kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

নীলা

হাবিব আনিসুর রহমান

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



নীলা

অঙ্কন : বিপ্লব

আমি পাথরগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম অপলক চোখে। বিদ্যুতের আলোয় ধবধবে সাদা সিরামিকের বাটিতে চকচক করছিল ছোট ছোট লাল-নীল-সবুজ রঙিন পাথরগুলো! দোকানের ভেতর বসে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে বললাম—নীলা আছে আপনার কাছে? লোকটার পরনে সাদা লুঙ্গি, সাদা ফতুয়া। হাতের ১০ আঙুলে ১০টা আংটি। দুই হাতের কবজিতে দুটি কালো ব্রেসলেট, তাতেও পাথর বসানো। মাথায় সাদা বাবরি চুল। বুক পর্যন্ত ঝুলে পড়া লম্বা দাড়ি, তার সঙ্গে পাকানো বড় গোঁফ, সব সাদা। লোকটার বয়স ৬০-৬৫ হবে। কিন্তু শক্ত-সুঠাম দেহ। আমার চোখে চোখ রেখে লোকটা কিছু বলতে গিয়েও বলল না! বাধ্য হয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম—নীলা আছে আপনার কাছে? কোনো কথা না বলে তিনি ঝুঁকে পড়ে তর্জনী দিয়ে বাটির পাথরগুলো সরাতে লাগলেন। একটা তুলে এনে ছোট্ট পিরিচে রেখে তুলে ধরলেন; কিন্তু কোনো কথা বললেন না। তাঁর এই নীরবতায় ভেতরে ভেতরে ফুঁসছিলাম আমি। একবার মনে হলো, ধমক দিয়ে বলি—কথা বলছেন না কেন? পিরিচের ওপর স্বচ্ছ নীল রঙের পাথরটার ওপর আলো পড়ে চকচক করছিল। বললাম, এটা নীলা? তিনি মাথা নাড়লেন, অর্থাৎ নীলা।

দিন চারেক আগে একদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বড় বড় দোকানে যখন নীলা খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে বেরিয়ে আসছিলাম, তখন ডায়মন্ড হাউসের সামনে দেখা নকিব আশরাফীর সঙ্গে, আমাকে বলল—নীলা খুঁজছ, পেয়েছ এখানে? বললাম—হ্যাঁ, এখানে আছে, তবে দাম...। সে আমার হাত ধরে দূরে সরিয়ে এনে বলল—শোনো, ডায়মন্ড হাউসগুলোতে আকাশছোঁয়া দাম চায়, এরা সব দুনম্বরি, এই একই পাথর তুমি অন্য জায়গায় পাবে খুব কম দামে। বললাম, কোথায় সেটা? আশরাফী বলল, গুলশান লেকের পূর্ব দিকে, শাহজাদপুর গলির ভেতর পুরনো মসজিদের পাশে প্রাচীন একটা বটগাছ আছে, দেখবে ওই গাছটার নিচে ছোট্ট একটা দোকান, নাম চিশতিয়া, ওখানেই একটা কালো লোক বসে থাকবে, বয়স্ক কিন্তু বেশ গাট্টাগোট্টা, নাম জামাল চিশতি, তাকে বললেই পাবে। নকিবের কথায়ই এখানে এসে পেয়ে গেলাম চিশতিয়া। আমি চাঁদটার দিকে তাকালাম, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদের আলোও বাড়ছে। চিশতিকে জিজ্ঞেস করলাম—এটা আসল পাথর? সে এবার তার মুখটা ওপর-নিচ করল—অর্থাৎ হ্যাঁ, আসল। বললাম—দাম কত বলেন? কথাটা বলেই চিন্তা করতে লাগলাম, কাল রাতে ডায়মন্ড হাউসে আমাকে এ পাথরটাই দেখানো হয়েছিল, দাম বলেছিল ৩৫ হাজার টাকা!

কোনো নীলাই অভিজ্ঞ জ্যোতিষের পরামর্শ ছাড়া পরা উচিত নয়। নানা কথা ভেবে আমি যখন বিখ্যাত জ্যোতিষ শাহ আযম মাশরাফীর সামনে বসেছিলাম, তখন তিনি আমার জীবনবৃত্তান্ত শুনে বলেছিলেন, দেখি আপনার ডান হাতটা। গভীরভাবে হাতের রেখাগুলো পর্যবেক্ষণ করে বলেছিলেন, এখন খুব যন্ত্রণার মধ্যে সময় কাটছে আপনার, এসব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে একটা রত্ন লাগবে, লাগবে মানে খুব জরুরি। জ্যোতিষ মাশরাফী বলে যাচ্ছিলেন... এখন আপনার খাঁটি নীলার আংটি লাগবে আট রত্তি ওজনের, এর কম হলে চলবে না, নীলা ব্যবহার করলে আপনার জ্ঞান, গাম্ভীর্য বৃদ্ধি পাবে, শনিগ্রহ থেকে ভালো প্রবণতা এনে অতিরিক্ত ভোগপ্রবণতা কমাতে সাহায্য করবে। শেষে একবার থামলেন মাশরাফী, তারপর বললেন, নীলা ধারণ করলে অবৈধ যৌন সম্পর্কের ইচ্ছা নষ্ট হয়ে যাবে। খাঁটি নীলা পাথর আমার এখানে আছে, দাম পড়বে ৩০ হাজার টাকা।

পিরিচে রাখা নীল কিন্তু খানিকটা হালকা বেগুনি রঙের সুন্দর পাথরটার দিকে তাকিয়ে বললাম, দাম বললেন না, কত? অস্বাভাবিক কণ্ঠ চিশতির, বেশ কর্কশ গলায় বলল—এক হাজার টাকা। আমি অবাক হয়ে বললাম—এক হাজার! আমি দুই জাগায় জিজ্ঞেস করেছি, তারা দাম বলেছে অনেক টাকা, তাহলে? সে ফ্যাসফেসে কণ্ঠে বলল, আপনে কি একেবারে খাঁটি নীলা চান? হ্যাঁ, অবশ্যই খাঁটি নীলা চাই, আমি বললাম। চিশতি দোকানের ভেতর থেকে একটা ভারী লোহার বাক্স এনে দুটি তালা খুলল, তারপর ভেতর থেকে একটা কৌটা বের করল, কিছু সময় নিয়ে তার ভেতর থেকে একটা আংটি বের করে সাদা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে আমার হাতে দিয়ে বলল, খাঁটি নীলা বসানো, দেখেন। আমি খুব ঠাণ্ডা মাথায় পাথরটা দেখতে লাগলাম, লোকটা দোকানের ভেতরের অতিরিক্ত বাতিটা জ্বেলে দিয়ে বলল, এখন ভালো করে দেখেন। দেখলাম, কারুকার্য খচিত রুপার সাদা আংটির মধ্যে বসে আছে স্বচ্ছ নীলবর্ণ কিন্তু খানিকটা হালকা বেগুনি রঙের অপরূপ সুন্দর পাথরটা! বাল্বের উজ্জ্বল আলোয় চক চক করতে লাগল। আংটি দেখে একেবারে মুগ্ধ, বিস্মিত আমি, ভাবলাম, আগেরটা এক হাজার চেয়েছে, এটা হয়তো পাঁচ হাজার চাইবে—এই তো, এটাই নেব আমি। বললাম, এটা কোথাকার নীলা বলতে পারেন? কাশ্মীরের, নির্বিকারচিত্তে বলল সে। —এখানে এলো কী করে, আপনারা কি ইমপোর্ট করেন? —ইন্ডিয়ার এসব জিনিস আসে চোরাপথে, এগুলো আপনি কোনো হাউসে পাবেন না, এটা কাশ্মীরের খাঁটি নীলা, খুব ভালো করে দেখেন। —আপনি কি ইন্ডিয়া যান? —হ্যাঁ, আজমীর শরিফ বাবার ওরসে যাই, তখন এগুলো আনি। আমার মনে হলো, সে আমাকে মিথ্যা বলছে না। বললাম, এখন দাম বলেন? চিশতি বলল, ২০ হাজার টাকা, একটা পয়সাও কম হবে না। —১৫ হাজার দিলে হবে? যদি হয় তাহলে এখনই নিয়ে যাব আংটিটা। সে মাথা নেড়ে আমার হাত থেকে আংটিটা নিয়ে কৌটার মধ্যে পুরতে যাচ্ছিল। আমি মানা করলাম, একটু দাঁড়ান। পকেট থেকে টাকা বের করে গুনে দেখলাম, মোট ১৫ হাজার ৭৫০ টাকা আছে। ওর হাতে টাকাটা দিয়ে বললাম, এখানে মোট ১৫ হাজার ৭৫০ টাকা আছে, আগামীকাল বাকি টাকাটা দিয়ে যাব, আংটিটা আমাকে দিয়ে দিন। আমার আশঙ্কা হলো, আমি এখন এটা নিতে না পারলে অন্য কেউ নিয়ে যাবে, কারণ এটা খাঁটি নীলা বসানো আংটি, চোরাপথে মাঝেমধ্যে এমন মহামূল্যবান জিনিস চলে আসে, যারা এসব পাচার করে তারা নগদে যা পায় তা নিয়েই ছেড়ে দেয়। লোকটা আমার কথা শুনে হ্যাঁ, না কিচ্ছু বলল না, আংটিটা কৌটার মধ্যেই রেখে তালা দিয়ে দিল বাক্সে। বাধ্য হয়ে বললাম, আচ্ছা সকালে দোকান খুলবেন কয়টায়? —১০টায়। ঘড়ি দেখলাম। এখন রাত ১১টা। তখনো চারপাশের সব কিছু ভাসছে চাঁদের আলোয়।

গাড়ি ডান দিকে ঘোরালাম। সোজা পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে লিফটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। দারোয়ান গনি নিত্যদিনের মতো আজও সালাম দিল, কিন্তু আজ হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল—স্যার, ম্যাডামরে দেখি না কয়দিন, খাওন আইনা দিতে হইব? —না, না, খাবার লাগবে না।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদের আলোর তীব্রতা বেড়ে চলেছে। আমি আমার ফ্ল্যাটের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। উত্তর দিকে তাকালাম। দূরে হাইওয়ের দিকে চোখ গেল, উড়াল সেতুর ওপর দিয়ে শাঁ শাঁ করে ছুটে যাচ্ছে গাড়িগুলো। নিচে তাকাতেই চোখে পড়ল—সামনের গার্ডেনের পাশের সবুজ লনে দাঁড়িয়ে আছে গনি মোল্লা, তার পাশে মোটাসোটা একটা জাগুয়ার, না না একটা বিড়াল, কালো কুচকুচে গায়ের রং, আমি পাঁচ তলার ওপর থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি বিড়ালটা, দুটি চোখ জ্বলজ্বল করছে। রাত পৌনে ১২টা। হঠাৎ মনে হলো, দরজার ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, ফিসফিস করে কথা বলছে! দ্রুত দরজা খুলে ফেললাম। ঝিরঝিরে একটা বাতাস এসে ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতর, আমার সামনে কেউ নেই! এখন খেতে হবে কিছু, তারপর ঘুম।

কিন্তু ঘুমের বড়িতে কোনো কাজ হচ্ছে না! ফ্রিজে সকালে কেনা পাউরুটি আর ডিম ছিল, টেবিলে এনে রাখলাম। ফ্রেশরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে কিচেনে ঢুকলাম। ডিম ভাজা দিয়ে রুটি খেয়ে শুয়ে পড়লাম।

রাতে ঘুম আসে না কিছুতেই। আমার মনে হয়, আমার ঘুমের খুব দরকার, একটা বড়ি খেলে ঘুম আসতে চায় না, আজ দেড়খানা বড়ি খেয়ে নিলাম। সময় যেতে লাগল। তবু আমার ঘুম আসতে চায় না কিছুতেই, আধো ঘুম, আধো জাগরণের ভেতর ভেতরটা তোলপাড় করতে লাগল। আজ গাড়ি থেকে নামতেই গনি বলল, ম্যাডামরে দেখি না কয়দিন। নিশ্চয়ই গনি আর সিকিউরিটির লোকগুলো আমাদের স্বামী-স্ত্রীর বিষয় নিয়ে নানা কথা বলবে। শারমিন অধ্যাপকের মেয়ে বলে সব সময় নীতিকথা শোনায়, পরোক্ষভাবে বোঝাতে চায়, সে আর তার মা-বাবা খুব ভালো। বাবাকে ভালো বলে; কিন্তু তার স্বামী অর্থাৎ এই আমি আদনান শরিফ, কই আমাকে তো শারমিন ভালো বলে না কখনো! ওর বিশ্বাস, আমি যে পেশায় আছি, সেটা খুব খারাপ—ঠিকাদারি, সঙ্গে পার্টির একজন কনিষ্ঠ লিডার আদনান ভাই, আমার চলাফেরাও ভালো লাগে না ওর! রাগ করে বাপের বাড়ি যাব যাব করে শেষ পর্যন্ত চলেই গেল। এত করে বললাম, আমার এখন খুব খারাপ সময় যাচ্ছে, একটা বিশাল কাজ ঝুলে আছে সামনে, ওটা পেয়ে গেলেই সব দুশ্চিন্তা চলে যাবে মাথার ভেতর থেকে, আমি সাধ্যমতো সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, চারপাশে লোক লাগিয়েছি, কিন্তু তাদের...। শুনল না, চলে গেল শারমিন। যাওয়ার সময় বলে গেল, টাকা টাকা করে তুমি পাগল হয়ে গেছ। গত পরশু রাতে মিলা জানিয়েছিল, নওরীন গ্লোরিয়া জিনসে বসে কফি খাচ্ছে, সঙ্গে অপরিচিত এক লোক, লোকটাকে চিনতে পারলাম না মোটেও! তার পর থেকে ঘুরেফিরে বারবার মিলার কথাটাই প্রতিধ্বনিত হতে লাগল আমার চারপাশে...নওরীনের সঙ্গে এক লোককে দেখলাম গ্লোরিয়া জিনসে বসে কফি খাচ্ছে, লোকটাকে চিনতে পারলাম না! গতকাল সকালে নওরীনকে ফোন দিয়েছিলাম, ফোন বন্ধ। রাতের বেলা আবার মিলার ফোন এলো...অদনান ভাই, একটু আগে নওরীনকে দেখলাম সেই অপরিচিত লোকটার সঙ্গে নর্থ এন্ড কফি রোস্টারে বসে কফি খাচ্ছে, আমি দুবার ফোন দিলাম; কিন্তু সে ফোন বন্ধ রেখেছে।

 

আজ বেশ দেরি করে ঘুম ভাঙল আমার। মনে হলো, মোবাইল ফোনটা অনেকক্ষণ ধরে বাজছে। হুড়মুড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। সমস্ত শরীর ঘেমে গেছে! মনে হলো, সারা রাত দৌড়েছি। নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে। ফোনটা এখনো বাজছে! ঘড়ি দেখলাম, ঠিক ১১টা। পর্দার পাশে খোলা জানালা দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে সারা ঘরে। আকাশটা মেঘলা। বাইরে রোদ নেই। মনে হলো, সারা রাত বৃষ্টি হয়েছে। কেমন যেন ঠাণ্ডা আর নীরবতা আমার চারপাশে। হঠাৎ মনে পড়ল—চিশতির নীলা! হায়! আমার নীলা! এখন কী হবে, মাঝরাতের দিকে ঘুমটা এসেছিল, এখন সকাল ১১টা, ১০টায় যেতে বলেছিল চিশতি। পাথরটা তাহলে হাতছাড়া হয়ে গেল নাকি? সকালে এসে নিয়ে গেল নাকি কেউ! এখন ফোনের কল হিস্ট্রি দেখার সময় নেই। নীলা হাতছাড়া করা যাবে না। দ্রুত চোখেমুখে পানি দিয়ে টাকা পকেটে পুরে নিচে নেমে গেলাম। নাশতা হোটেলে সেরে নেব, সবার আগে চিশতির কাছে যেতে হবে।

গাড়ি থেকে নেমে দেখলাম, চিশতির মুখটা মলিন। ওর মুখ দেখে ভীষণ ঘাবড়ে গেলাম। পাথরটা বিক্রি করে দিয়েছে নাকি! আমার ভেতরের তোলপাড় চেপে রেখে বললাম, দিন আংটিটা, পুরো টাকা এনেছি। চিশতি যেটা বলল সেটা খুব খারাপ। সে বলল, আমার তো ভীষণ ভয় করছে। আমি বললাম, কেন, কেন, ভয় কিসের? —কাল রাতে আপনি চলে যাওয়ার পর একজন লোক আসছিল, সঙ্গে দুইটা মস্তানজাতীয় ছেলে, তারা যেকোনোভাবেই হোক না কেন, খোঁজ পেয়েছে যে নীলা বসানো আংটিটা আমার কাছে আছে। আমি বলেছি, আপনি ১৫ হাজার টাকা অ্যাডভান্স করে গেছেন, সকালে এসে নিয়ে যাবেন। ওদের একজন বলেছে, আমরা ২৫ হাজার টাকা দেব, আংটি আমাদের দিন, আমি দিইনি, বলেছি আগামীকাল সকাল পর্যন্ত দেখব। চিশতি মিথ্যা বলছে না, আমিও এমন আশঙ্কা করছিলাম। দ্রুত আমি পকেট থেকে ২০ হাজার টাকা বের করে চিশতির হাতে দিয়ে বললাম, তাড়াতাড়ি আংটিটা দিন, আমি এখনই চলে যেতে চাই।

আংটিটা কাগজে মুড়িয়ে আমার হাতে দিতেই গাড়িতে গিয়ে স্টার্ট দিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, তখনই গিয়ারে হাত দেওয়ার আগে দুজন যুবক আমার পথ আগলে দাঁড়াল। একজন গাড়ির সামনে, আরেকজন উইন্ডোর পাশে। বললাম, গাড়ির সামনে কেন? একজন বলল, চিশতিরে আমরা বলছি ২৫ হাজার দিমু, সে রাজি হইছে, আপনে আংটি ফিরাইয়া দেন ভাই, আংটি নিয়া যাইতে না পারলে বস আমাগো দুইটারে গুলি কইরা মারব, আংটি দিয়া দেন। আমি একটু ঘাবড়ে গেলেও আমার পকেটে একটা সাহস থাকে সব সময়, এটা আমার নিত্যসঙ্গী। উইনডোর পাশে দাঁড়ানো যুবক হঠাৎ স্টিয়ারিংয়ের ওপর রাখা হাতটা চেপে ধরে বলল, জলদি আংটি বাইর কর। মনে হলো এরা কিছু চায়। পকেট থেকে ৫০০ টাকার একটা নোট বের করে তাকে বললাম, এটা নিয়ে চলে যাও, মিষ্টি খেয়ো। সে জঘন্য ভাষায় গালি দিয়ে বলল, তোরে যাইতে দিমু না, আংটি বাইর কর জলদি। —দেখো, আংটিটা আমি টাকা দিয়ে কিনে এনেছি, তোমরা জোর করে কেড়ে নিতে চাও? —হ, কাইড়া নিতে চাই, জলদি বাইর কর আংটি। হঠাৎ যুবক আমার বুকপকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল। সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে যুবকের বুকে ধরে বললাম, স্টিয়ারিং ছাড় কুকুরের বাচ্চা, গুলি করে মারব। রিভলবার দেখে তারা ঘাবড়ে গিয়ে ছেড়ে দিল আমাকে। ওরা দুজন পেছন দিকে সরে যেতেই দ্রুত গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলাম। ভাবলাম, এখন ঘরে ফেরা ঠিক হবে না। সোজা গুলশানে মিলার ফ্ল্যাটের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। দূরে গিয়ে গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়ে গুলশানের পরিচিত একটা রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়ালাম। নাশতা সেরে তারপর মিলার ওখানে গেলেই হবে। স্টেরিওতে আমার প্রিয় গানটা ছেড়ে দিয়ে পকেট থেকে আংটিটা বের করলাম।

গাড়ির ভেতরে মাতাল করা গানের শব্দ, খুব পুরনো সেই গানটা, বনিএমের সেই লম্বা কৃষ্ণসুন্দরী গেয়ে চলেছে—লাভ ফর সেল...। সাড়ে ১২টার দিকে ফোনের কল হিস্ট্রি দেখলাম, চারবার ফোন দিয়েছে নওরীন। নওরীনকে ফোন করার আগে আমি আংটিটা বের করে দেখতে লাগলাম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, সাদা রুপার আংটির মাঝখানে চকচকে নীলা পাথরটা হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে! আহা! একটা গাঢ় চুমু খেলাম। আঙুলে পরলাম আংটিটা, ওটা পরেই ফোন করলাম নওরীনকে। দুবার রিং বাজতেই নওরীন চিত্কার করে উঠল—আদনান ভাই, আমি পেরেছি, কাজটা আপনিই পাচ্ছেন। আমি বললাম, তুমি এখনই গুলশানের স্কাই ভিউ রেস্টুরেন্টে চলে এসো, কোনো সমস্যা? —সমস্যা নেই, তবে... লোকটা সারা রাত, উহ! একেবারে হাঙরের মতো গিলে খেয়েছে আমায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা