kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

বিশ্বসাহিত্য নিয়ে

মাসুদুজ্জামান

৫ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে




বিশ্বসাহিত্য নিয়ে

খুব বিস্মিত হইনি, যখন কয়েক বছর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রিয়ভাজন কবি শামীম রেজা জানিয়েছিলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অচিরেই তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ নামে একটি নতুন বিভাগ খোলা হচ্ছে। বিস্মিত হইনি, কারণ শামীম যে বিশ্বসাহিত্যের একজন ভালো পাঠক, সেটা আমার জানা ছিল। কিন্তু তিনি যে এ রকম একটা উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, সেটাই ছিল আনন্দের খবর। পরে শুধু বিভাগ নয়, একটা ইনস্টিটিউটই স্থাপন করার কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। এখন এটি ‘বঙ্গবন্ধু ইনস্টিটিউট অব কমপ্যারেটিভ লিটারেচার অ্যান্ড কালচার’ নামে আরো বড় পরিসরে কাজ করছে। সেখানে যোগ দিয়েছেন আমার আরেক প্রিয়ভাজন কথাসাহিত্যিক একসময়ের মেধাবী ছাত্র হামিম কামরুল হক। আরো কেউ কেউ আছেন নিশ্চয়ই। এই উদ্যোগ বাংলাদেশে প্রথম এবং সম্ভবত উপমহাদেশে দ্বিতীয়। একমাত্র কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া এ রকম কোনো বিভাগ বা ইনস্টিটিউট উপমহাদেশের কোথাও নেই। বাংলাদেশে, আমার শিক্ষক আবু হেনা মোস্তফা কামালের কাছে শুনেছিলাম, মুনীর চৌধুরীর নাকি এ রকম একটি বিভাগ খোলার ইচ্ছা ছিল। তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে ড্রাইডেন ও ডি এল রায়কে নিয়ে একটা তুলনামূলক লেখাও তিনি লিখেছিলেন। ফলে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ইনস্টিটিউটটি স্থাপিত হলো, তার গুরুত্ব নিঃসন্দেহে অপরিসীম। এর সঙ্গে ‘কালচার’ বা সংস্কৃতিকে যোগ করায় ইনস্টিটিউটটির কাজের পরিধি শুধু বাড়েনি, বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে যে সংস্কৃতির সম্পর্ক গভীর, সেটাও স্বীকৃত হলো। এ প্রসঙ্গেই মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথ ও গ্যোয়েটের কথা।

অভাবনীয় নয়, তবু রবীন্দ্রনাথ ও গ্যোয়েটে, বিশ্বসাহিত্য নিয়ে এই দুই সর্বান্বয়ী মনীষার আগ্রহ ছিল অনিঃশেষ। গ্যোয়েটে ১৮২৭ সালে এক শিক্ষার্থীকে বলেছিলেন, ‘বিশ্বসাহিত্যের কালান্তর প্রায় এসে গিয়েছে এবং প্রত্যেকেরই কর্তব্য সেদিকে নজর রেখে তার অগ্রসৃতি ত্বরান্বিত করে তোলা।’ তিনি ভেবেছিলেন, সময়টা এমন যে এখনই একটা ‘সমগ্রধর্মী বিশ্বসাহিত্য’ নির্মিত হওয়া উচিত। এর ঠিক ৮০ বছর পরে ১৯০৭ সালে রবীন্দ্রনাথ কলকাতার জাতীয় শিক্ষাপরিষদে ‘বিশ্বসাহিত্য’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। ওই প্রবন্ধে তিনি বলেছিলেন, ‘গ্রাম্য সংকীর্ণতা হইতে নিজেকে মুক্তি দিয়া বিশ্বসাহিত্যের মধ্যে বিশ্বমানবকে দেখিবার লক্ষ্য আমরা স্থির করিব, প্রত্যেক লেখকের রচনার মধ্যে একটি সমগ্রতাকে গ্রহণ করিব এবং সমগ্রতার মধ্যে সমস্ত মানুষের প্রকাশচেষ্টার সম্বন্ধ দেখিব এই সংকল্প স্থির করিবার সময় উপস্থিত হইয়াছে।’ রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, সাহিত্যের মধ্য দিয়ে মানুষ তার ভাবনাকে কিভাবে প্রকাশ করে, নিজের কোন নিত্যরূপ সে দেখতে চায়, অস্তিত্বকে কিভাবে আভাসিত করে, এসবই হচ্ছে বিশ্বসাহিত্যের মর্মকথা। শুধু এই একটি প্রবন্ধ নয়, বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে নিজের ধারণাকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করার জন্য এর আগে ও পরে আরো দুটি পরিপূরক প্রবন্ধ পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ; এর একটি ‘সৌন্দর্যবোধ’, অন্যটি ‘সৌন্দর্য ও সাহিত্য’।

