত এক বছরে বাংলাদেশ ক্রিকেট এগিয়ে গেছে বেশ খানিকটা পথ। কিছু ব্যর্থতা থাকলেও তার সাফল্য আপাতত চাপা দিয়ে রাখছে সেসব। নিজভূমিতে টাইগারদের বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্নপূরণে তার ভূমিকা থাকবে বেশ। সেখানে কতটা সফল হতে পারবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা