kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

বই আলোচনা

আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি প্রসঙ্গে

মুসাররাত নওশাবা   

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি প্রসঙ্গে

আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি : রাজু আলাউদ্দিন। প্রকাশক : শ্রাবণ প্রকাশনী। প্রচ্ছদ : আলফ্রেড খোকন মূল্য : ১২০ টাকা

এই সময়ে যাঁদের কবিতা পড়তে পেরেছি—রাজু আলাউদ্দিন তাঁদের মধ্যে ব্যতিক্রম। রাজু আলাউদ্দিনের কবিতা লেখার শুরু আশির দশকে হলেও প্রথম বই বেরিয়েছে ২০১৭ সালে। এই দীর্ঘ সময় তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্যগুলোকে অনেক স্পষ্ট এবং অধিকতরভাবে রাজু আলাউদ্দিনীয় হতে সাহায্য করেছে, কবিতার নিবেদন আর আবেদনের মধ্যের দূরত্বটি কমিয়েছে। তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণে উপমা, চিত্রকল্প আর রূপকের একটা জমাট বন্ধন লক্ষণীয়। যেটা যেকোনো কবির কবিতার মধ্য দিয়ে যাওয়া দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতারই প্রমাণ দেয়। যেমন তিনি বলেন, ‘আমার ঈশ্বর নেই, নেই কোন মাতৃভূমি; শুধু তুমি আছ।/যদি থাকে ঈশ্বর তবে তুমি তারও চেয়ে বেশী,/যদি থাকে মাতৃভূমি তবে তুমি তারও চেয়ে বড়।’

খুব সরল-সাধারণ উপস্থাপন। যেকোনো পাঠকের সঙ্গে সংযোগ ঘটানোর মতোই চেনা উপমা চিত্রকল্প; অথচ এই কবিতার জমিন অনেক বিস্তৃত এবং ভরাট গাঁথুনির। এখানেই সাধারণ উপস্থাপনের মধ্যে অসাধারণত্বের প্রমাণ আছে। কবির ভালোবাসার গভীরতার অনন্য প্রকাশ ‘আমার ঈশ্বর নেই, নেই কোন মাতৃভূমি; শুধু তুমি আছ’ পঙিক্তটি। এই উচ্চারণ সব প্রেমিক হূদয়কেই আলোড়িত করার ক্ষমতা রাখে। তবে কবি কোনো বিশ্ববাসীকে আঘাতও করেননি। তিনি ‘যদি’ দিয়ে পরের পঙিক্ততেই বুঝিয়েছেন—তিনি তাঁর ভালোবাসার মানুষের কথাই বলেছেন। তবে পাঠকের মধ্যে যে যতখানি নিতে পারেন; সেটা সেই সব পাঠকেরই গ্রহণক্ষমতার বিষয়। এভাবে কবিতা এলাবরেশন করতে হলে কবি প্রতিভার বাইরেও কবির অনেক পড়াশোনা থাকতে হয়। এই কবির অন্যান্য বিষয়ের যে কয়েকটি বই পড়েছি এবং এই কাব্যগ্রন্থ পাঠেও তাঁর পঠন-পাঠন সম্পর্কে একটি ইতিবাচক ধারণা পাওয়া যায়। প্রকৃত কবিতা দুদিকে তার প্রকাশভঙ্গি মেলে ধরে। অর্থাৎ আপনি তাকে যে অর্থে পাচ্ছেন, ঠিক তার উল্টো অর্থেও চাইলে ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।

মানুষের যাপন করে যাওয়া জীবনটি সে নিজে অতখানি দেখে না, যতখানি কবি দেখতে পান। কবি এ কারণেই অন্য মানুষের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রগামী, সে তৃতীয় ব্যক্তির মতো নিজেকেও দূর থেকে দেখতে সক্ষম। রাজু আলাউদ্দিনের ‘অভিন্ন যাপন’ শিরোনামের কবিতার শেষের পাঁচটি পঙিক্ত উল্লেখ করছি—‘আমি জানি সংসারের কথা/নদী আর লতাগুল্মের পাতা/যত দূর গড়ায় ছড়ায়/উত্স তার বেঁচে থাকে/ ব্যাকুল ডগায়’

ছোট্ট কয়েকটি পঙিক্ততে কবি এমন এক চলমান জীবনের সত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা বোঝার জন্যই আমাদের দেখা, পড়া ভাবনায় ডুবে থাকা। কবিতার এই মাত্র কয়েকটি পঙিক্ততে জীবনের নির্মল গতি ধরা পড়ে। কী অসাধারণ চিত্র কবি এঁকেছেন অত্যন্ত সাধারণভাবে। এই সাধারণ চিত্রনির্মাণের ক্ষমতাটি আমাকে গ্রিক গীতিকবি সাইমনাইডসকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। সাইমনাইডস কবিতা সম্পর্কে কয়েকটি শব্দে অত্যন্ত মূল্যবান কিছু কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘কাব্য হলো বাঙ্ময় চিত্র আর চিত্র হলো নীরব কাব্য।’ এ রকম বেশ কিছু পঙিক্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বইয়ের কবিতাগুলোয়।

রাজু আলাউদ্দিনের ‘আকাঙ্খার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি’ কাব্যগ্রন্থের ছোট ছোট কিছু কবিতা আছে। যেগুলো শব্দের আকারে ছোট হলেও বিষয়ের দিক থেকে মোটেও ছোট নয়। এই কবিতাগুলোকে অনেক শক্তিশালী মনে হয়েছে। সাধারণত ছোট কবিতাগুলো ছোট বিষয়ের মধ্য থেকেই উচ্চারিত হতে দেখা যায়। রাজুর বেলায় বিষয়টি বলা যায় ঠিক উল্টো। তাঁর ‘অসংখ্য মৃত্যু নিয়ে আমার জন্ম হয়েছিল’, ‘প্রেমের যমজ কবিতা : অভিন্ন আলাদা’ কিংবা ‘যে আস্তিক নাস্তিক’ শিরোনামের দীর্ঘ কবিতাগুলো পড়ে আমি যতক্ষণ ভেবেছি, তার চেয়ে সম্ভবত ‘চুম্বনের আলো’ শিরোনামের কবিতাটিকে অনেক বেশি যাপন করেছি।

কবির সৌন্দর্য সৃষ্টির দক্ষতাই মানুষের জীবনে কবিতাকে প্রয়োজনীয় করে তুলেছে। পাঠক হিসেবে এই সত্যকে আমি বেশি প্রাধান্য দিতে চাই।

রাজু আলাউদ্দিনের এই বইয়ের প্রতিটি কবিতার গাঁথুনি মজবুত। অলংকারের বাহুল্য নেই। চিত্রকল্পের সঙ্গে বিষয়ের নিবিড় সম্পর্ক তৈরিতে কবি সফল হয়েছে। উপমাগুলো দেশজ এবং প্রাকৃতিক। প্রকৃতির প্রতি কবির হূদয়ের গভীরে যে সবুজ ভালোবাসা আছে, তা বেশ কয়েক জায়গায় দেখা গেছে।

 

মন্তব্য