kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

সময়ের বাঁকে বাঁকে বাঙালি সংস্কৃতি

তুহিন ওয়াদুদ

১২ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সময়ের বাঁকে বাঁকে বাঙালি সংস্কৃতি

খ্রিস্টপূর্ব কালে বাঙালির যাপিত জীবন ও সংস্কৃতির সন্ধান করার কোনো মাধ্যম পাওয়া যায় না। খ্রিস্টাব্দের প্রথম কয়েক শ বছরে বাঙালির যাপিত জীবনের স্বরূপ আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ কিংবা বিদেশি পর্যটকদের সামান্য লেখনীতে যে তথ্য পাওয়া যায় সেখানে বাঙালি সংস্কৃতির সামান্য পরিচয় মেলে। চীনা পরিব্রাজকের দেওয়া তথ্য, শীলভদ্রের জীবনকাহিনিতে বর্ণিত প্রাপ্ত উপাত্ত সংস্কৃতির সম্পূর্ণস্বরূপ নয়। তিব্বতীয় ঐতিহ্য, ভারতীয় ন্যায়শাস্ত্রেও কিছু কিছু উপাত্ত পাওয়া গেছে। বৈদিক রচনায় সংস্কৃতির সামান্য পরিচয় লিপিবদ্ধ হয়েছে। কখনো কখনো পাহাড়পুর কিংবা ময়নামতীর মৃত্ফলকগুলোকে চিত্রিত জীবনের সূত্র ধরেও সংস্কৃতি বোঝার চেষ্টা হয়েছে। প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প’ সূত্রেও কিছুটা ধারণা লাভ করা যায়। ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণ’, ‘মহাভারত’, ‘ভাগবত পুরাণ’ গ্রন্থ সূত্রেও বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। ‘খ্রিস্টীয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে বাংলাদেশের অবস্থা সম্পর্কে কিছু তথ্য গ্রিক ও লাতিন উত্সসমূহে রহিয়াছে।’ (বাংলাদেশের ইতিহাস, মুহম্মদ আবদুর রহিম, আবদুল মমিন চৌধুরী, এ বি এম মাহমুদ, সিরাজুল ইসলাম, পৃ. ১৯)। এই রচনায় পেরীপ্লাস গ্রন্থ ও টলেমির বিবরণ থেকেও বাংলা সম্পর্কে কিছু কিছু ধারণা লাভ করার কথা বলা হয়েছে। বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদও প্রাচীন সংস্কৃতি সন্ধানের অন্যতম ক্ষেত্র। চর্যাপদের একজন পদকর্তার নাম ভুসুকু। তাঁর রচিত পদে ব্যবহূত সুরের নাম ‘বঙ্গাল’। তিনি পদে উল্লেখ করেছেন—‘আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলি।’ ভুসুকু নিজেকে বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। এককথায় বলা যায়, এখান থেকে-সেখান থেকে সামান্য কিছু তথ্য-উপাত্ত যুক্ত করে বাঙালির আদি সংস্কৃতির একটি রূপরেখা কল্পনা করা হয়ে থাকে।

প্রাচীনকালে যা বঙ্গ ছিল, তাই বাঙ্গাল নামে পরিচিত হয়। বাঙ্গাল শব্দটি ইংরেজ শাসনামলে বেঙ্গল হয়েছিল। একসময় পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলা নাম নিয়ে দেশ বিভাগের সময় ১৯৪৭ সালে পশ্চিম বাংলা ভারতের অংশ এবং পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানি সরকার তখন পূর্ব বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানও বলা শুরু করে। ১৯৬৯ সালের এক সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘‘আমাদের এ ভূখণ্ডের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’।’’ ১৯৭১ সালে মহান মুুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামের একটি দেশ বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে।

আজকের দিনে বাঙালির ভাষা, ধর্ম, রাষ্ট্রকাঠামো, অর্থব্যবস্থা, অনুষ্ঠানাদিসহ নিত্যদিনের যাপিত জীবনের কোনো কিছুই অতীতের স্বরূপে নেই। খিস্টপূর্বাব্দে বঙ্গে অনার্যদের সঙ্গে আর্যদের লড়াইয়ে অনার্যরা হেরে যায়। এই হেরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে অনার্য তথা এই ভূমির সন্তানদের সংস্কৃতি-সভ্যতাগত পরাজয়ও সাধিত হয়। এ প্রসঙ্গে ড. মোহাম্মদ হাননান ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ গ্রন্থে বাংলার অতীত সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছেন—‘আর্যদের জয়, শুধু আর্য প্রভুত্বের জয় ছিল না, ছিল অনার্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির ওপর আর্য সভ্যতা ও সংস্কৃতিরও জয়। ফলে রাক্ষস-খোক্কসরা আর মানুষ থাকল না; হয়ে গেল দানব, অসুর, দৈত্য ইত্যাদি।’

প্রাপ্ত তথ্যমতে, আর্যরাই এ অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতির ওপর প্রথম আঘাত হানে এবং এ অঞ্চলের মানুষদের হেয় প্রতিপন্ন করতে থাকে। সমাজে সৃষ্টি হয় প্রভু-দাস সংস্কৃতি। ধীরে ধীরে এ সমাজে সৃষ্টি হয় বর্ণবষৈম্য। সমাজে এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে ব্রাহ্মণ সৃষ্টি হয়েছে স্রষ্টার মুখ থেকে। হাত থেকে সৃষ্টি হয়েছে ক্ষত্রীয়। স্রষ্টার ঊরু থেকে সৃষ্টি হয়েছে বৈশ্য। আর পায়ের ময়লা থেকে সৃষ্টি হয়েছে শূদ্র। এভাবে তাদের শ্রেণির মূল্যায়ন হতো। তবে পরবর্তীকালে আর্য-অনার্যদের ধর্মের মধ্যে একটি সমন্বয় সাধিত হয়েছে।

এই বর্ণবৈষম্যপূর্ণ সমাজ থেকে রক্ষা করার জন্য গৌতম বুদ্ধ বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন। গৌতম বুদ্ধের এই ধর্মের পাশাপাশি মহাবীর জৈন ধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন। শুধু বাংলার প্রেক্ষাপটে নয়, সারা বিশ্বের সমাজ-সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রক ছিল ধর্ম বিশ্বাস। আর তাই আমাদের বাংলায়ও ধর্ম বিশ্বাসের নিরিখে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক আচার পালিত হতো।

বঙ্গ ভূখণ্ডে ইসলাম ধর্মের প্রচারকরা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির অনেক আগে থেকেই ধর্ম প্রচারের জন্য এসেছিলেন। অনেকেই ধর্ম প্রচার করতে এসে এ অঞ্চলে বসতিও গড়ে তুলেছিলেন। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি ধর্ম প্রচারের জন্য আসেননি। এসেছিলেন সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য। যেহেতু শাসক হিসেবে মুসলমানরা এ দেশ পরিচালনা করতে শুরু করে, তাই ধীরে ধীরে ইসলামী সংস্কৃতি সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে থাকে। এর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত আমাদের ভাষা। সনাতন ধর্মের বর্ণবৈষম্যে ব্রাহ্মণরা ছিলেন সবচেয়ে উঁচু শ্রেণির। এই শ্রেণির মানুষেরা সংস্কৃত ভাষাকে নিজেদের ভাষা জ্ঞান করত। গ্রন্থাদি রচিত হতো সংস্কৃতে। মুসলমানরা আরবি-ফার্সিকে নিজেদের ভাষা বলে মনে করত। যদিও ইসলাম ধর্মের সৃষ্টির ইতিহাসের সঙ্গে ফার্সির কোনো যোগসূত্র নেই। এ অঞ্চলের মুসলমানরা ফার্সিকে নিজেদের ধর্মীয় ভাষা মনে করার প্রসঙ্গ নিয়ে অনেক সমালোচক এ প্রসঙ্গে বিস্তর আলোচনা করেছেন। মধ্য যুগে ফার্সিকে রাজভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।  আমরা আজকের দিনে যে ভাষায় কথা বলি এই ভাষা সংস্কৃতি মূলত বহন করেছে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। অর্থাত্ নিম্ন বর্গীয়রাই এ ভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। সাধারণ মানুষ যে ভাষায় কথা বলেছে, সেই ভাষাই হয়ে উঠেছে মূল ভাষা। পাকিস্তান শাসনামলে বাংলা ভাষার ওপর পাকিস্তানি আগ্রাসন নেমে এলেও তা বাঙালিরা রুখে দিতে সমর্থ হয়েছিল।

মুসলমানদের শাসনামলে ভবন নির্মাণেও আসে নতুনত্ব। মন্দির-মঠ-বিহারের নির্মাণের সংস্কৃতি ছিল। যুক্ত হলো মসজিদ নির্মাণ। বৌদ্ধদের শাসনামলে যে স্থাপত্যকাঠামো ছিল, মুসলিম শাসনের কালে তাতেও আসে ভিন্নতা। তবে উভয় কাঠামোতে নান্দনিকতার ছাপ স্পষ্ট। মুসলমানদের শাসনামলে রাজসভাকেন্দ্রিক সাহিত্য রচিত হতে থাকে। মধ্য যুগের সাহিত্যের বিকাশে মুসলমান রাজারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যদিও ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বঙ্গ দখল করে নেওয়ার পর এ অঞ্চলের শিল্পসাহিত্য চর্চা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল।

বঙ্গ ভূখণ্ডে ধর্মীয় সংস্কৃতির কথা বিবেচনা করলে এ অঞ্চলের পুরনো ধর্ম হিসেবে আমরা সনাতন ধর্ম পেয়ে থাকি। এ ধর্ম মূলত আচরণিক ধর্ম। অনেক আচরণিক ধর্ম একত্র করেই মূলত সনাতন ধর্ম প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বৌদ্ধ ধর্ম পরজাগতিক বিষয়ের পরিবর্তে ইহজাগতিকতায় জীবনকে সুন্দর করে তোলার প্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। ইসলাম ধর্ম ইহজগত্ ও পরজগেক সুন্দর করার প্রত্যয়ে এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আমাদের এ ভূখণ্ডে এই তিন ধর্মের বিকাশ সাধিত হলেও এখন প্রধান ধর্ম হিসেব ইসলাম ধর্ম, তারপর সনাতন ধর্ম এবং ধর্ম পালন করা মানুষের সংখ্যা বিবেচনায় গৌণ হিসেবে বৌদ্ধ ধর্ম টিকে আছে। এই তিন ধর্ম-দর্শনের রসায়নেও কারো কারো মনন গড়ে উঠেছে। বঙালিদের মধ্যে আজ পর্যন্ত ধর্মীয় প্রভাব প্রবল হারে বিদ্যমান।

নবাব সিরাজউদ্দৌলার হাত থেকে যখন ব্রিটিশরা ক্ষমতা কেড়ে নেয়, তখন বাঙালি জীবনে নেমে আসে নতুন এক ধারা। বলা যায়, পুরনো ও নতুনের সন্ধিসময় ছিল আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম দশক। ইংরেজ শাসনামলে বাঙালি জীবনের ব্যাপক পরিবর্তন আসার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে যুক্তিবাদী হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হওয়া। এই কালখণ্ডে হাজার বছর ধরে চলে আসা বিশ্বাসের মধ্যে নবতর চিন্তার সন্নিবেশ ঘটে। এ সময়ে রাজা রামমোহন রায় ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচার করেছেন। তিনি আরো অনেকে মিলে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। হিন্দু কলেজে শিক্ষকতা করতেন ডিরোজিও। তিনি একটি প্রজন্ম তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা অপ্রিয় হলেও প্রশ্ন করতে শিখেছিলেন। তাঁরা অনেকেই সংশয়বাদী হয়ে উঠেছিলেন। রেনেসাঁসের সূত্রপাতও হয়েছিল এ কালেই। বিবিধ অসার চিন্তার স্থলে বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার সাংগঠনিক চর্চা শুরু হয়েছিল এই সময়ে।  ঊনবিংশ শতকের শেষ দশকে বাঙালি মুসলমানেরা ইংরেজি ভাষাকে নিজেদের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করেছিল আরো আগে। এর মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলমানেরাও শিক্ষিত হওয়ার সড়কে যাত্রা শুরু করে।

বর্তমান সমাজে মাল্টিন্যাশনাল কম্পানির বাণিজ্য আর বিশ্বায়ন আমাদের এক নতুন পৃথিবীর পথে তুলে এনেছে। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে বাঙালি সংস্কৃতির প্রকৃত চেহারা দ্রুতই ভেঙে পড়ছে। বাংলা বর্ষবরণ সংস্কৃতি বাঙালিদের জীবনের ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষ সবচয়ে বড় উত্সব। সম্রাট আকবর ষোড়শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। হিজরি সন অবলম্বনে খাজনা আদায়ে নানাবিধ সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে ‘ফসলি সন’ নামে নতুন পঞ্জিকা শুরু হয়েছিল। এই ‘ফসলি সন’ পরবর্তী সময়ে বঙ্গাব্দ এবং পরে বাংলা নববর্ষে পরিণত হয়েছে। মূলত পুরনো বছরের সব পাওনাদারের টাকা মিটিয়ে নতুন হিসাবের খাতা শুরু করা হতো। সেই খাতা ‘হালখাতা’ নামে পরিচিত। এখনকার দিনে বর্ষবরণ উত্সবে পরিণত হয়েছে। খাজনা আদায় আর এর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

বিশ্বব্যাপী নতুন নতুন ধারণা, নতুন নতুন সৃষ্টি জীবনে আনছে নতুনত্ব। সেই নতুনকে গ্রহণ করাও হয়ে উঠছে জীবনের জন্য অনিবার্য। ফলে যাপিত জীবন বদলে যাচ্ছে দ্রুতই। যতভাবে বদলে যাবে জীবন, ততভাবে বদলাবে সংস্কৃতি।

মন্তব্য