kalerkantho

দুই বছর ধরে এই দলটি তৈরি করেছি : সাক্ষাতকারে হাবিবুল বাশার

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ১৮:২৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দুই বছর ধরে এই দলটি তৈরি করেছি : সাক্ষাতকারে হাবিবুল বাশার

বাংলাদেশের ক্রিকেটের দুই যুগের দুই কাণ্ডারী হাবিবুল বাশার এবং মাশরাফি বিন মুর্তজা। ফাইল ছবি

টাইগার ক্রিকেটের উত্থানলগ্নের কাণ্ডারী ছিলেন তিনি। ছিলেন সবচেয়ে বড় তারকাও। ওই সময় স্বল্প সুযোগ সুবিধার মাঝেও একের পর এক হাফ-সেঞ্চুরি করে পরিচিতি পেয়েছিলেন 'মি. ফিফটি' নামে। তার নেতৃত্বেই ২০০৭ বিশ্বকাপে খেলেছিল বাংলাদেশ। সেই হাবিবুল বাশার সুমন এখন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের নির্বাচক। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ সামনে রেখে গতকাল ঘোষিত হয়েছে ১৫ সদস্যের দল। এবারের দলটি তার কাছে সবচেয়ে দুর্দান্ত মনে হয়েছে। এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাতকারে নিজের আশার কথা শুনিয়েছেন হাবিবুল বাশার।

► বিশ্বকাপ দল ঘোষণা হয়েছে, এই দলকে নিয়ে কতটা প্রত্যাশা?

হাবিবুল: অনেকটাই প্রত্যাশা। গত দুই বছর ধরে এই দলটাকে আমরা তৈরি করেছি। এবার যা ফরম্যাট, তাতে খেলাটা খুবই কঠিন হবে সবার জন্য। তবে প্রথম লক্ষ্য তো অবশ্যই ভালো খেলা এবং সেমিফাইনালে পৌঁছনো। সেমিফাইনালে যেতে পারলে তার পরেরটা ভাবা যাবে। তবে তারও আগে ভালো ক্রিকেট খেলা।

► দলে এমন চার জন ক্রিকেটার রয়েছেন যারা চোটের জন্য দীর্ঘদিন বাইরে। কোন আত্মবিশ্বাসের জায়গা থেকে তাদের বিশ্বকাপ দলে রাখা হলো?

হাবিবুল: ওদের যা চোট-আঘাত ছিল তা খুবই সামান্য। সকলেই এখন পুরো ফিট। ভালো খেলার মতো জায়গায় রয়েছেন। কিন্তু বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখেই সবাইকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল। তার আগে তারা টানা খেলছিলেন। রিহ্যাবের পাশাপাশি তারা যাতে বিশ্বকাপের জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়ে উঠতে পারেন, সে কারণেই বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল। তাদের বিশ্বকাপ খেলতে কোনো বাধা হবে বলে আমার মনে হয় না।

► বিশ্বকাপের আগের প্রস্তুতির কী পরিকল্পনা?

হাবিবুল: আমরা শেষ আন্তজার্তিক টুর্নামেন্ট খেলেছি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এই মুহূর্তে ৫০ ওভারের টুর্নামেন্ট- ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল) চলছে। সেখানেও কিছুটা প্রস্তুতি হচ্ছে। আর শেষ প্রস্তুতি আমরা নেব আয়ারল্যান্ডে। সেখানে আয়ারল্যান্ড আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে একটা ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট খেলব। কারণ আয়ারল্যান্ড আর ইংল্যান্ডের আবহাওয়া প্রায় এক। ওখানে খেললে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সুবিধে হবে।

► ইংল্যান্ডের আবহাওয়ায় কোন দল বেশি সুবিধা পাবে বলে মনে হয়?

হাবিবুল: জুনে বিশ্বকাপ। তখন ইংল্যান্ডে মিড সামার। সেই চেনা ইংল্যান্ডের আবহাওয়ার মধ্যে পড়তে হবে না। তবে একটু মেঘলা হলেই ইংল্যান্ডের পরিস্থিতি বদলে যায়। তবুও এই পরিস্থিতিতে উপমহাদেশের দেশগুলো সুবিধা পাবে। কিন্তু এবার কিন্তু হাইস্কোরিং ম্যাচ হওয়ার পুরো সম্ভাবনা রয়েছে। ইংল্যান্ডে সবাই ফাস্ট বোলিংকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু এবার স্পিনাররাও সাহায্য পাবে। ব্যাটে-বলে যে দিন যে পারফর্ম করতে পারবে, সেই দিনটা তাদেরই হবে।

► বিশ্বকাপের আগে আইপিএল কতটা ক্লান্তি তৈরি করছে?

হাবিবুল: এখন আসলে ক্রিকেট বদলে গেছে। এ রকম পরিস্থিতির মধ্যেই সারা বছর ক্রিকেট খেলে ক্রিকেটাররা। অনেক খেলা। আর সকলেই পেশাদার। সবাই জানে কোথায় থামতে হবে। এই প্রজন্মের ক্রিকেটারদের কাছে মূলমন্ত্র ফিটনেস। সবাই খুব ফিট। আমার মনে হয় না আইপিএলের জন্য কোনো সমস্যা হবে।

► বাংলাদেশ দলে কারা পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন?

হাবিবুল: সাকিব অভিজ্ঞ প্লেয়ার। চোটের জন্য সর্বশেষ সিরিজে তাকে আমরা পাইনি। ও ফিরলে দল শক্তিশালী হবে। তার সঙ্গে তামিম ইকবাল, মুশফিকুরের মতো সিনিয়ররা সব সময়ই পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন। আর যদি নতুনদের কথা বলেন, তবে বলব লিটন দাসের কথা। যে দিনটা ওর হয়, সেদিন অন্য রকম কিছু একটা হয়ে যায়। ও একাই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। মুস্তাফিজুর রহমানও তো রয়েছে।

► টানা দুই বছরের পারফরম্যান্সের নিরিখে সবাই ভারতকে ফেভারিট বলছে। কিন্তু বিশ্বকাপ একটা আলাদা মঞ্চ। আপনার কী মনে হয়, ভারত পারবে?

হাবিবুল: ভারত এমন একটা টিম যেখানে সবাই ভালো প্লেয়ার। এটা সচরাচর পাওয়া যায় না। একটা দলে সবাই ভালো প্লেয়ার হওয়াটা ভারতকে অনেকটাই এগিয়ে দিচ্ছে। তার মধ্যে ভারতের পেস বোলিংও খুব উন্নতি করেছে। ব্যাটিং তো বিশ্বসেরা। ২০০৩ আর ২০০৭-এ যেমন ছিল অস্ট্রেলিয়া দল। তবে বড় মঞ্চে অনেক বড় প্লেয়ারই ফর্ম হারিয়ে ফেলেন। তেমন না হলে ভারত খুবই ভালো দল। কিছুটা ভাগ্যেরও ব্যাপার।

► বিশ্বকাপে বিরাট কোহলিকে কোথায় দেখছেন?

হাবিবুল: বিরাট কোহলি বড় মঞ্চের ক্রিকেটার। ও ম্যাচ উইনার। ও সব সময়ই আলাদা কিছু করে দিতে পারে।

► অস্ট্রেলিয়া কি ডেভিড ওয়ার্নার আর স্টিভ স্মিথকে ফিরিয়ে আবার বিশ্বকাপের দাবিদার হয়ে উঠল?

হাবিবুল: এই দুই জন ফেরায় অস্ট্রেলিয়া শক্তিশালী দল হয়ে উঠেছে। ভারতের মাটিতে শেষ সিরিজের পর কিন্তু এটা অস্বীকারের উপায় নেই।  ৬ মাস আগে বললেও আমার উত্তরটা অন্য রকম হত। তবে এটা ঠিক ওয়ার্নার আর স্মিথ ফেরায় অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং আরও শক্তিশালী হবে।

► বিশ্বকাপের সেরা তিনটি দল যদি বাছতে বলা হয়, তা হলো কাদের এগিয়ে রাখবেন?

হাবিবুল: সেরা তিন অবশ্যই ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত। তিনটি দলই ফর্মের শীর্ষে রয়েছে।

► ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে যে দোদুল্যমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেটা কতটা ওই ম্যাচের উপর প্রভাব ফেলবে?

হাবিবুল: আমার মনে হয় সবাই পেশাদার এবং বিশ্বকাপের আসরে সবাই ম্যাচ জিততে চাইবে। এবার যা ফরম্যাট তাতে একটা ম্যাচ অনেকটা পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। আমরা অনেক ভালো ক্রিকেট দেখতে পাব এই ম্যাচে আশা করছি।

► খেলোয়াড় জীবন এবং নির্বাচক জীবন মিলে আপনার সেরা বিশ্বকাপ কোনটা?

হাবিবুল: ২০০৭ বিশ্বকাপটা বাংলাদেশের ক্রিকেটে জোয়ার এনেছিল। তারপর থেকেই বাংলাদেশে ক্রিকেটের ক্রেজ অনেক বেড়ে যায়। সবাই ক্রিকেট খেলতে আগ্রহী হয়। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপটাও কিন্তু আমরা খারাপ খেলিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছিলাম। তবে এবার কিন্তু আমাদের সেরা বিশ্বকাপ হতে চলেছে। এটাই আমাদের সেরা দল। অনেক অভিজ্ঞ ক্রিকেটার রয়েছে। যাদের হয়তো আর পরের বার পাব না। পরের বার অনেকটাই নতুন দল নিয়ে নামতে হবে।

► খেলোয়াড়ী জীবনে আপনার অধিনায়কত্বে ২০০৭ বিশ্বকাপ ঠিক কতটা আজও বাংলাদেশ ক্রিকেটকে অনুপ্রাণিত করে?

হাবিবুল: আগেই বললাম, ওই বিশ্বকাপটা বাংলাদেশ ক্রিকেটকে বিশ্বের দরবারে চিনিয়েছিল। বিশেষ করে, ভারতের মতো দলকে হারিয়ে দেওয়াটা সহজ ছিল না। আপনার হয়তো মনে আছে, ওই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হেরে লিগ পর্ব থেকেই ছিটকে গিয়েছিল ভারত। আমরা হয়তো আরও ভালো করতে পারতাম। কিন্তু সেই বিশ্বকাপই আমাদের ক্রিকেট বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়ানোর পথ দেখিয়েছিল।

► বিশ্বকাপ নিয়ে বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে উত্তেজনা কোথায় পৌঁছেছে?

হাবিবুল: সেটা সত্যিই বলার মতো। মানে, মানুষ বিশ্বকাপের মধ্যেই বাঁচতে শুরু করে দিয়েছে। গতকাল দল ঘোষণা হয়েছে। মানুষের মুখে যেন এটক ছাড়া আর কোনো আলোচনা নেই। বিশ্বকাপের দুই মাস হয়তো গোটা দেশ নাওয়া-খাওয়া ভুলে শুধু বিশ্বকাপ নিয়েই বাঁচবে।

► আপনাদের এক দিন আগেই বিশ্বকাপ দল ঘোষণা করেছে ভারত। সেখানে প্রশ্ন উঠছে দীনেশ কার্তিককে দলে নেওয়া নিয়ে, আপনার কী মনে হয়?

হাবিবুল: আমি দল নির্বাচন করি, তাই জানি কত কিছু মাথায় রাখতে হয়। আমার মনে হয় না দীনেশ কার্তিককে দলে রাখাটা সঠিক সিদ্ধান্ত। কারণ বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে অনেক চাপ থাকে। সেটা অভিজ্ঞতা দিয়েই সামলাতে হয়। আর দীনেশ কার্তিক ঠাণ্ডা মাথায় ম্যাচ বের করে নিয়ে যেতে পারে। তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি নিদাহাস ট্রফিতে। আমাদের জেতা ম্যাচ ছিনিয়ে নিয়েছিল।

► এবার বিশ্বকাপের ফরম্যাট বদলে গেছে। কোনো গ্রুপ নেই, সবাইকে সবার সঙ্গে খেলতে হবে। সেরা চার দল সেমিফাইনালে যাবে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য...

হাবিবুল: এটার দুটি দিক আছে। ভালোও আছে, মন্দও আছে। যেমন, সবার সঙ্গে খেলে তবেই সেমিফাইনালে যেতে হবে। তেমনই একটা ম্যাচ খারাপ খেললে আরও একটা ম্যাচ থাকবে ঘুরে দাঁড়ানোর। যেহেতু সবাই সবার সঙ্গে খেলবে, তাতে রিকভারির সময়টাও পাওয়া যাবে।

মন্তব্য