গ্যোয়েটে ও রবীন্দ্রনাথ, বোঝা যায়, দুজনেই ছিলেন বিশ্বসাহিত্যের সমর্থক। গ্যোয়েটের কাছে বিশ্বসাহিত্য বলতে কী বোঝায়, বিষয়টি খুব পরিচ্ছন্ন ছিল না। বিশ্বসাহিত্যে স্থানীয় সাহিত্যের স্থান কী হবে, তিনি সে সম্পর্কে কোনো ধারণা দিতে পারেননি; তার ভাবনা ছিল অনেকটাই ইউরোকেন্দ্রিক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ অংশ বা স্থানীয় সাহিত্যকে সমগ্র বা বিশ্বসাহিত্যের ভিত্তি বলে বিবেচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ গ্যোয়েটের তুলনায় তাই ছিলেন প্রাগ্রসর মানুষ, এটাই ছিল তাঁর আধুনিকতা। এই আধুনিকতায় সমগ্রকে স্বীকরণ করে নিয়ে নিজস্ব সাহিত্যকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বসাহিত্য সংক্রান্ত ভাবনা তাই ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ ছিল না, ছিল না কোনো বিশেষ দেশ, কাল বা লেখককেন্দ্রিকও। প্রাচ্য ও প্রতীচ্য, দেশজ ও আন্তর্জাতিকতারই নিবিড় সংযোগ ও সাযুজ্যই ছিল রবীন্দ্রভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। এই ভাবনার প্রেক্ষাপটেই তিনি ‘বিশ্বভারতী’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, যে প্রতিষ্ঠানটি একই সঙ্গে হবে ভারতীয় ও বৈশ্বিক।

কিন্তু এত কিছুর পরও একটা কথা প্রায়ই উত্থাপিত হয়, ‘বিশ্বসাহিত্য’ ধারণাসূত্র ব্যবহার করাটা কি যথার্থ হয়; আর যদিও বা ব্যবহার করার চেষ্টা করি, তাহলে এই যে বিপুল সাহিত্য, একে কীভাবে ব্যাখ্যা করব আমরা? কীভাবে এ সম্বন্ধে ধারণা তৈরি করা যাবে? বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে কীভাবে নিজেদের সাহিত্যকে মিলিয়ে দেখবো? বিশ্বসাহিত্যকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার মতো তাত্ত্বিক রীতিপদ্ধতি কী জানা আছে আমাদের? তুলনামূলক সমালোচনার সূত্র অনুসরণ করেও কি বিশ্বসাহিত্যের বিপুলতা আর বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করা সম্ভব? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে ভৌগোলিকভাবে কী পরিমাণ লেখালেখি হয়েছে, অথবা ভুবনীকরণের অর্থনৈতিক তত্ত্বকে সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে বিশ্বসাহিত্যের সৃষ্টিশীল অভূতপূর্ব বৈচিত্র্য আর অন্তর্গত বৈশিষ্ট্যকে বোঝা সম্ভব হবে না। বিশ্বসাহিত্যকে বুঝতে হলে আমাদের সাহিত্যকে দেখার সাধারণ আটপৌরে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে।

উনিশ শতকেই প্রথম ব্যাপারটা ঘটতে শুরু করেছিল। এই সময় থেকে ‘রাজনৈতিক রাষ্ট্র’কে কেন্দ্র করে সাহিত্য আর সাহিত্যের ইতিহাসকে রাজনৈতিকভাবে দেখার সূত্রপাত ঘটে। অবচেতনভাবে সাহিত্য বলতে তাই জাতীয় সাহিত্যকে বোঝানো হতো, এখনো তা-ই হয়। আমরা সাহিত্যকে বিচার-বিবেচনাও করি এই দৃষ্টিকোণ থেকে। পৃথিবীর সর্বত্র সাহিত্য বিশ্লেষণের এই হচ্ছে সাধারণ রীতি—জাতীয়ভাবে দেখা। এ কারণেই আমরা জাতীয় বা আন্তর্দৈশিক এমন কোনো কোনো বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সাহিত্য বিশ্লেষণ করি, যা প্রায় অন্ধত্বের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এখন এই রীতিকে এতটাই অনিবার্য ভাবা হয় যে নিজেদের দেখার সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সাহিত্যকেই শেষ অবধি ছোট ছোট বিভিন্ন খোঁপের মধ্যে বন্দি করে ফেলেছি। গত প্রায় চার শতক ধরে এভাবেই সাহিত্য সম্পর্কিত ভাবনা গড়ে তোলা হয়েছে। গত দুটি শতকে ঘটেছে সাহিত্যের সার্বিক ‘জাতীয়করণ’। সাহিত্য এবং সাহিত্যের ইতিহাসকে রাজনৈতিক আর ভাষাতাত্ত্বিক সীমার মধ্যে আটকে ফেলে এভাবেই আরো সংকীর্ণ করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু ধারাবাহিক এই লেখাটির লক্ষ্য হবে সাহিত্যের যে দেশকাল অতিরিক্ত একটা চরিত্র আছে, দেশের মাটিতে শিকড়িত হয়েও যা দেশকে অতিক্রম করে যায়, ছুঁয়ে দেয় এক সর্বমানবিক বোধকে—কি ভাবনায়, কি মানবিক সংবেদনা সৃষ্টিতে, কি নান্দনিক কলাপ্রকরণে, সাহিত্যের সেই চরিত্রকেই বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে পুনরুদ্ধার করা। এ জন্য প্রথমেই যা প্রয়োজন তা হলো, আমাদের দেখার চোখটাকে বদলে ফেলে অন্য রকমভাবে দেখা। 

ফরাসি ইতিহাসবিদ ফার্নান্দ ব্রোদেল কোনো টেক্সট বা রচনাকে দেখার সত্যিকার পরিবর্তন আনতে হলে সেই রচনাকে পরিমাপ করার, ব্যাখ্যা করার, প্রশংসা করার, অনুধাবন করার এবং তুলনা করার যে প্রচলিত দৃষ্টিকোণ আছে, সেই দৃষ্টিকোণটাকেই বদলে ফেলার কথা বলেছিলেন। সাহিত্যকে দেখার চোখটাকে যদি এভাবে বদলে ফেলতে হয়, তাহলে সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ইতিহাসের প্রান্তগুলোকে সমানভাবে ছুঁয়ে দিতে হবে। উন্মোচিত করে দেখাতে হবে বিশ্বসাহিত্যের কোন কোন ক্ষেত্রে জাতীয়তাবিহীন ইতিহাস, সাহিত্যিক ঘটনাবলি, প্রতিদ্বন্দ্বিতার টানাপড়েন, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, দ্রোহ আর বিপ্লব সূক্ষ্ম আর অদৃশ্যভাবে সংঘটিত হচ্ছিল। ফলে বিশ্বসাহিত্য নয়, আন্তর্জাতিক সাহিত্য পরিসরকেই সামগ্রিকভাবে বিবেচনায় আনতে হয়েছে। সেই সঙ্গে এ-ও মনে রাখা জরুরি যে সাহিত্য শুধু সৃজনশীল রচনামাত্র নয়, যা পাঠ করে পাঠক শুধু আনন্দ পেতে চায়। সাহিত্যিক রচনা একই সঙ্গে আনন্দ আর মানবিক চিত্প্রকর্ষের পরিশীলিত প্রকাশ। ফলে শুধুই সমকালীন সাহিত্যভাবনা বা পরিস্থিতির বিবরণ নয়, বরং সাহিত্যের দীর্ঘকালের ইতিহাস, যে ইতিহাসের মধ্য দিয়ে এটি আন্তর্জাতিক পদবাচ্য হয়ে উঠেছে—এর সৃজনী বৈশিষ্ট্য, কীভাবে তা রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী ভাবনা থেকে মুক্ত হতে পেরেছে, ক্রমোন্নতির রেখা ধরে কীভাবে নিজে নিজেই উত্কর্ষের শিখরে পৌঁছে গেছে—সেসবও বিবেচনায় আনা হবে। আমার এই লেখার মূল দৃষ্টিবিন্দুটি নিবদ্ধ থাকবে আরেক ফরাসি দার্শনিক পিয়েরে বরদিউ যেমন বলেছিলেন, সেই ‘সাহিত্যবিশ্বে’র ওপর, যে বিশ্ব তার ভাবনা অনুসারে প্রতিদিনের বিশ্বের তুলনায় নিরপেক্ষ। এই সাহিত্যবিশ্বের সীমা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, ছড়িয়ে পড়ার পরিসর সাধারণ রাজনীতির দ্বারা কখনোই নিয়ন্ত্রিত হয় না, হতে পারে না। এ কারণেই ষোল শতকের একজন শেকসপিয়ার যখন ঐতিহাসিক পুরাতাত্ত্বিক ঘটনা নিয়ে নাটক লিখে বিশ্বপাঠকের কাছে সমাদৃত হন, একইভাবে সমাদৃত হন সমকালের কৃষ্ণাঙ্গ ঔপন্যাসিক চিনুয়া আচেবে কিংবা ঈষত্ পূর্বকালের বাদামি বর্ণের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

লেখকদের কোনো দেশকাল নেই, এই আপ্তবাক্যটি এভাবেই যথার্থতা পায়। আন্তর্জাতিক সাহিত্য পরিসরের কথা বললে সেই সঙ্গে আরেকটি কথা আমাদের মনে পড়ে যায়, সেটা হলো সাহিত্য-প্রাধান্যের কথা। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও যে আধিপত্যবাদ কাজ করে, আন্তর্জাতিক সাহিত্যের কথা ভাবলে সেই প্রসঙ্গটিও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। তবে এই প্রাধান্য বা আধিপত্যের বিষয়টি কখনোই রাজনৈতিক আধিপত্যের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে না; কেননা পাঠকের রুচি আর হূদয়ের কাছেই এর যত আবেদন। নিজের লেখার উত্কর্ষ ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র দিয়ে পাঠককে পদানত করার ক্ষমতা কোনো লেখকের নেই। কখনো কখনো কোনো কোনো দেশে রাজনীতি লেখকদের নিয়ন্ত্রণ করেছে বটে; কিন্তু তা ছিল নিতান্তই সাময়িক। আন্তর্জাতিক সাহিত্যবিশ্ব তাই মুক্ত, স্বাধীন জীবনানন্দেরই প্রকাশ।

সাহিত্যের এই মুক্ততা, পরিসরের স্বাধীনতা, দেশকালকে অতিক্রম করে যাওয়ার বিশিষ্টতাই সাহিত্যকে পড়বার এবং বিশ্লেষণ করে দেখার নতুন নতুন কৌশলের সূচনা ঘটিয়েছে। এই পাঠ ও বিশ্লেষণ কোনো দ্বন্দ্ব ছাড়াই একই সঙ্গে অন্তর্গতভাবে রচনাকেন্দ্রিক, অন্যদিকে বাইরের দিক থেকে ঐতিহাসিক।

অর্থাত্ সাহিত্যকে যেমন পড়তে বা ব্যাখ্যা করতে হয় নিজস্ব রচনা হিসেবে, তেমনি আবার ঐতিহাসিকভাবে। এভাবেই ঘুচে যায় সেই পার্থক্য, যার একদিকে আছেন শুধু রচনাটাকেই গভীরভাবে পড়তে চান সেই পাঠকেরা, আরেক দিকে সাহিত্যের ইতিহাসকে বাইরে থেকে যাঁরা দেখে থাকেন তাঁরা। এ জন্যই প্রয়োজন হচ্ছে, কোনো বিশেষ রচনা কীভাবে বিশ্বসাহিত্যে স্থান করে নিয়েছিল, সেটা বুঝতে চেষ্টা করা। তবে এ জন্য শুধু সেসব রচনা নয় যে রচনাগুলো ঔপনিবেশিক অথবা সাম্রাজ্যবাদী বিষয়কে ছুঁয়ে দিয়েছিল; বরং এমন সব রচনার কথাও ভাবা উচিত, যার রচয়িতা ছিলেন বেকেট বা কাফকার মতো লেখক; আর যাঁদের লেখাগুলো ছিল আপাত-অর্থে ইতিহাসবিমুক্ত, রাজনীতিবর্জিত। প্রাধান্যসূচক সাহিত্যের প্রাধান্য এতটাই প্রবল হয়ে উঠতে পারে যে এসব রচনা বিশ্লেষণের সূত্র ধরেই আমরা বুঝতে পারি ঐতিহাসিকভাবে সাহিত্য কীভাবে, কত বিচিত্র পথে এগিয়েছে। বিশ্বের কোনো কোনো বিশেষ অঞ্চল বা মহাদেশ অনন্য সৃজনশীল সাহিত্য রচনার পীঠস্থান হিসেবে আমাদের সমীহ আদায় করে নিয়েছে।

তাত্ত্বিকভাবে সাহিত্য সমালোচনার দু’টি রীতি এখনও অব্দি প্রায় পরস্পরবিরোধী; কিন্তু জরুরি বলে বিবেচিত হচ্ছে। এর একটি হলো উত্তর-উপনিবেশবাদী সমীক্ষণ; এই তত্ত্বসূত্রটি ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে সাহিত্যের পুনর্মূল্যায়ন করছে। এই তত্ত্বের প্রবল রাজনৈতিক মাত্রা আছে। দ্বিতীয় যে সমালোচনারীতিটি অনুসৃত হচ্ছে, সেটি হলো ফরাসি ঐতিহ্যবাহী সমালোচনারীতি। এই রীতিতে শুধু নির্দিষ্ট রচনাটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। রচনার নিজস্ব অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য, শৈলী—অর্থাত্ লেখাটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ, একমাত্র লক্ষ্য। রচনা বা লেখার বাইরের কোনো কিছু এই তত্ত্বে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় না। ইতিহাস বা রাজনৈতিক অনুষঙ্গকে এই তত্ত্বে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়। সাহিত্যবিশ্বকে ফরাসি সমালোচনারীতি অনুসারে মনে করা হয় ‘বিশুদ্ধ’, রাজনীতি বা ইতিহাসের মধ্যে টেনে আনা হলে এই বিশুদ্ধতা ক্ষুণ্ন হয়। এই তত্ত্বসূত্রটি, বলা নিষ্প্রয়োজন, খণ্ডিত। সাহিত্যকে এ রকম একক কোনো সূত্র দিয়ে সামগ্রিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। ফলে, ইতিহাসের পর্বে পর্বে সাহিত্যের মধ্যে কী ধরনের রূপান্তর ঘটেছে, রাজনীতি সাহিত্যকে কতটা প্রভাবিত করতে পেরেছে, রাজনীতি ও ইতিহাসের ওপর সাহিত্য কতটা নির্ভরশীল ছিল অথবা স্বাধীনতা গ্রহণ করে অগ্রসর হয়েছে, সেসবের উল্লেখ ও বিশ্লেষণ জরুরি। বলা বাহুল্য, মহত্ সৃষ্টিশীল লেখকেরা ধীরে ধীরে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন। তাঁদের কাছে সাহিত্যের নিজস্ব শক্তি ও সম্ভাবনাই ছিল মূল কথা; সাহিত্যের স্বাধীনতাকেই তাঁরা আবিষ্কার-পুনরাবিষ্কার করে কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। লক্ষ করলে দেখা যাবে, স্বাধীনতা, স্বনির্ভরতা, অনন্যতাই হচ্ছে তাঁদের রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। অনুবাদের কথাটিও এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রধানত অনুবাদের মাধ্যমেই তাঁদের লেখা সাহিত্যবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। অনুবাদের প্রসঙ্গ ও তাত্পর্যও তাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। আরো স্পষ্ট করে বললে, আন্তর্জাতিক সাহিত্য-সমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সাহিত্যকে বিচার করতে হবে। বিশ্বসাহিত্যের এটাই হচ্ছে অন্বিষ্ট।

সাহিত্য সমালোচনার যে দেশকেন্দ্রিক রীতি প্রচলিত আছে, যেমন বাংলাদেশের সমালোচনা সাহিত্য একান্তভাবেই বাংলাদেশের; ফরাসি সমালোচনা ফরাসিদের; এর কোনোটিই আন্তর্জাতিক নয়। অর্থাত্ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সাহিত্য সমালোচনার খুব একটা চল নেই। সে দিক থেকে বিবেচনা করলে সাহিত্য সমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গিটিও হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক, অর্থাত্ তুলনামূলক। সাহিত্য, বিশেষ করে বিশ্বসাহিত্য কীভাবে আমাদের সাহিত্যবোধ ও প্রত্যয়কে নির্মাণ করে দিয়েছে, আমাদের সাহিত্য আলোচনা ও সমালোচনায় থাকা উচিত এসবেরই বিবরণ ও বিশ্লেষণ—ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও নান্দনিক নানা দিক থেকে।  সাহিত্যবিশ্বের বৈশ্বিক ইতিহাস, আবিষ্কার, পরিসর, সর্বজনীনতা, ভুবনীকরণ, অনুবাদের কার্যকারিতা ও প্রভাব, জাতীয়তা ও ঐতিহ্যের উদ্ভাস, সৃজনী দ্রোহ, সংগতি, সমন্বয়, সার্বিকভাবে সাহিত্যের বহুমাত্রিকতার কথাই বিবৃত হওয়া উচিত আমাদের সমালোচকদের বাচনে ও বয়ানে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ যে তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতির সূচনা ঘটল, আশা করব তা প্রভাবসঞ্চারী একটা বিদ্যায়তনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। এ জন্য এই মুহূর্তে যাঁরা বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে ভাবেন, কাজ করেছেন, তাঁদের যুক্ত করা জরুরি। বঙ্গবন্ধু যেমন চিন্তাভাবনার দিক থেকে ছিলেন দৈশিক ও আন্তর্জাতিক, তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানটিও ঠিক সে রকম কাজই করবে বলে মনে করছি। বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি তাহলে বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে, জাতি হিসেবে যা আমরা এখন বাংলাদেশের জন্মের সুবর্ণ জয়ন্তীর (২০২১) ঠিক দুই বছর আগে আশা করতেই পারি।

মন্তব্য