kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

উন্নয়নের এই যুগেও রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক

আতিউর রহমান

৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উন্নয়নের এই যুগেও রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক

আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির পরিবর্তন খুবই দ্রুত ঘটছে। তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশের কারণে সারা পৃথিবীই আমাদের হাতের মুঠোয় এসে যায়। কোথায় কী ঘটছে অতি সহজেই জানা যায়। এর ফলে আমাদের মনোজগতের পরিবর্তন ঘটছে বেশ দ্রুত। কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক, তা বোঝাই মুশকিল। এমনি এক দুঃসময়েও বিশ্বজুড়ে একটি নৈতিক ঐকমত্য বিকশিত হচ্ছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে সারা বিশ্বেই বাড়ছে শঙ্কা, উদ্বেগ। তাই আমরা যেকোনো কাজ করার সময়ই নিজেদের কাছেই প্রশ্ন রাখি, এর ফলে কি আমরা যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করছি? আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য কি আমরা যথেষ্ট দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছি? আমাদের প্রিয় পৃথিবী ও ভবিষ্যত্ প্রজন্ম নিয়ে এই যে দুর্ভাবনা করছি, তা কিন্তু বিশ্বব্যাপীই চোখে পড়ছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালে জাতিসংঘের নেতৃত্বে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও প্যারিস জলবায়ু চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর এই বৈশ্বিক নৈতিক ঐকমত্য গড়ে উঠেছে।

অবাক লাগে এই ভেবে যে সবার জন্য এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একযোগে হাঁটার এই আহ্বান শতবর্ষেরও বেশি আগে আমরা শুনেছিলাম রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। তাঁর লেখা ‘অরণ্য দেবতায়’ জেনেছিলাম বৃক্ষ আমাদের অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে, সীমাহীন লোভে পড়ে তার গোড়ায় কুড়াল চালাতে আমাদের সামান্য অনুশোচনা হয় না। এই তিনিই বলেছেন, ‘প্রকৃতির দান আর মানুষের জ্ঞান দুইয়ে মিলেই সভ্যতা।’ সে জন্য তিনি মানুষের জলকষ্ট দূর করার জন্য পুকুর কেটেছেন, বৃক্ষ রোপণ করেছেন এবং কৃষকদের কল্যাণে নানা সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। আর সে কারণেই আমরা বলতে পারি, ‘টেকসই উন্নয়নে’র এই যুগেও তিনি খুবই প্রাসঙ্গিক।

দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বজুড়েই রবীন্দ্রনাথ পরিচিত তাঁর অনবদ্য নান্দনিক অবদানের জন্য। তিনি ছিলেন একজন সফল কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, ছোটগল্পকার, চারুশিল্পী ও দার্শনিক। নিঃসন্দেহে সাহিত্যজগতের এক অতুলনীয় দিকপাল তিনি। এশিয়ার প্রথম নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ পূর্ব ও পশ্চিমের দুই সভ্যতার আলোবাতাসেই বেড়ে উঠেছেন। দুই শতাব্দীর বিরাট আশা, হতাশা, সম্ভাবনা ও বিপর্যয় তিনি আশি বছরের এক দীর্ঘ জীবনে নিবিড়ভাবে অনুভব করেছেন এবং দেখেছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা প্রশ্ন করতে পারি: ওই সময় থেকে আজকের বিশ্বের এই সময়ের জন্য রবীন্দ্র ভাবনার আলোকে আমরা কী শিখতে পারি? আজকের পৃথিবী কি রবীন্দ্রনাথের দেখা পৃথিবী থেকে খুবই আলাদা? বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির বিকাশ সত্ত্বেও কেন তিনি এখনো এতটা গুরুত্বপূর্ণ? এসব প্রশ্নের খুব স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট উত্তর আমার জানা নেই।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মাটিঘেঁষা এক বাস্তববাদী মানুষ। শুধু জমিদার হিসেবেই নয়, একজন মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ হিসেবেও সমাজের পাটাতনে থাকা দুঃখী মানুষগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য নানাধর্মী উদ্যোগ তিনি গ্রহণ করেন। সাধারণ মানুষের জীবনকে স্পর্শ করে যেসব বিষয়—(যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সংস্কৃতি) সেসব নিয়ে তাঁর ভাবনা ও কর্মোদ্যোগগুলো ছিল খুবই গভীর অন্তর্দৃষ্টিমূলক এবং সুদূরপ্রসারী। সেসব অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সমকালীন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার মতো অনেক কিছুই জানতে পারি। নগরে জন্মেও তিনি পল্লীর দুঃখ-বঞ্চনা তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছেন। আর সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের এই দুঃখ ও দৈন্য মোচন করার। আর সে কারণেই আজও রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও কর্ম এতটা প্রাসঙ্গিক মনে হয়। তাঁর ভাবনাগুলো ছিল খুবই মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। শুধু কথা নয়, বিশ্বভারতীর মতো আধুনিক শিক্ষায়তন গড়ার পাশাপাশি শ্রীনিকেতনও গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আর পতিসর ও শিলাইদহে সমাজসংস্কার ও কৃষির আধুনিকায়ন সম্পর্কিত তৃণমূলের সামাজিক উদ্যোগগুলোর কথা না-ই বা বললাম।

আজকের পৃথিবীও রবীন্দ্রনাথের পৃথিবীর মতোই পরিবর্তনের শিকার। তাই আজকের দিনে তাঁর সৃজনশীল ভাবনা ও কর্ম আমাদের জন্য এতটা প্রাসঙ্গিক মনে হয়। তিনি বরাবরই অভিজ্ঞতাকে মাথায় রেখে ভেবেছেন যে পরিবর্তনকে মোকাবেলা করতে হলে মানুষকে বাস্তববাদী হতে হবে। সর্বদাই আদর্শের ঘোরে বন্দি না থেকে অভিজ্ঞতার জারক রসে ভাবনাগুলোকে সমন্বিত করতে হবে। স্বদেশি ও বৈশ্বিক—দুই ভাবনাই এই সমন্বয়কে জোরদার করবে। সে কারণেই রবীন্দ্রনাথ একাধারে বাঙালি ও বৈশ্বিক নাগরিক হতে পেরেছিলেন। আর এ কারণে তিনি আমাদের উন্নয়ন অভিযাত্রায় এতটা প্রাসঙ্গিক হতে পারছেন। আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনার সময় বারবার রবীন্দ্রনাথের উদ্ভাবনীমূলক ভাবনা থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সামাজিক দায়বদ্ধ উদ্যোগ নেওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। বিশেষ করে তাঁর গ্রামীণ উন্নয়ন ভাবনা আমাকে দারুণ উজ্জীবিত করেছে।

রবীন্দ্রনাথের সময়ের মতোই আজকের পৃথিবীও খুবই পরিবর্তনশীল। বিশ্বায়ন, শিল্পায়ন, নগরায়ণ, বৈষম্য, প্রযুক্তির প্রসারে নানা সুযোগ সৃষ্টি হলেও বৈষম্য, বিচ্ছিন্নতা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় সারা বিশ্বকেই উদ্বিগ্ন ও অস্থির করে রেখেছে। রবীন্দ্রনাথের পৃথিবী এক শ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারত। একই বিশ্বকে আজ সাত শ কোটি মানুষের খাওয়া-পরার দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই গ্রামীণ সমাজের বহুমাত্রিক সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিশেষ করে, শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর ভাবনা ও কর্ম অনেক সৃজনশীল ও বহুমাত্রিক। প্রযুক্তির ভালো ও মন্দ দিক নিয়ে তিনি ভেবেছেন। তিনি বরাবরই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল পুরো সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। এমনকি সাহিত্যকে ও বিজ্ঞানকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে নেওয়ার কথা তিনি বলে গেছেন। আইনস্টাইন, সত্যেন বসু ও জগদীশ বসুর মতো বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সাধারণ মানুষের স্বপ্নকে তিনি উসেক দেওয়ার চেষ্টা করতেন। 

চলমান বিশ্বে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের এই সময়ে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নিরসন, সবাইকে গুণ-মানের শিক্ষা প্রদান, সমাজ ও অর্থনীতির বৈষম্য দূর করা, বাসযোগ্য নগরায়ণ, প্রকৃতির সংরক্ষণ এবং সব মানুষের মঙ্গল নিশ্চিত করার এই নয়া পথ চলায় সম্মিলিত চিন্তা ও কর্মের কোনো বিকল্প নেই। রবীন্দ্রনাথ ‘গীতাঞ্জলি’তে লিখেছেন :

যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে/পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।/অজ্ঞানের অন্ধকারে/আড়ালে ঢাকিছ যারে/তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান।/রবীন্দ্র-রচনাবলী, গীতাঞ্জলী, পৃ. ৭৩

মিলিয়ে দেখুন চলমান ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর’ মূল চেতনা—‘কাউকে পেছনে ফেলা যাবে না’-এর সঙ্গে তাঁর ভাবনাগুলোর কতই না মিল! আর এখানেই রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিকভাবে এসে পড়েন। কেননা তিনি মনে করতেন, একলা মানুষ টুকরা মাত্র। আরো বলতেন, একা খেলে পেট ভরে; পাঁচজনে মিলে খেলে আত্মীয়তা বাড়ে। সারা জীবন তাই তিনি সৃজনশীল ও সম্মিলিত চিন্তা ও কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। মানবিকতাও তাঁর চলার পথে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তাই রবীন্দ্রনাথের চোখ, মন ও হূদয় দিয়ে যদি ফের বিশ্বকে দেখতে পাই এবং মানুষের চিরন্তন চাওয়া-পাওয়াকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখে সমাধানের সূত্র খুঁজে পাই, তাহলেই এই পৃথিবী নিশ্চয়ই আরো একটু বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। আর তাহলেই বরীন্দ্রনাথ বরাবরই প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা