kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

বই আলোচনা
শাহাদুজ্জামানের গল্পগ্রন্থ

মামলার সাক্ষী ময়না পাখি

লীনা দিলরুবা

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মামলার সাক্ষী ময়না পাখি

মামলার সাক্ষী ময়না পাখি : শাহাদুজ্জামান। প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা। প্রকাশক : প্রথমা প্রকাশন মূল্য : ২৪০ টাকা

শাহাদুজ্জামান তাঁর নিজস্বতা নিয়ে ছোটগল্পে একটা শক্ত আসন গেড়েছেন। বলা বাহুল্য, ছোটগল্পে তিনি এলুম-দেখলুম-জয় করলুম কাজটিই করে দেখিয়েছেন; উপন্যাসে তাঁর ব্যর্থতা যদিও পর্বতপ্রমাণ। গল্প লিখতে গিয়ে তিনি বিষয় নিয়ে যেমন নিরীক্ষা করেছেন, আঙ্গিক নিয়েও নানা কাজ করেছেন। গল্প রচনায় তাঁর মাত্রাবোধ চোখে পড়ার মতো।

সাম্প্রতিককালে যে গল্পগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে, এর নাম ‘মামলার সাক্ষী ময়না পাখি’।

বইতে গল্পের সংখ্যা এগারো। উল্লেখযোগ্য গল্পগুলো নিয়ে বলা যাক।

প্রথম গল্পটি, ‘জনৈক স্তন্যপায়ী প্রাণী, যিনি গল্প লেখেন’ একজন লেখকের মনস্তত্ত্ব নিয়ে তৈরি, যেখানে গল্পের চরিত্র মতিন কায়সার সারাক্ষণ ভাবে, তার লেখা গল্প গল্প হয়ে উঠছে কি? সে ভাবনার পর ভাবনা হাজির করে এবং উপসংহারে পৌঁছতে চায়। কিন্তু জীবন হয়তো উপসংহারে পৌঁছার সংগ্রামের নামই, উপসংহারে পৌঁছা নয়, তাই মতিন কায়সারের ভাবনাও কোথাও নোঙর গাড়ে না, কিছু ইঙ্গিত রেখে যায়।

গল্প হয়ে ওঠা কিংবা না হয়ে ওঠা, গল্পের আসল-নকল নিয়ে গল্পের প্রধান চরিত্র মতিন কায়সারের ভাবনাগুলো জড়ো হয়।

মতিন কায়সার ভাবে—

‘কনফেকশনারির দোকানের নানা কিসিমের বিস্কুটের প্যাকেটের মতো নানা কিসিমের গল্পে তার বিশ্বাস নেই। প্রগতিশীল গল্প,

 মাটিলগ্ন গল্প, উত্তর আধুনিক গল্প নয়, সে শুধু একটা হয়ে ওঠা গল্প লিখতে চায়।’

এখানে শাহাদুজ্জামানের নির্মোহতা টের পাই। আড়ম্বর নেই, আনুষ্ঠানিকতা নেই। গল্পটি মনে রাখার মতো।

‘চিন্তাশীল প্রবীণ বানর’। শক্তিশালী গল্প। শহীদুল জহিরের রচনার ঢঙে গল্পটি বর্ণনা করা হয়েছে। স্ত্রী-কন্যাকে রেখে আমেরিকায় চলে যায় একজন। মা-মেয়ের কাছে টাকা পৌঁছে দেওয়ার কাজ যে করে তার কারণে মেয়েটি গর্ভবতী হয়, সেখানে থাকে এক বানর, সে কিছু হলে অস্বাভাবিক শব্দ করে। মেয়েটির গর্ভপাত হয়, কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, মেয়েটির মায়ের সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটেছিল। শেষে দেখা যায় বানরটিকে চিন্তাশীল ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকতে। গল্পটিতে রূপক আছে। ইঙ্গিত আছে।

‘লবঙ্গের বঙ্গ ফেলে’ মনে রাখার মতো একটি গল্প। মোজাম্মেল আলীর কাঁঠালের ব্যবসা। তিনি বয়স্ক মানুষ। তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে মধুর সম্পর্ক ছিল। একটি মেয়ে, মেয়েটির বিয়ে হয়েছে, সন্তানও আছে। মেয়েটি থাকে আরেক গ্রামে। মোজাম্মেল আলীর দুর্ভাগ্য। হঠাৎ তাঁর স্ত্রী মারা যায়। মোজাম্মেল আলী হোমিওপ্যাথি ডাক্তার মোহাম্মদ বরকতের পরামর্শে এবং প্ররোচনায় আবার বিয়ে করে। নতুন স্ত্রী খুবই প্রাণবন্ত সামাজিক মেয়ে। অল্প বয়সী। এদিকে বাপের এই বিয়ে মোজাম্মেল আলীর কন্যা রেহানা মানতে পারে না। সে বাপের বাড়ি আসা বাদ দেয়। নিজে আসে না; কিন্তু মন তো পোড়ে। সে বাপের খবর নেওয়ার জন্য তার স্বামী রুহুল আমিনকে পাঠায়। রুহুল আমিন শ্বশুরবাড়িতে এসে শ্বশুরকে পায় না, পায় শ্বশুরের স্ত্রী নার্গিস পারভীনকে। এই পাওয়া শেষ পর্যন্ত ঠেকে নার্গিস পারভীনকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ায়। খবর শুনে রুহুল আমিনের স্ত্রী রেহানা আত্মহত্যা করে। গল্পটির বুনন, ভাষা, কাঠামো মন কাড়ার মতো। চরিত্র এবং পরিবেশের সঙ্গে সংগতি রেখে বর্ণনার ঢং পাঠককে আগ্রহী করবে।

‘মামলার সাক্ষী ময়না পাখি’। এই গল্পটিতে দেখা যায়, একদিকে সত্যের জয়, অন্যদিকে প্রতারণা, আবার মিথ্যার জয়জয়কার, যখন জিতে যায় ভেজালে ভরা মানুষও; কিন্তু সত্যিই কি শেষ পর্যন্ত মিথ্যা টিকে থাকে? একটি পাখি এবং বজলু নামের চরিত্রের মাধ্যমে লেখক কিছুটা মিথে ভরা গল্পের ওপর ভর করে কাহিনি সাজিয়েছেন। খুবই শক্তিশালী গল্প।

শেষ গল্প—নাজুক মানুষের সংলাপ। এটি একটি সংলাপনির্ভর গল্প। গল্পের কথক দুজন। উত্তরসূরি ও পূর্বসূরি। দুজন দুজনকে প্রশ্ন করে আর উত্তর দেয়। নির্মোহ কিছু সংলাপ। মানুষের জয়-পরাজয়। মানুষের সৃজনশীলতা। বাড়ি নিয়ে, নৈতিকতা নিয়ে, যৌনতা নিয়ে। দার্শনিক ভাবনার এই গল্পটি বারবার পড়ার মতো।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা