kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

বইঠা

পারভীন সুলতানা

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বইঠা

অঙ্কন : মাসুম

ভাটি মানে জল আর বিল-বিলান্তি। বৃষ্টিবাদলা ছাড়াও আছে সুসং দুর্গাপুরের পাহাড় উপচানো পানির ঢল। এক শীত এলে ভাটির দেশের স্বভাব-চরিত্র আমূল বদলে যায়। এখানে পানিবন্দি মাটি দুনিয়া দেখার মওকা পায় না সহজে। শুধু শীতের কয়েক মাস মাটি জাগলে গায়ে রোদ-হাওয়া লাগানোর সুযোগ আসে। বর্ষার নাও-কিস্তি এখন ডাঙায় তেলাপোকার মতো চিতশোয়া। জল-জলালির বিল-ঝিল শুকিয়ে আয়েশ করে রোদ খায় শীতের কিছু মাস। আলফাজ, এন্টেশ, ফয়জুল মিয়ারা তাদের বাড়ি লাগোয়া বিছনায় রাই, মটর, কলাই, সরিষা বুনে। ছড়ানো-ছিটানো সরষেক্ষেত ফুলকুমারী সেজে দিব্যি রূপ বিলায় আবার। সরষে ফুলের ক্ষেতে শহর থেকে ঘুরতে আসা ছেলে-মেয়েরা নানা ভঙ্গিমায় টকাশ টকাশ ছবি তোলে। এইডারে আবার কয় নাহি ছেলপি! কত রং-ঢং যে দেখতে হইব! বাড়ির দাওয়ায় বসে আলতু মিয়া মন মিশিয়ে নাওয়ের বইঠায় আলকাতরা মাখছে। চোখের আওতায় থাকা শীতের ছিজিল-মিছিল প্রকৃতির মধ্যে ছক তোলা রাই-সরিষার হলুদ সৌন্দর্য দেখে এসব ভাবনায় আসে তার। আলকাতরার শেষ প্রলেপ দিয়ে আলতুর উত্সুক চোখ উঠানের রোদ পড়া স্থান নিরিখ করে। বইঠা রোদে দিয়ে এবার নাবালে উল্টে থাকা নৌকার কাছে যাওয়ার প্রস্তুতিস্বরূপ ঢিলে হয়ে যাওয়া লুঙ্গিতে গিঁট মারে। পানির দেশ, বর্ষায় নৌকাই ছিল একসময় চল-চলাচলের একমাত্র বাহন। এর-ওর বাড়ি যাওয়া-আসায়, মাছ ধরাধরিতে নাও লাগে। গোপাটের উঁচা সড়কও বর্ষায় ডুবে যেত। ডিস্ট্রিক বোর্ডের রাস্তা তৈরির পর ভাটির দেশের বাও-বাতাসে বদল আসছে। উটের পিঠের মতো উঁচা সড়ক আজকাল বর্ষার পানিতে ডুবে না।—হুনছুউন, আফনে  বিছনায় গেলে বাছুরডারে ডিগরা দেইন যে। ছুডা থাকলে মাইনসের খেতো গিয়া মুখ দিব। বউয়ের ফরমাশ ছাড়াও নাওয়ের তদারকির জন্য আলতু মিয়াকে নাবালে যেতে হবে। নৌকার হালচাল না দেখে আগে বইঠার যত্ন-আত্তি সারে আলতু। বইঠাটা তার দাদার আমলের। পুরনো হয়ে যাওয়া বইঠা শক্তপোক্ত রাখার জন্য নানা কাণ্ড-কীর্তি করে আলতু মিয়া।—আরে অ নাদানের পুত, বইডার মইধ্যে যে আলকারতা দেয়, বাফের জন্মেও দেহি নাই। সম্পর্কীয় দাদার ঠিসি-মসকরা গায়ে মাখে না আলতু। ছেলে কয়—আব্বা, একটা বইডার দাম কত কইনছে, গাবের কষ দেওন লাগে! অহন হালায়া দেইন এইডেরে। আলতু তার যুবক পুত্রকে কী করে বোঝায়, বাপ-দাদার আমলের এই বইঠার কী মর্ম! আলতু দেখেছে, দাদাছাব জবর যত্ন করত জিনিসটার। তার মুখে শোনা কেচ্ছা—বর্ষাকালে একবার গারো পাহাড় থেকে কাঠের চালান আনতে গেছল দাদাছাব। ধারে-কাছের বাজার থেকে রান্নার সওদাপাতি নিয়ে সন্ধ্যার সময় নৌকায় ফিরছিল। ফেরার সময় পাহাড়ের ঢালুপথে হঠাৎ বাঘ! অস্ত্র বলতে হাতে শুধু গজারি কাঠের পোক্ত বইঠা। দাদাছাব বইঠাটা বাঘের দিকে বন্দুকের নলের মতো তাক কইরা ডরে কাঁপতে থাকলেও জানের ভয়ে বাঘ পলাইলে সে যাত্রা জীবনটা বাঁচে। সেই বইঠা হাতবদল হয়ে বাপের পরে এখন আলতুর জিম্মায়। এবার বর্ষা তেমন জুত করতে পারে নাই। ডিস্ট্রিক বোর্ডের উঁচা সড়ক ছাড়াও মদনমোহনগঞ্জের রাস্তা হওয়ায় কংসের পানি হাওর-বাঁওড় ডিঙানির তেমন সুযোগ পায়নি।

নামা জমিনের দিকে যাওয়ার আগে আলতু বউকে আবার জানায়, নামাত যাইতাছি, নাওডার হাল দেইখ্যা আসি। এট্টু পরে আবুরে দে আলকাতরার কৌট্টাডা ফাডায়া দিয়ো। আবু অবশ্য ঘরেই ছিল। দৈর্ঘ্যে ও বয়সে এখন সে যুবক। বাড়ির প্রথম সন্তান বলে মুখে মুখে এখনো আবু নামে সম্বোধিত। এ নিয়ে মাঝেমধ্যে সে আপত্তি করে। আবু হাতের স্ক্রিনঘোলা মোবাইল টিপতে টিপতে বলে, আর নাও নাও করুইন্যা যে আব্বা, কয় দিন পরে বাইস্যা মাসোও পানি আইব না গেরামে, নাও চালাইবাইন কই? হুনতাছি মদন-বারহাট্টা, মদন- মোহনগঞ্জ, মদন-কেন্দুয়ার পাক্কা রাস্তার টেন্ডার পাস হইছে। বইডা আর নাও কুন কামো লাগব, হুনি? ছেলের মুখে এত আগাম সুসংবাদ শুনেও আলতু মিয়ার বুকের কোথায় যেন বাড়ি লাগে! অব্যাখ্যাত এক কষ্টে মন বেহুদা শূন্য শূন্য লাগে। ছেলের দিকে তাকিয়ে গেসসা ধরে—কিছু জমি ছিল, তা-ও সারা বছর থাকত পানির তলে। আউশের ফসলটাই খালি উঠত, পাহাড়ি ঢল নামলে তারও নিশ্চয়তা নাই দেখে গেল বছর বেচে দিয়েছে। ছেলের ঘ্যানর ঘ্যানরে অতিষ্ঠ হয়ে জাহাঙ্গীরপুর বাজারে ছোটমোটো একখান দোকান করে দিল। সেইখানে সে গ্যারেজ করছে। ঢাকা গেছলো গার্মেন্টের চাকরি করতে; তিন বছর পর ফিরে এলো মোটর মিস্ত্রি হয়্যা। হইলেই কী! আদতে তো মাঝি-জাউল্যার পুত! কিন্তুক ভাবখান দেহ! বাড়িতও শাট গতরে! হাতো একটা মুবাইল, এইডেদে হিরেবার ফডুও তুলে! বাপের হঠাৎ চুপ মেরে যাওয়া মূর্তির দিকে তাকিয়ে ছেলে কিছু আঁচ করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে জানায়—আব্বা, আলকাতরা শেষ, আমি বাজারো যাইতাছি, কিন্যা আনবাম নে। আলতু মিয়া হ্যাঁ-না কিছু বলে না। ঘরে স্থিত আলতুর স্ত্রীর গলা সরব হয়—আবুর বাপ, পোলায় কয় অহন থাইক্যা মাজে-মইদ্যে যদি গ্যারেজে যাইতাইন আফনে...। স্ত্রীর আবদারে আলতু মিয়া উত্সাহ বোধ করে না; বরং উষ্মা জাগে তার। এত দিনে তার মনে হয়, পোলাডা তার বেডা হয়্যা গেছেগা! এ বোধশক্তির বদলে রাগের একটা লাল ষাঁড় উসকে দেয়। মনের ভাব গোপনে অক্ষত  রেখে আলতু মিয়া নামাজমির দিকে হাঁটা শুরু করে। বাড়ির পেছন দিকে নামাজমিনে যাওয়ার রাস্তা। হেলেঞ্চা, জলডুমুর, আকন্দ ঝোপের মাঝখান দিয়ে পায়ে হাঁটা পথ ঢালু হয়ে গলা মিশিয়েছে নামাজমির সঙ্গে। নিজের নৌকার কাছে গিয়ে অগোছালো মন থিতু হয় খানিকটা। নাওটার বয়স ৮-৯ বছরের কম না। এখনো ভালো শক্তপোক্ত। শাল কাঠের নাও। গেছেকাল গাবের কষ দেওয়ায় জৌলুস ফুটছে! আলতুর চোখে ইলিক-ঝিলিক ইচ্ছা তিরতিরায়। আগামী বর্ষায় আবার নৌকা নিয়ে নিরুদ্দেশ আনন্দ ভ্রমণের বাসনা মনের মধ্যে খলবল করে—বাইস্যা মাসে নয়া পানির খাইল্লাজুরি হাওর! টলমলা কংস! চাই কি উজান বাইয়া ব্রহ্মপুত্র! দেখলে ছোটমোটো লাগলেও নাওডা অনেক মজবুত। পাহাড়ি শাল কাঠের নৌকা! এমন উসকে ওঠা খুশির ভেতর  আলতুর কানে উড়ে আসে হাইড্রোলিক হর্নের বিকট আওয়াজ। জাহাঙ্গীরপুর সড়কে আজকাল আকসার মদন টু নেত্রকোনার বাস যাওয়া-আসা করে। আলতুর সমাচ্ছন্ন চোখের দৃষ্টি প্রাচীন কচ্ছপের মতো সরু হয়ে গুটিয়ে আসে। মাথা বহন করা ঘাড়টাকে ঋজু করে আলতু দেখার চেষ্টা করে বাস কোন দিকে যায়। ওর নজর পড়ে, একটা না, তিন-তিনটা বাস আগু-পিছু হয়ে উঁচা সড়কে ধুলার ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে যাচ্ছে। রোদের একটা ফালি বাসের পিঠ গড়িয়ে পিছলা মেরে ছুরির ফলার মতো আলতুর মাঝবয়সী চোখে খোঁচা মারলে আলতু রাগে গজ গজ করে—চুতমারানির বেডারা শান্তি দিব না...। ওর রাগের ভাপে আবার ফুঁ মেরে ঢুকে পড়ে পাশের হিস্যার বিয়েবাড়ির হিন্দি গান—ও রাধা তেরি চুনরি ও রাধা তেরি চলনা ও রাধা তেরি সাজনা...।

উচ্চ শব্দের পীড়নে নিরুপায় আলতু ওর  চারপাশ ঘিরে থাকা খ্যাতি-খলার দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকায়; চোখে পড়ে দিগন্তজোড়া হলুদ সরষে ফুলের ক্লান্তিহীন বিস্তার। নাবাল জমির খোলা প্রান্তর কিংবা নৌকার নির্ভরশীল সান্নিধ্যও আটকে রাখতে পারে না আলতু মিয়াকে। বাছুরটা গাভির কাছাকাছি বেঁধে আবার বাড়ির উদ্দেশে হাঁটা মারে আলতু। মধ্যদুপুরে উঠানের পেট টপকে রোদ গিয়ে উঠেছে সিঁদুরে  আমগাছের মগডালে। বইঠার ওপর বৃত্তাকার একটা ছায়া হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে! মাঝ-উঠানে মুরগির ঝাঁকুনের সঙ্গে কারসাজি করে রাখা বইঠায় রোদ না থাকার কথা না! আলতুর চোখ দুটি শিকারি বকের মতো কর্মতত্পর হয়ে উঠলে চোখে পড়ে,  শরিফাগাছের ডালে কায়দা করে ঝুলিয়ে রাখা স্টিয়ারিংয়ের তিনটা গোল বৃত্ত পাস্পরিক যোগসাজশে একটা দুর্ভেদ্য দেয়াল রচনা করেছে। স্টিয়ারিংগুলোর দাপুটে ছায়া আবিল করে আছে বইঠাটা। মনে পড়ে, সারাই করনের কিছু যন্তরপাতি বাড়িত রাখছে পোলা। বোধ হয় আইজ গ্যারেজো নিব। বইঠার সরল অবয়ব থেকে পিছলে যাওয়া রোদের সন্ধানে আলতুর চোখের মণি দুটি অবুঝের মতো এদিক-সেদিক আতিপাতি করে।

মন্তব্য