kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

বই আলোচনা

হরতালে আগ্রহ নেই, কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশের বিকল্প কী?

রওনক জাহান

৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হরতালে আগ্রহ নেই, কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশের বিকল্প কী?

সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি : অজয় দাশগুপ্ত। প্রচ্ছদ : রফিকুন নবী। প্রকাশক : বাংলা একাডেমি। মূল্য : ১১০০

‘সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি’ গবেষণা গ্রন্থের জন্য অজয় দাশগুপ্তকে অভিনন্দন। অনেক দিনের শ্রমসাধ্য কাজের ফল এ গ্রন্থ, যার প্রকাশক বাংলা অ্যাকাডেমি। অজয় দাশগুপ্ত পেশায় সাংবাদিক। এ গবেষণা কাজ সম্পন্ন করেছেন দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বাড়তি সময় বের করে। ৭০ বছরের প্রতিদিনের কোনো না কোনো পত্রিকা তিনি দেখেছেন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য। সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকা এবং বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার সূত্রও ব্যবহার করেছেন। 

যারা বাংলাদেশের রাজনীতি, আন্দোলনের কর্মপন্থা ও কৌশল নিয়ে গবেষণা করবেন—তাদের জন্য এ বইটি অনন্য উত্স হবে। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদেরও সহায়ক হবে। এ বইয়ে হরতালের বিবরণ আছে। ইতিহাস আছে। বাড়তি পাওনা বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান প্রধান ঘটনা এক স্থানে গ্রন্থিত থাকা। এ সব বিষয় নিয়ে গবেষণায় উত্সাহী যারা, তাদের জন্য সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি গ্রন্থ বড় ভূমিকা রাখবে। এতে হরতালের বিবরণ ও বিশ্লেষণ আছে, কারা কোন ইস্যুতে হরতাল ডেকেছে সেটা আছে। হরতাল কিভাবে পালিত হয়েছে, জনগণের কেমন সাড়া ছিল এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কী ভূমিকা ছিল সে সবও জানা যাবে।

প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে পাকিস্তান আমলে হরতালের বিবরণ। বাংলাদেশের যাত্রা শুরুর পর হরতালের সংখ্যা ক্রমে বেড়েছে। ২০১৫ সালের পর আবার তা কমতে শুরু করে। এ গ্রন্থের তথ্য শুরু ১৯৪৭ সাল, শেষ ২০১৭ সাল। লেখক ২০১৭ সাল প্রসঙ্গে লিখেছেন—‘প্রায় হরতালমুক্ত বছর’। সবচেয়ে বেশি হরতাল হয়েছে ২০১৩ সালে—২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও তার জোট সঙ্গীরা এ সব হরতাল আহ্বান করেছিল। অজয় দাশগুপ্ত মোটা দাগে হরতালের শ্রেণিবিন্যাস করেছেন। এখন তিনি কিংবা অন্য কেউ আরো গভীরে গিয়ে এ নিয়ে কাজ করতে পারেন।

সাত দশকের হরতাল গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১—প্রায় দুই যুগে হরতাল হয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি। আবার সময়ের বেশির ভাগ হরতাল হয়েছে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত—স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরুর পর।  কিন্তু পাকিস্তান আমলের হরতালে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছিল, অংশগ্রহণ ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ আমলে, বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে হরতাল সংখ্যা ক্রমে বেড়েছে। সব থেকে বেশি হরতাল হয়েছে ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল সময়ে। আমরা এ গবেষণা থেকে জানতে পারি, কোন সময়ের হরতালে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছিল এবং কখন তা কমে আসতে শুরু করে। আরেকটি প্রশ্ন আসবে—সব কিছু অচল করে দিতে পারলেই কি কোনো হরতালকে আমরা সফল বা সার্থক হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি? আরেকটি বিষয়ও লক্ষ করি—আমরা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের নাম মনে রাখি। তাদের স্মরণ করি। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ আসাদ ও মতিউরকে এখনো স্মরণ করি। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বরের শহীদ নূর হোসেনের নামে দিবস পালিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ের হরতালগুলোতে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। এদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী আছে, সাধারণ মানুষও আছে। কিন্তু কজনকে আমরা স্মরণে রাখি? এদের নিয়ে কটি দিবস রয়েছে?

আমরা এ গ্রন্থে স্থানীয়ভাবে ডাকা অনেক হরতালের তথ্য পাই। বিচিত্র সব দাবিতে এসব হরতাল ডাকা হচ্ছে। বিশেষভাবে লক্ষ করি, স্থানীয়ভাবে অনেক হরতাল হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সড়ক পথ নিরাপদ হচ্ছে না।

সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি গ্রন্থে আমরা হরতাল চিত্র পাই, প্রবণতা পাই। রাজনীতির ঘটনার বিবরণ পাই। এ গ্রন্থ অনেক গবেষণার উত্স হয়ে উঠুক, সেটাই প্রত্যাশা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা