kalerkantho

সোমবার । ২৪ জুন ২০১৯। ১০ আষাঢ় ১৪২৬। ২০ শাওয়াল ১৪৪০

ধারাবাহিক উপন্যাস মত্স্যগন্ধা

মত্স্যগন্ধা

হরিশংকর জলদাস

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



মত্স্যগন্ধা

অঙ্কন : মানব

শান্তনু বেশ কিছুটা বিস্ময়ে রূপময়ীর দিকে তাকালেন। এভাবে তাকানোর হেতু আছে। একজন রূপসী যুবতীকে বিয়ের প্রস্তাব দিতেই রাজি হয়ে গেল! এ রকম করে রাজি হয়ে যায় কেউ! শান্তনুর এ বিষয়ে খুব বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু সমাজ-সংসারেরই তো মানুষ তিনি। তাঁর সামান্য জীবনাভিজ্ঞতা বলে, রূপময়ীর এ রকম একবাক্যে সম্মতি জানানো সত্যিই অবাক করার।

নিজেকে সংহত করলেন রাজা শান্তনু। ব্যক্তিজীবনে তিনি ধীরস্থির। নিজের মধ্যে চঞ্চলতাকে বাড়তে দিলেন না। বললেন, ‘কী সেই শর্ত?’ এবার রূপময়ীর অবাক হওয়ার পালা। তার সম্পর্কে কিছু না জেনেই এ ধরনের প্রস্তাব। প্রেম নিবেদন নয়; কে তুমি, কোত্থেকে এসেছ, মাতা-পিতা কে—এসবের কিছুই জিজ্ঞেস না করে একেবারে বিয়ের প্রস্তাব। এ তো অবাস্তব, এ তো অবিশ্বাস্য! এ রকম একজন সুদর্শন যুবকের কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব যেকোনো নারীকেই তো চমকে দেবে! রূপময়ীকেও চমকে দিয়েছিল।

কিন্তু রাজা শান্তনুর প্রস্তাবে রূপময়ী বিহ্বল হয়নি। কারণ সে শান্তনুকে চিনত। শুধু সে কেন, বিস্তৃত-বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি মহারাজ শান্তনুকে কে না চেনে? পরম প্রাজ্ঞ, অতিশয় ধীমান, ক্ষমাশীল, সত্যবাদী শান্তনু এই বয়সেই যে কুরুরাজ্যে কিংবদন্তিতুল্য হয়ে গেছেন।

এ ছাড়া রূপময়ীর রাজা শান্তনুকে চেনার আরো একটা কারণ ছিল। এই শান্তনুর ঔরসে নিজের গর্ভে সন্তান ধারণের আশা বহুদিনের রূপময়ীর। শান্তনুকে নিজের করে পাওয়ার জন্য বহু কাঠখড় পোড়াতে হবে—এ রকমই ধারণা ছিল রূপময়ীর। কিন্তু রাজা শান্তনুর আচমকা প্রস্তাবে ওই ধারণা ওলটপালট হয়ে গেল।

রাজা আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার শর্ত কী রূপময়ী? তোমার পাণি প্রার্থনা করেছি আমি। রাজিও হয়েছ। কিন্তু এই সম্মতির মাধ্যখানে শর্তের কথা বললে তুমি। তুমি কি আমাকে সেই শর্তের ব্যাপারটা বোঝাবে?’ অত্যন্ত নরম কণ্ঠে কথাগুলো বলে গেলেন শান্তনু। কথা শেষ করে রূপময়ীর দিকে পূর্ণ চোখে তাকালেন রাজা। রাজা দেখলেন—রূপময়ীয় চোখে কামকটাক্ষ। নরপতি হওয়ার সুবাদে নানা রূপসী রমণীর মুখোমুখি হতে হয়, হতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু এ রকম সুন্দরীর মুখোমুখি হননি কোনো দিন তিনি। এ যে অসামান্য সুন্দরী। এর সৌন্দর্য যে কোনো কিছুর সঙ্গে, কোনো নারীর সঙ্গেই মেলে না। এ নারী শুধু অশ্রুতপূর্বাই নয়, অভূতপূর্বাও।

