kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন মাঠে চান মাশরাফি

সাইদুজ্জামান, কার্ডিফ থেকে    

২৫ মে, ২০১৯ ০৮:৩১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন মাঠে চান মাশরাফি

ইউরোপের পার্কগুলো দেখলেই শুয়ে গড়াগড়ি খেতে ইচ্ছা করবে। সোফিয়া গার্ডেনও কোনো ব্যতিক্রম নয়। তবে টানা সৌন্দর্যবিলাস মনের স্বাদ কমিয়ে দেয় কি না কে জানে। আয়ারল্যান্ড থেকে শুরু করে প্রায় তিন সপ্তাহ হলো একটার পর একটা মন জুড়িয়ে দেওয়া অনাবিল সবুজ দেখার সুযোগ হয়েছে। সিটি সেন্টার মানে, শহরের মধ্যমণি থেকে হেঁটে কার্ডিফের ক্রিকেট মাঠে যাওয়ার পথে সোফিয়া গার্ডেনের অন্তত অর্ধেকটা দেখা হয়ে যায়। সেই অভ্যস্ত হয়ে পড়া ঝকঝকে সবুজ চারপাশে। তবু স্টেডিয়ামমুখী মিনিট পনেরোর যাত্রার প্রতিটি মুহূর্তেই ফিরে ফিরে আসে রোমাঞ্চকর সব স্মৃতি!

২-০। এ মাঠে দুই ওয়ানডের দুটিতেই জয়ী বাংলাদেশ। ওয়ানডেতে এর চেয়েও ভালো স্কোরলাইন আছে বাংলাদেশের। তবে কার্ডিফের মাঠে শতভাগ সাফল্যের রোমাঞ্চের বহুমুখী প্রভাব আছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে। যখন বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা নিয়ে নিষ্ঠুর হাসি-তামাশা করত ক্রিকেটবিশ্ব, ওয়ানডেতেও তীব্র খরা, ঠিক তখনই কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অবিস্মরণীয় জয়। ২০০৫ সালের সেই জয় বাংলাদেশের ক্রিকেট লোকগাথার অংশ হয়ে আছে। প্রায় এক যুগ পর এ মাঠেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নিশ্চিত হার মেনে নিয়ে ড্রেসিংরুমও যখন নেতিয়ে পড়েছে, তখনই সাকিব আল হাসান ও মাহমুদ উল্লাহ এমন কিছু করেছেন, যা ক্রিকেটে রোমাঞ্চকর প্রত্যাবর্তনের ‘গল্প সংকলনে’ ঠাঁই করে নিয়েছে।

কার্ডিফ তাই পেশাদার মাশরাফি বিন মর্তুজাদের মনেও আবেগের ঢেউ তোলে। ২ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ বাংলাদেশের। তবে তার আগে কার্ডিফে পাকিস্তান ও ভারতের বিপক্ষে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ রয়েছে। তবে মন তো পড়ে ইংল্যান্ড ম্যাচে। ৮ জুন সোফিয়া গার্ডেনে যে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। জোফ্রা আর্চারকে অন্তর্ভুক্ত করায় ইংলিশরা এখন মাশরাফিদের আলোচনায় তুমুল ফেভারিট। তাতে কি? ওদের সঙ্গে তো খেলা হবে সোফিয়া গার্ডেনে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বর্গোদ্যানে!

আইসিসির অধিনায়কদের সম্মেলনে সেরে পরশু কার্ডিফে দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া মাশরাফি সামনে বসা মাহমুদকে দেখিয়ে বলছেন, ‘তুই আরো দুইটা সেঞ্চুরি করে দিবি।’ নিরুত্তর মাহমুদ মুচকি হাসেন। দুই বছর আগে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সাকিবের সঙ্গে নিউজিল্যান্ড ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। গত বিশ্বকাপের জোড়া সেঞ্চুরির আত্মবিশ্বাস তো রয়েছেই। এরপর তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিমদের জন্য ‘টার্গেট’ আউড়ে যান বাংলাদেশ অধিনায়ক। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তাঁর সতীর্থদের অভিব্যক্তিতে যেন আরো বড় কিছু করার প্রত্যয়। অবিশ্বাস্য!

অবিশ্বাস্য এ কারণেই যে, মাত্রই সপ্তাহ দুয়েক আগে ডাবলিনে আয়ারল্যান্ড উলভসের কাছে হেরে ভীষণ মুষড়ে পড়েছিল বাংলাদেশ। একজন তো আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বলছিলেন, ‘এই দলের বিশ্বকাপে গোটা দুয়েক ম্যাচ জেতাই ভাগ্যের!’ আর সেই দলটিই কিনা আরেকবার কার্ডিফে ‘ক্যু’ করার স্বপ্ন দেখছে, প্রতিপক্ষের সাড়ে তিন শ রানের ইনিংসকে ডাল-ভাত বানিয়ে ফেলা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে!

এই সেদিনও বিশ্বকাপের সূচি নিয়ে একটু অস্বস্তি ছিল বাংলাদেশ দলে। ইংলিশ কন্ডিশনে অভ্যস্ত দলগুলোর বিপক্ষেই যে শুরুর ম্যাচগুলো খেলতে হবে মাশরাফিদের। শুরুর দিকে উইকেট তরতাজা থাকবে, তাতে কন্ডিশনের সুবিধা দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড আর ইংল্যান্ডেরই সবচেয়ে বেশি পাওয়ার কথা। সূচিটা ঘুরিয়ে নিজেদের ঘরানার ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাকে খেলে শেষ দিকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ উইকেটে বাউন্সি উইকেটে স্বচ্ছন্দ দলগুলোকে পেলে সুবিধা হতো। তবে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে উড়িয়ে আনা অবিশ্বাস আত্মবিশ্বাসের তোড়ে কোথায় যেন উড়ে গেছে! পরশু লন্ডনে বিশ্বকাপ অধিনায়কদের সম্মেলনে দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড আর ইংল্যান্ড অধিনায়কের সঙ্গে আলাদা করে ছবি তুলেছেন মাশরাফি। কেন? সে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। তবে আভাসে বোঝা যায় পুল পর্ব পেরোনোর পথে এঁদেরকেও টার্গেট করেছে বাংলাদেশ। নিরাপদ থাকার জন্য অন্তত গোটা ছয়েক ম্যাচ জেতা চাই যে।

দলের ছায়াসঙ্গী হয়ে এবারের ইউরোপ ট্যুরের এমন বাঁকবদল চমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। খালেদ মাহমুদ আয়ারল্যান্ড সফরে ছিলেন না, বিশ্বকাপে তিনিই দলের ম্যানেজার। গতকাল সকালে দেখা হতে তাঁর কণ্ঠেও খানিক বিস্ময়, ‘এতটা আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ দল আগে দেখিনি। আসলে আয়ারল্যান্ড সিরিজে যে ক্রিকেট খেলেছে তাতে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। টানা অতগুলো ম্যাচ সমানতালে ভালো খেলে জেতার রেকর্ড তো আমাদের নেই।’ বোঝা গেল, আয়ারল্যান্ড সফর পরবর্তী বাংলাদেশ দলের টিম মিটিংয়ের শরীরী ভাষাও বদলে গেছে। চন্দিকা হাতুরাসিংহে জমানার ‘ফ্রিডম অব প্লে’ নাকি ফিরিয়ে আনার অনুমতি মিলেছে দলের জুনিয়রদেরও।

সমস্যা হলো, আত্মবিশ্বাসও কখনো কখনো অতি আত্মবিশ্বাস হয়ে প্রত্যাঘাত করেছে বাংলাদেশ দলকে। সবচেয়ে দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা মাশরাফির সে অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই আত্মবিশ্বাসের পাগলা ঘোড়ায় লাগাম পরানোর কাজটাও মনোযোগ দিয়ে করছেন তিনি, ‘আয়ারল্যান্ড সিরিজ অবশ্যই আত্মবিশ্বাস জোগাবে। তবে ওটা নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। আত্মবিশ্বাস মাঠে খেলে প্রমাণ দিতে হবে।’ প্রথম একটি ট্রফি জেতার পর থেকে দেশ থেকে বিশ্বকাপ জেতার চিল-চিত্কার শুনছেন ক্রিকেটাররা। ফেসবুকে ঝড় বইছে। পেশাদার মিডিয়াতেও আবেগের চোরাস্রোত চোখে পড়েছে মাশরাফির, যা তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবু নিজের মতো করে আবেগ-উচ্ছ্বাসের প্রবল স্রোতে বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন মাশরাফি, ‘আমাদের ঘিরে সবার অনেক প্রত্যাশা। সাধারণ মানুষের, মিডিয়ারও। তবে এটা অনেক বড় টুর্নামেন্ট। অনেকগুলো ভালো দল আছে। তাই অত দূর না ভেবে আপাতত প্রথম ম্যাচটি (২ জুন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে) আগে ভালো খেলি। ম্যাচ ধরে ধরে এগোতে হবে আমাদের।’

স্বপ্নের সিঁড়িও তো একটা একটা করেই ভাঙতে হয়!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা