kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

মে দিবসের স্বপ্নকল্প

ফিরোজ আহমেদ

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মে দিবসের স্বপ্নকল্প

অঙ্কন : মাসুম

‘আট ঘণ্টা শ্রম, আট ঘণ্টা বিনোদন, আট ঘণ্টা বিশ্রাম’ মানবজীবনের জন্য এই আদর্শ বন্দোবস্তের কথা প্রথম কল্পনা করেছিলেন একজন কল্পসমাজতন্ত্রী রবার্ট ওয়েন, ইংল্যান্ডে। ১৮১০ সালে। তখন ইংল্যান্ডের কারখানাগুলোতে ১৬ ঘণ্টা কাজেরও রেওয়াজ ছিল। বস্ত্রশিল্পে একেবারে নাবালক শিশুরাও কাজ করত। এমনকি ১৮৪২-৪৫ সালে ম্যানচেস্টারে তার বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস যখন ‘ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির দশা’ নামে তাঁর বিখ্যাত রচনাটি লেখেন, তাতে তিনি দেখেছিলেন প্রাক-শিল্পবিপ্লব ইংল্যান্ডের তুলনায় বস্ত্রশিল্পের শ্রমিকদের আয়, কর্মঘণ্টা এবং অসুখের প্রকোপ বহুগুণ বেশি। এই গ্রন্থেরই ১৮৯২ সালের নতুন সংস্করণের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণির পরিস্থিতির তুলনামূলক অগ্রগতির কথা। কিন্তু সেই সঙ্গে জানিয়েছিলেন জার্মানি, ফ্রান্স আর যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিকশিত শিল্প-কারখানার শ্রমিক শ্রেণির একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার সংবাদ।

শিল্পায়ন জন্ম দিয়েছে আধুনিক শ্রমিক শ্রেণিকে। আধুনিক শ্রমিক শ্রেণি তার অস্তিত্বের স্বার্থে জন্ম দিয়েছে আধুনিক গণতন্ত্রের এবং পুঁজিবাদের আমলে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে গণমানুষের অধিকারকে, তাদের সৃষ্টিশীলতার বিকাশের সুযোগকে। প্রাচীন গ্রিসের গণতন্ত্রের ভিত্তি ছিল দাসশ্রম, অবসরভোগী নাগরিকরা যেখানে দর্শনচর্চার অখণ্ড অবসর পেতেন। ১২১৫ সালের ম্যাগনাকার্টার গণতন্ত্র বলতে বোঝানো হতো শুধু ব্রিটিশ অভিজাতদের অধিকার রক্ষাকে, রাজার একচেটিয়া কর্তৃত্বের হাত থেকে। রাজার রক্ত ঝরিয়ে যুক্তরাজ্যে যে গণতন্ত্র কায়েম হয়েছিল, ১৬৪৯ সালে গণতন্ত্রে সম্পত্তিবান শ্রেণিই ছিল শুধু ভোটাধিকারসম্পন্ন। কিন্তু আধুনিক নগরবাসী শ্রমিক শ্রেণি ভোটাধিকার পেয়েছে শ্রমিক আন্দোলনের সুবাদে, ইংল্যান্ডে ১৯১৮ সালে। নারীদের ভোটাধিকারও শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের ফসল। শুরুতে যে রবার্ট ওয়েনের কথা বলা হলো, তিনিই ছিলেন সর্বজনীন ভোটাধিকারের সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক। যুক্তরাষ্ট্রের মতো যেসব ইউরোপীয় অভিবাসীতে পূর্ণ দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পত্তিবান অংশের শুধু সবার ভোটাধিকার ছিল, আধুনিক শিল্প বিকাশের শুরুর দিকটায় সেখানে অভিবাসী শিল্পশ্রমিকদের ভোটাধিকার বঞ্চিত করে রাখা হতো। এই শ্রমিকদের আমদানি হতো কোত্থেকে? আগেকার ধাপে বেশির ভাগ নাগরিক ব্রিটিশ বা আইরিশ হলেও এবার ইউরোপ থেকে আগমন শুরু হলো, যে দেশগুলো তখন নতুন শিল্পায়নের প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ মানুষকে উদ্বৃত্ত শ্রমিক বানিয়ে ফেলেছিল, সেই অঞ্চলগুলো থেকেই সবচেয়ে বেশি অভিবাসী আসছিল। তাদের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি ছিল জার্মান উদ্বাস্তু। যুক্তরাষ্ট্রে মে দিবস প্রধানত এই অভিবাসী শ্রমিকদেরই কীর্তি।

‘আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন, আট ঘণ্টা বিশ্রাম’—এই দাবিটি এক অর্থে যন্ত্রযুগের প্রধান দ্বন্দ্বকে মূর্ত করেছে। আর্করাইটের সুতা কাটার যন্ত্র বা জেমস ওয়াটের বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের যে প্রয়োগকে যন্ত্রযুগের সূচনাবিন্দু হিসেবে গণনা করা হয়, তার প্রধান লক্ষ্য ছিল মুনাফা বৃদ্ধি। ফলে যন্ত্রের কর্মক্ষমতায় বৈপ্লবিক বদল আনা এই প্রযুক্তিগুলো একই সঙ্গে রাতারাতি হয়ে দাঁড়াল কর্মসংস্থানহীনতা, আর শিশুশ্রমিক নিয়োগের মতো সামাজিক ব্যাধির জন্মদাতা। একই সঙ্গে বিপুল বেকারত্বের সুযোগে প্রকৃত মজুরি হ্রাস, কর্মঘণ্টার বৃদ্ধির দুর্বিষহ প্রকোপও শুরু হলো। সমাজের সাংস্কৃতিক মান নির্ভর করে সাধারণ গণমানুষের সংস্কৃতিতে অংশ নেওয়ার সক্ষমতা, সেটা আর্থিক এবং সময় করে উঠতে পারা, উভয় অর্থেই। ইংল্যান্ডের শ্রমিকদের সাংস্কৃতিক মান, নৈতিক ‘অবক্ষয়’ রীতিমতো আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভদ্রলোকের মধ্যে, তাদের অপরাধপ্রবণতা আর অস্থিরতা থেকে সমাজকে রক্ষার দাওয়াই হিসেবে পুলিশ আর ধর্মপ্রচারক উভয় অস্ত্রই ব্যর্থ প্রমাণিত হলো। রবার্ট ওয়েন নিজে ছিলেন একজন শিল্পপতি, শ্রমিকদের এই বাস্তবতা নিয়ে আন্তরিকভাবে যিনি ছিলেন উদ্বিগ্ন। নিজের কারখানার শ্রমিকদের বসতিতে তিনি শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়ে, কর্মঘণ্টা কমিয়ে, শিশুদের জন্য দিবাযন্ত্রকেন্দ্রের ব্যবস্থা করে এবং ধর্মপ্রচারকদের প্রচারণাকে নিরুত্সাহিত করে তিনি দেখতে পেলেন, কারখানার মুনাফা যথেষ্ট যেমন একদিকে রয়েছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের সাংস্কৃতিক মান বেড়েছে, মাতলামি আর অন্য সব হতাশাজাত সামাজিক ক্লেদ কমেছে, পরিজনের প্রতি যত্ন বেড়েছে। 

রবার্ট ওয়েনের এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরুতে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করলেও অচিরেই মুনাফাকে সর্বোচ্চ করার বিষয়ে কাতর ক্ষমতাবানরা তাঁকে উপেক্ষা করা শুরু করলেন। কিন্তু ওয়েনও বিপরীতক্রমে পুঁজি-শ্রম ও মুনাফার সম্পর্ক বিষয়ে ক্রমেই আরো গভীরভাবে ভাবা আর অনুশীলনে যুক্ত হলেন। তিনি তাই ছিলেন আধুনিক শ্রমিক শ্রেণির কাছে সন্ততুল্য একজন মানুষ। তাঁর অনুসৃত পথেই মার্ক্স এঙ্গেলসের মতো দার্শনিকরা হেঁটেছেন, হেঁটেছেন বাকুনিন, লাসালসহ অজস্র স্বপ্নবান, যাঁরা ‘উদ্বৃত্ত মূল্যের সেই গোপন রহস্য ফাঁস’ করেছেন মানুষের কাছে। মে দিবস একদিকে যেমন এসব দার্শনিক-চিন্তাবিদের রাষ্ট্র ও সমাজ ভাবনার প্রকাশক, আরেক দিকে শ্রমিক শ্রেণির রক্তপাতময় উত্থানেরও সূচক।

বাংলাদেশ এবং গোটা উপমহাদেশেই মে দিবস ছিল প্রতিরোধের প্রতীক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্বে কলকাতা ও মুম্বাইয়ের শ্রমিক আন্দোলন এখানে ঔপনিবেশিক শক্তির বিদায়ে বিরাট অবদান রেখেছে। ষাটের দশকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী-খুলনা-চট্টগ্রাম শ্রমিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে ওঠে। উনসত্তর সালের গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এই শ্রমিকরাই ছিল অগ্রবাহিনী এবং তাদের সংগঠিত শক্তির ওপর ভিত্তি করেই পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিনাশ সম্ভব হয়েছে। কিন্তু যাকে বলে শ্রমিকের জন্য কল্যাণকামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, সেই বন্দোবস্তটি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি।

বাংলাদেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ আজ নগরবাসী। গ্রামজীবনেও নগরের ছায়া পড়েছে। ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ জীবনের বিশ্রাম ও বিনোদন উধাও হয়েছে, দুর্বল হয়েছে সংস্কৃতিতে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ ছাপও। কিন্তু বিপরীতে নগরের জীবনে যে রূপান্তর আসার কথা শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, বিনোদনে জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে ওঠার কথা, তা কতখানি সম্ভব হয়েছে? তা ততখানি গড়ে ওঠেনি, যতখানি আমরা শ্রমিককে বিশ্রাম আর বিনোদন থেকে বঞ্চিত করেছি। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও প্রতিটি আধুনিক রাষ্ট্রেই সংস্কৃতির প্রধান মানদণ্ড তার উত্পাদক বা মেহনতি শ্রেণি—এটা ব্রিটিশ, জার্মান, মার্কিন—সব জাতির জন্যই সত্য। চলচ্চিত্র, উপন্যাস এবং আর সব বিনোদনের মাধ্যমের প্রধান ভোক্তা শ্রমিক শ্রেণি বলেই তার সামর্থ্যের অভাব অথবা অবসরের অভাব জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশে আদতে তা-ই দাঁড়িয়েছে। পান্তাভাতে লবণের ব্যবস্থা করতে দিশাহারা শ্রমিকের সৌন্দর্যের আকুতি—

 যেমনটা ধরা পড়েছে জয় গোস্বামীর ভাষায় : ‘বাড়িতে ফেরার পথে কিনে আনি গোলাপ চারা। কিন্তু পুঁতব কোথায়? ফুল কি হবেই তাতে? সে অনেক পরের কথা টান দিই গঞ্জিকায়’

প্রায়ই আমরা শুনতে পাই, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সম্মুখীন আমরা, গোটা বিশ্ব তো বটেই, বাংলাদেশও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর অভূতপূর্ব যন্ত্রব্যবস্থা আমাদের উত্পাদনী প্রক্রিয়াকে গ্রাস করবে। বাষ্পচালিত যন্ত্রের মতোই এর ফলও একদিকে শ্রম লাঘব করা, উত্পাদনের ক্ষমতা ও দক্ষতাকে বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়া। অন্যদিকে বিপুল বেকারত্ব এবং সামাজিক দুর্দশা বৃদ্ধি, কেননা শ্রমশক্তির একটা বড় অংশই তখন উদ্বৃত্ত জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে। উনিশ শতকের দার্শনিক কার্ল মার্ক্স ভেবেছিলেন, রাষ্ট্র যদি মালিক পক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, নতুন প্রযুক্তির মুখোমুখি হয়ে তারা বাড়তি শ্রমিককে ছাঁটাই করবে, আর যাদের চাকরি টিকে থাকল, তাদের কর্মঘণ্টা বাড়িয়ে দেবে, মজুরি দেবে কমিয়ে। কেননা বাইরে তখন বিপুল কর্মহীন মজুরের প্রতিযোগিতা। অন্যদিকে রাষ্ট্র যদি শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণে থাকে, যেকোনো নতুন প্রযুক্তির মুখোমুখি হয়ে সে কাউকে ছাঁটাই করবে না; বরং সবার শ্রমঘণ্টা দেবে কমিয়ে। মানব প্রজাতি তখন সত্যিকারভাবে উপযুক্ত হয়ে উঠবে শিল্প-সাহিত্য-দর্শনের। পুঁজিবাদে অবসরহীন দাসকে প্রতিস্থাপন করেছে অবসরহীন শ্রমিক। মে দিবসের চেতনা হলো—যন্ত্র প্রতিস্থাপন করুক মানবিক শ্রমকে। মানুষ কাজ করুক ন্যূনতম শ্রমঘণ্টা, অবসরকে সে ব্যয় করুক তার মানবিক সম্ভাবনার চরম বিকাশে।

মে দিবস তাই শুধু ভাতের দাবি নয়, গোলাপটাও তার চাই।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা