kalerkantho

আগুন্তুক

সাদিয়া সুলতানা

৫ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আগুন্তুক

অঙ্কন : মানব

শহরে এক আগন্তুক এসেছে। এত মানুষের ভিড়েও সবার নজরে পড়ার মতো বেশভূষা আর চলাফেরা তার। মুখে ফুরফুরে দাড়ি, মাথার চুলে আঁটসাঁট ঝুঁটি, রোদে ঝলসানো তামাটে গায়ের রং। পরনে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার আলখেল্লা, বাম কাঁধে একটা পেটমোটা ঝোলা নিয়ে শশব্যস্ত লোকটি হেঁটে চলছে মাইলের পর মাইল।

অনেক দিন হলো এই শহরে কোনো ইস্যু নেই। আবর্জনার ভাগাড় হতে হতে শেষ পর্যন্ত ৩০০ ফুটের ইছামতী ৩০ ফুটের নর্দমায় পরিণত হওয়ায় ‘ইছামতী নদী বাঁচাও’ ইস্যুও মুখ থুবড়ে পড়েছে।  সর্বশেষ সংবাদ পাওয়া পর্যন্ত ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ দাবিতে আন্দোলনরত উচ্চকিত শিশুকণ্ঠীরাও তাদের মায়েদের বুকে ফিরে গেছে। আর কিছু ইস্যু গুজব হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এই মাঘ মাসেও হিমাগারে গেছে। তাই একান্ত বাধ্য হয়ে নিরামিষভোজী হওয়া শহরবাসীরা বহুদিন বাদে আমিষের দেখা পেয়ে আগন্তুককে নিয়ে আলোচনায় মেতেছে। অনেকেই যারপরনাই উত্সুক হয়ে আগন্তুকের গতিবিধির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। আপাতত এই আগন্তুকই শহরের নতুন ইস্যু।

আগন্তুক ছুটছে। শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা। খবর রটেছে, সে এখনো কিছু খায়নি। এই সাত দিন কেউ তাকে পানিও খেতে দেখেনি। এই কনকনে ঠাণ্ডার দিনে কেউ তাকে বাড়তি একটা চাদরও গায়ে জড়াতে দেখেনি। তবে গতকাল একটা নতুন বিষয় ঘটেছে। হিরুর চা দোকানের সামনে। এই দোকানটি ডিগ্রি কলেজের মোড়ে, যার অদূরে মৃত ইছামতী। গতকাল সকালের সবচেয়ে ব্যস্ততম সময়ের ঘটনা এটা। বিস্ময়াপন্ন চোখে হিরু চোখের সামনে ঘটনাটি ঘটতে দেখেছে। হিরু গতকাল থেকে আজ অবধি যতজনের সঙ্গে দেখা হয়েছে ততজনকেই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিয়েছে। প্রতিবার অবশ্য বর্ণনার মুকুটে একটা-দুইটা নতুন পালক যুক্ত হয়েছে।

বুইঝলে কাশেম ভাই, আমি ট্যারে ট্যারে দেখতিছি, ব্যাটা কী করে। হঠাত্ দেখি সে ব্রিজের পাশ দিয়্যা লুক কইরে নামতিছে, কান্ধে হাইত্যের সাইজের এক ঝোলা। তারপর ব্যাটা হটাস কইরে ইছামতীর পানিত নাইবে গেল। তহনই পানি হয়্যা গেল দুধের মতোন ফকফকা, পুরা ইছামতীর বুকে ফট কইরে হাজার পদ্ম ফুইটে উঠল! আমার চোহে তো ধান্দা লাইগে গেল।

সকালে রাধানগরের তাইফুরের কাছে ঘটনার বর্ণনা করার সময় পদ্ম ফুলের অংশটুকু ছিল না। দুপুরে জোলা কাশেমের কাছে ঘটনার বয়ানের সময় তা নতুন করে যুক্ত হয়েছে।

যদিও এটা সত্যি যে গতকাল অদ্ভুত এক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে হিরু। সে সত্যি সত্যি আগন্তুককে এই শীতের মধ্যে ইছামতীর নোংরা কালো কুটকুটে পানিতে নামতে দেখেছে। কিন্তু তাকিয়ে তাকিয়ে চোখ ক্ষয়ে গেলেও হিরু তাকে পানি থেকে উঠতে দেখেনি। এই এক হাঁটু নোংরা পাঁকের মধ্যে মানুষটা কিভাবে ভোজবাজির মতো উধাও হলো! এ নির্ঘাত জাদুকর! ভাবতে ভাবতে হিরু চা বানাতে দেরি করে ফেলে। কাস্টমারের গালাগাল এড়ানোর জন্য প্রতি কাপে বাড়তি আধা চামচ কনডেনড মিল্ক মেশাতে মেশাতে হিরু আবার ভাবনায় পড়ে যায়।

বিচক্ষণ কেউ কেউ আন্দাজ করে, এই আগন্তুক আর কেউ না, কোনো ভণ্ড সাধু। জ্যোতির্ময় পুরুষের ভেক ধরে কয়দিন শহরের এদিক-সেদিক ঘুরবে, তারপর কোনো বুড়ো অশ্বত্থের নিচে গাঁট হয়ে বসে মানুষ ঠকানোর ব্যবসা শুরু করবে। এমনও হতে পারে, লালসালুর সীমানা গেড়ে সে নিজেকে পীর বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করবে। তবে কেউ কেউ আগন্তুকের অপার্থিব ক্ষমতার অলীক গল্প ফেঁদে তার ওপর অগাধ বিশ্বাস রাখতেও উন্মুখ হয়ে আছে।

মানুষ আজব প্রাণী, যে নিজেকে সৃষ্টির সেরা জীব দাবি করেও নিজেই নিজের শ্রেণি পুনর্নির্ধারণ করে। নিজেই নিজেকে ভিখারি বানায়, অন্যকে দেবতা বা মহাপুরুষের আসনে বসায়।

কাশেম তেমনই একজন মানুষ, যে জন্মের পর থেকে ৫০ বছর ধরে এমনই একজন মহাপুরুষের অপেক্ষায় আছে। সে বিশ্বাস করে, তার জন্য সৃষ্টিকর্তা জীবনের প্রতি পদে পদে ফাঁদ তৈরি করে রেখেছেন। সেই ফাঁদ থেকে নিষ্কৃতির পথ খুঁজতে খুঁজতে তার চুলে পাক ধরেছে। তাঁতের হারিয়ে যাওয়া খটখট শব্দের সঙ্গে কালে কালে সে স্বপ্নপূরণের সব বাসনা খুইয়ে বসে আছে।

গত শুক্রবার ঐতিহাসিক মাসুদ খাঁ কাবলির মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানিয়ে এসেছে কাশেম।    ভক্তিমান কাশেম বিশ্বাস করে, সৃষ্টিকর্তা যেকোনো মহাপুরুষের অসিলায় ময়নাকে সুস্থ করে দিতে পারেন, তাঁতের খটখটানি ফিরিয়ে দিতে পারেন। কে জানে, হয়তো এই আগন্তুকই সেই মহাপুরুষ। নিভু নিভু প্রদীপের শিখার মতো আশার আলোটুকু ম্রিয়মাণ হলেও এখনো তা নিভে যায়নি। তাই কাশেম দোগাছি থেকে আজ জামাইপাড়া অবধি এসেছে। শোনা গেছে, দিন শেষে আগন্তুক জামাইপাড়ার শেষ মাথার ধানি জমির সীমানায় বাবলাগাছের নিচে এসে বিশ্রাম নেয়।

কাশেম মাথা থেকে বোঁচকা নামায়, এই শীতেও তার কপালে ঘাম দেখা যায়। বোঝা মাথায় পথে পথে হাঁটার পরিশ্রম আর মনের অবসাদ সব মিলিয়ে ক্লান্তিতে ওর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

কাশেম তাঁতি। এই শহরের লোকজন বলে, ও জাতে জোলা। ওর স্ত্রী শেফু বলে,

আমাগের ধম্মে কী আর হিন্দুদের মতোন জাত-পাত আছে? তবে ক্যান পাড়ার লোকজন এখনো তোমাক জোলা কয়ে ডাকে?

কাশেম হাসে।

কী কও বউ? লোকে যে তোমাক জোলার বউ কয়, তোমার খারাপ লাগে? আমার তো গইরবে বুকের ছাতি ফুলি যায়।

উহ, তাঁত, মাকু—কিছুই নাই? সে কিনা জোলা? হইছ তো ফেরিওয়ালা। বাড়ি বাড়ি লুঙ্গি-গামছা ফেরি কইরে বেড়াও।

কাশেমের বাপ-দাদা ছিল তাঁতি। বংশানুক্রমিক ব্যবসা ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়া কাশেম এখন কাপড় ফেরি করে বেড়ায়। বংশের মান রাখতে না পারার লজ্জা ওকে যত না কাবু করে, তার চেয়ে বেশি কাবু করে প্রতিবন্ধী মেয়ে ময়নার উদ্ভ্রান্ত মুখ, দিগ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। আল্লাহ তাআলা কাশেমকে একটাই সন্তান দিয়েছেন, যাকে বুকে করে সে সংসারের অভাব-অভিযোগ ভুলে থাকতে পারত। কিন্তু উল্টো এই সন্তানই ওকে ভাগ্যবিমুখ আর অভিশপ্ত করে রেখেছে।

সালাম ফিরাতে গিয়ে কাশেম টের পায়, আকাশের রক্তঝরা চোখ নিভে গেছে। সন্ধ্যার রংও পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত। মোনাজাত ধরতেই ওর একমাত্র চোখ ভিজে উঠে মুক্তা ঝরে। পুরনো সব ফরিয়াদ ওপরে নতুন করে জানিয়ে কাশেম চোখ মুছতে মুছতে কাপড়ের বোঁচকাটা নিজের দিকে টেনে গামছার ওপরে বসে।

কাশেমের বাড়ির আশপাশের দশ-বারো ঘরে তাঁতের খটখটানি আছে। গত কয়েক বছরে দিনও ফিরেছে অনেকের। কাশেমের দিন ফেরেনি। ও তবু আশায় দিন গোনে। ওর নষ্ট চোখ ঠিকরে আলো বের হয়। সেই আলোতে আশাফুল লক্ষ তারা হয়ে জ্বলে। গণনাকাল অচিরেই শেষ হবে ভেবে ওর বুকে আরাম লাগে।

হিম হিম ভেজা বাতাস বইছে। শীতের রাতে অন্ধকার দ্রুত জমাট বাঁধে। গায়ের চাদর ভালো করে পেঁচিয়ে নিয়ে তৃষ্ণাতুর কাশেম সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। মশার ঝাঁক উড়ে এসে ওর নিরবচ্ছিন্ন বসে থাকায় ব্যাঘাত ঘটায়। রক্তচোষা ডুমো ডুমো মশাদের অত্যাচারে উঠে দাঁড়াতেই কাশেম চমকে যায়। আঁধারের পর্দা ভেদ করে একটা আলোর বিন্দু ফুটে উঠেছে।

ওই তো আগন্তুক এসেছে! পাতাহীন বাবলাগাছের গোড়ালিতে কায়দা করে শরীর ঠেস দিয়ে বসেছে সে। কাশেমের চোখের পলক পড়ে না, যেন কোনো স্বর্গীয় ছবি দেখছে ও। ওর শরীরের পেশি শিথিল হয়ে আসে। মাঘের কুয়াশা জাল বিস্তার করতে শুরু করেছে। চতুর্দিকে অখণ্ড নীরবতা ঘিরে আছে। আচমকা আগন্তুকের মাথার ওপর একরাশ আলো নেমে আসে। দেখে কাশেমের চোখ ভিজে যায়; ভক্তিতে মাথা অবনত হয়—হ্যাঁ, ওই তো সেই মহাপুরুষ, সে আর কেউ নয়।

কাশেম এক ছুটে আগন্তুকের কাছে যায়। নিজের বুক তোলপাড় করা শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রবল শব্দে ও কেঁপে ওঠে। কাছে-পিঠে কেউ নেই। আগন্তুকের মুখ ভালো করে দেখতে পায় না সে। কী বলে আগন্তুককে সম্বোধন করবে বুঝে উঠতে না পেরে কাশেম ভেজা ঘাসে বসে পড়ে দুহাত জড়ো করে। আমি জানি, আপনি পাইরবেন। আমি মেলা দূর থেনে আইছি। হিরু কইছে, আপনের অনেক ক্ষমতা। আমার বাড়িত একবার যায়া আমার গেদির শরীরে যদি একটু ফুঁক দিইয়ে দিতেন। গেদি আমার বিছানায় পড়া। জন্মের থেন বোধ নাই। অত সোমত্ত মাইয়া বিয়া দিবের পারি না।

অপর দিক থেকে কোনো শব্দ আসে না। আগন্তুক নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তার ঝোলা হাতড়ায়। তাই দেখে কাশেমের কৃতজ্ঞ চোখে চাঁদের ঝিলিক লাগে। বুঝিবা কোনো ওষুধ বের হবে ওই ঝোলা থেকে! কিন্তু না। তাকে অবাক করে চাঁদ কাঁদে। বিরহী সেই কান্নায় চারপাশ ঘোলা হয়ে আসে। ভক্তের মিনতি উপেক্ষা করে ধনুকের ফলার মতো টান টান হয়ে দাঁড়ায় আগন্তুক। তারপর পূর্ণদৃষ্টিতে একবার কাশেমের দিকে তাকায়। অবাঙ্ময় সেই দৃষ্টি পাঠ করে কাশেমের বুকে স্বপ্নের কল্লোল জাগে, এবার বুঝি উপায় হবে।

কিন্তু এক ফুঁতে সব আশা নিভিয়ে দিয়ে হুট করে আগন্তুক হাঁটতে শুরু করে। কাশেমের পা চলে না। ও অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে আগন্তুকের চলে যাওয়া দেখে।

কাশেমের চোখে আশার মরীচিকা। ওর বুক বিদীর্ণ করে ভারী একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, যার ভার বইতে না পেরে ওর চোখ ভিজে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে কুয়াশার মাঝে আগন্তুকের অস্তিত্ব মিলিয়ে যায়, ভেজা বাতাসে শুধু তার শরীরের অচেনা গন্ধ লেগে থাকে।

মন্তব্য