প্রথম দেখায়ই রূপময়ীর প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করেছিলেন শান্তনু। কামনার আকর্ষণ। কামের আকর্ষণ। কামনা ধীরে ধীরে রাজার মধ্যে সংহত হয়েছে। কামনা পুড়ে পুড়ে ভালোবাসার জন্ম হয়। রাজার মধ্যেও সেই ভালোবাসা এখন। কাউকে ভালোবাসার জন্য দীর্ঘ সময়ের দরকার হয় না। ভালোবাসার জন্ম হয় হঠাৎ। কেউ কাউকে অকস্মাৎই ভালোবাসে ফেলে। রূপময়ীকে ভালোবাসার জন্য তাই দীর্ঘ সময়ের দরকার হলো না শান্তনুর। তাঁর মন যেই না বলল—সামনে দাঁড়ানো নারীটি শুধু তোমারই জন্য, তখনই বলে উঠলেন—তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে...? এ রকমই হয়—যে পুরুষ আগে কখনো নারী সংসর্গ করেনি, নারী সান্নিধ্যের অভিজ্ঞতা নেই যে যুবকের, তার তো জানার কথা নয় কিভাবে একজন রমণীর সঙ্গে কথা পাড়তে হয়? তাইতো অনভিজ্ঞ শান্তনু এ রকম করে রূপময়ীর পাণি প্রার্থনা করে বসলেন।

রূপময়ী দৃষ্টিতে বাসনার লেলিহান শিখা ছড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি কে আপনার জানতে ইচ্ছা করছে না?’

‘ইচ্ছা! হ্যাঁ, ইচ্ছা করছে তো!’ দূরে দাঁড়ানো দেহরক্ষীদের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন রাজা শান্তনু। তারপর নারীটির দিকে তাকাতেই প্রশ্নটি কানে এলো, ‘তা হলে? তাহলে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন না যে?’

‘পরিচয়! ঠিকই তো, তোমার পরিচয় কী রূপময়ী? মানে তোমার মা-বাবার, নিবাস?’ এবার খলবল করে হেসে উঠল রূপময়ী। হাসতে হাসতেই বলল, ‘আমার পরিচয়ের ব্যাপারটা না হয় অন্য একটা দিনের জন্য তোলা থাকুক, নরেশ।’

‘তাহলে!’ রাজা বললেন।

‘আগে শর্তটার কথা বলি।’ বলল রূপময়ী।

‘না রূপময়ী, আগে তোমার পরিচয় বলো।’ ধীর কণ্ঠে শান্তনু বলে উঠলেন।

স্মিত হেসে রূপময়ী, বলল, ‘দেওয়ার মতো আমার যে কোনো পরিচয় নেই মহারাজ!’

‘এ কথাটা কি আমাকে বিশ্বাস করতে বলো? মানুষ হয়ে জন্মেছ। প্রত্যেক মানুষের মা-বাবা আছে। তোমারও আছে নিশ্চয়ই। তাঁদের কথা বলো।’

‘আমার যে স্বাভাবিক জন্ম নয়! মানুষের মতো দেহ হলেও প্রকৃত মানুষ যে আমাকে বলা যাবে না রাজামশাই।’ বিড়বিড় করে আপন মনে বলে গেল রূপময়ী। রাজা শুনতে পান মতো করে বললেন, ‘আমার মাতা-পিতার দেওয়ার মতো তেমন পরিচয় নেই।’

‘যেটুকু আছে, তা-ই বলো তুমি।’ রাজা বুঝলেন, এ বুঝি রূপময়ীর বিনয়। বিনয় রাজা পছন্দ করেন। রূপময়ীর বিনয়ে রাজা আরো বেশি তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়লেন।

রূপময়ী দেখল—তার পরিচয় জানার জন্য রাজা অনড়। সে একটু হেঁয়ালির আশ্রয় নিল। বলল, আমার বাবার নাম নগেন্দ্র নাথ। মানুষরা তাঁকে সংক্ষেপে নগ বলে ডাকে। আর মায়ের নাম মনোরঞ্জনী।’

‘বাহ্! বেশ নাম তো! বিশেষ করে তোমার মায়ের নামটি তো অসাধারণ—মনোরঞ্জনী! অসাধারণ, অপূর্ব!’ বললেন শান্তনু।

তারপর রাজা হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার নাম কী?’

এবার খলখল-ছলছল করে হেসে উঠল যুবতীটি। হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ার উপক্রম হলো তার। বলল, ‘একি বলছেন রাজামশাই। আমার নাম তো আপনি দিয়েই দিয়েছেন। ওই যে রূপময়ী বলে সম্বোধন করা শুরু করলেন না আপনি?’

কিছু সময়ের জন্য রাজা থমকে থাকলেন। তারপর বললেন, ‘ও তো এমনি এমনি বলেছি আমি তোমায়। তোমার নাম জানি না। কিন্তু তোমাকে সম্বোধন করতে হচ্ছে আমাকে। হঠাৎ মনে এলো রূপময়ী নামটি। তাইতো ওই নামে ডাকলাম তোমায়।’

‘আপনার দেওয়া নামটির অতলে আমার আসল নামটি হারিয়ে যাক না। আপনার দেওয়া নামটির মধ্যে আমি আমার সব কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছি। তা ছাড়া...।’ বলে থেমে গেল তরুণীটি।

‘তা ছাড়া কী—!’ ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন শান্তনু। রহস্যময় কণ্ঠে তরুণীটি বলল, ‘তা ছাড়া আমার আসল নামে কোনো ব্যঞ্জনা নেই, কোনো গূঢ়ার্থ নেই। ও নাম বহু চর্চিত, বহু পুরনো।’

রাজা বললেন, ‘তোমার কথার সব মর্মার্থ আমি ধরতে পারছি না রূপময়ী।’

‘না ধরতে পারার মধ্যেই আনন্দ। না ধরতে পারার মধ্যেই আপনার আর আমার বাসনা পূরণের সব তৃপ্তি লুকিয়ে আছে। আমি আপনার কাছে রূপময়ী। রূপময়ী নামটা আমাকে ভীষণ টানছে রাজামশাই।’

‘তাহলে তা-ই থাক। আমার কাছে তুমি রূপময়ী হয়েই থাকো।’

‘এর চেয়ে বেশি আনন্দ অন্য কিছুতে পাব না আমি।’ তৃপ্তির চোখে বলল রূপময়ী।

রাজা এবার বলল, ‘শর্তের কথা...।’

শান্তনুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রূপময়ী বলল, ‘আমার নিবাসস্থলের কথা আপনার জানা দরকার, রাজা।’

‘হ্যাঁ, তাইতো! থাকো কোথায় তুমি?’ ‘সলিলে আমার বিচরণ, ভূমিতে আমার ভ্রমণ। দুটিই আমার কাছে প্রিয়। আমি জলের যেমন, স্থলেরও তেমনি।’

রূপময়ীর পরিহাসময় এ রকম কথায় রাজা অনেকটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন। প্রথম থেকেই এই নারীটির কথাবার্তা অস্বাভাবিক। আচরণ বিনয়ে ভরা, কিন্তু দুর্বোধ্য। এই অস্বাভাবিকতা, এই বিনয় আর এই দুর্বোধ্যতারও সৌন্দর্য আছে। ওই সৌন্দর্যেই মগ্ন হয়ে পড়েছেন রাজা শান্তনু। এই মগ্নতা রূপময়ীর প্রতি তাঁকে আরো বেশি একাগ্রচিত্ত করে তুলল।

গাঢ় অথচ শান্ত কণ্ঠে শান্তনু বললেন, ‘আমাকে বিয়ে করতে তোমার আপত্তি নেই বলেছ। বলেছ, একটি শর্ত আছে। এখন কি তুমি তোমার সেই শর্তের কথা বলবে?

রূপময়ী রাজার গাঢ় কণ্ঠস্বরের মর্মার্থ বুঝতে পারল। সে বুঝে নিল—রাজা শান্তনু তার দেহসান্নিধ্য পেতে বদ্ধপরিকর। তাঁর চোখ বলছে, তার লোভাতুর জিব বলছে, তার কপালের স্বেদবিন্দু বলছে—আমি তোমাকে পেতে চাই সুধাময়ী। তোমার দেহসরোবরে অবগাহন করে আমি শান্ত হতে চাই।

রূপময়ীর মন বলল—তুমি রাজার ওপর সব কিছু চাপিয়ে দিচ্ছ কেন? তুমিও কি কামুক হয়ে উঠোনি? তোমার চোখ-ভ্রু-কপোল-কপাল তো তুমি নিজে দেখতে পাচ্ছ না, দেখতে পেলে বুঝতে, তোমার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জানান দিচ্ছে তুমি ভোগতৃষ্ণায় ছটফট করছ। রাজা শান্তনু যে তোমার কাছে পরমাকাঙ্ক্ষিত, সেটা কি তুমি অস্বীকার করবে? অস্বীকার করতে পারবে তুমি?

রূপময়ী ভাবে আর পায়ের কাছের মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে।

‘কী রূপময়ী, বলবে না? তুমি কি আমাকে বিয়ে করার ব্যাপারে দ্বিধান্বিত?’

রূপময়ী বিচলিত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘না না! দ্বিধান্বিত হব কেন? কোনোভাবেই ধন্ধে ভুগছি না আমি।’ তাহলে তোমার শর্তটা কী—, বলো রূপময়ী।’

‘শর্ত!’ অনেকটা আনমনে জিজ্ঞেস করল রূপময়ী। ‘হ্যাঁ, শর্ত। তুমি আমার দিকে তাকাও। সত্যি করে বলছি, তোমাকে আমি আমার পত্নীরূপে পেতে চাই। তোমাকে দেখার আগে অনেক রমণীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে আমার। কিন্তু কখনো মনে হয়নি ওই নারীটি আমার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য। আজ তোমাকে দেখার পরই আমার মনে হলো, তোমার জন্যই বুঝি আমি এত দিন অপেক্ষা করেছিলাম।’

সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলল রূপময়ী। রাজার চোখের ওপর চোখ রেখে দৃঢ়কণ্ঠে বলল, ‘বিয়ের পর আমার কোনো কাজে বাধা দিতে পারবেন না।’

‘কোনো কাজে বাধা দিতে পারব না!’ কিছুটা হতবিহ্বল গলায় বললেন ভূপতি শান্তনু। রূপময়ী বলল, ‘সেই কাজ ভালো হোক, কি মন্দ হোক, আপনি বাধা দেবেন না।’ একটু থামল রূপময়ী, বলল, ‘শুধু তা-ই নয়, কোনো অপ্রিয় কথাও বলতে পারবেন না।’

‘মানে!’ গভীর বিস্ময়ে শান্তনু বললেন, ‘মহিষী হয়ে যা তুমি করবে, তাতেই অনুমোদন দিতে হবে আমায়!’

‘শুধু অনুমোদন নয়, মেনেও নিতে হবে আপনাকে।’

‘মেনেও নিতে হবে!’

‘ওই-ই আমার শর্ত। যদি মানেন এক্ষুনি আপনার স্ত্রী হয়ে রাজপ্রাসাদে যাব আমি।’ রূপময়ীর চোখে তখন দেহ উতরোল করা চাহনি। ওই চাহনির তরঙ্গাঘাতে রাজা নিজেকে স্থির রাখতে পারছেন না। তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলেন। রূপময়ীর ডান হাতটা নিজের করতলে টেনে নিলেন। কামার্ত রাজা শান্তনু বললেন, ‘ঠিক আছে রূপময়ী, এই শর্তের বিনিময়েও আমি তোমাকে চাই। আমাকে পরিতৃপ্ত করো নারী।’

বিমুগ্ধ কণ্ঠে রূপময়ী বলল, ‘রাজপ্রাসাদে চলুন রাজা।’

রাজার হাত ধরে সামনের দিকে পদক্ষেপ দিতে দিতে রূপময়ী বলল, ‘যেদিন আমার কাজে বাধা দেবেন অথবা অপ্রিয় কথা শোনাবেন, সেদিন-সেদিনই আপনাকে ত্যাগ করে চলে যাব আমি।’ কামজর্জর শান্তনু ঘোর লাগা কণ্ঠে বললেন, ‘আমি রাজি দেবী। তোমার কোনো কাজেই বাধা দেব না আমি। কথা দিচ্ছি। শপথ নিচ্ছি।’

►  চলবে

মন্তব্য