kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

লেখার ইশকুল

স্পষ্টবাদী পুশকিন

২৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



স্পষ্টবাদী পুশকিন

পুশকিনের সংক্ষিপ্ত জীবনে লেখা সাহিত্য বৈচিত্র্যে ভরপুর। ক্লাসিক্যাল ওড, রোমান্টিক কবিতা, প্রেমের কবিতা, রাজনীতির কবিতা, ঐতিহাসিক নাটক, জীবনমুখী গদ্য, উপন্যাসিকা, ছোটগল্প, রূপকথা, ভ্রমণকথা, কাব্যিক উপন্যাসসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন তাঁর সাহিত্য। আলেকজান্ডার পুশকিনকে যথার্থই বলা হয় আধুনিক রুশ ভাষার গোড়াপত্তনকারী। রাশিয়ার ক্লাসিক কবিতার উচ্চমার্গীয় ভাষা ত্যাগ করেন এবং অতীতের কাব্যশৈলীর ভাষা আর মানুষের মুখের প্রাত্যহিক ভাষার মাঝখানের বিভাজন তুলে ফেলেন।

বিশ শতকের লেখকদের লেখার বিষয়বস্তু প্রথমত চালু করে দিয়ে গেছেন পুশকিন। সমাজের নিচু স্তরের কোনো সাধারণ ব্যক্তির জীবনযন্ত্রণার কথা, সমাজের সঙ্গে ব্যতিক্রমধর্মী কোনো চরিত্রের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কথা, কর্তব্য পালন এবং ব্যক্তিগত সুখের মধ্যে যেকোনো একটা বেছে নেওয়ার দ্বন্দ্ব, প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে নিঃসঙ্গ ব্যক্তির বিদ্রোহ—এসব বিষয় দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, চেখভ, বুনিন প্রমুখের লেখায় আসার আগে প্রথমত এসেছে পুশকিনের লেখায়। পুশকিনের কাব্যিক উপন্যাস ‘ইউজিন ওনেজিন’কে বলা হয় রুশ জীবনের বিশ্বকোষ। দেশের জীবন ও সংস্কৃতির সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায় তাঁর এই রচনায়। ১৮২৩ থেকে ১৮৩১ সাল পর্যন্ত সময়ে লেখেন এই কাব্যিক উপন্যাস। ১৮২৫ থেকে ১৮৩২ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেন। বই আকারে প্রথম প্রকাশ করেন ১৮৩৩ সালে। ১৪ পঙিক্তর ৩৮৯ স্তবকে লিখেছেন এটা। এখানে ব্যবহূত স্তবককে বলা হয় ‘ওনেজিন স্তবক’ কিংবা ‘পুশকিন সনেট’। লেখার মধ্যে আপাতসহজতার মধ্য দিয়েই তিনি স্বচ্ছ চিত্রকল্প তৈরি করেন। অল্প কথায় প্রাণবন্ত ও পরিষ্কার চিত্রকল্প তৈরি করে পাঠকের মনে স্থায়ী আবেদন সৃষ্টি করেন তিনি।  

পুশকিনের খ্যাতি প্রধানত ছড়িয়েছে তাঁর মৃত্যুর পর। জীবদ্দশায় তিনি শাসকদের নানা রকম হয়রানি এবং নির্যাতনের শিকার হন। ১৮২০ সালে তিনি প্রকাশ করেন মহাকাব্য ‘রুসলান ই লিউদমিলা’। এটি প্রকাশের পরপরই তাঁকে রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে নির্বাসনে পাঠায় তত্কালীন শাসকচক্র। স্পষ্টবাদী রাজনৈতিক মতামতের কারণে তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। পুশকিন শুধু শাসকদের নয়, ক্ষমতাধর কোনো ব্যক্তিকেই ছাড় দিয়ে কথা বলেননি। ফলে তাঁকে নানা সময়ে বিপদে পড়তে হয়েছে। নির্বাসনে না থাকলে তিনি সরাসরি আন্দোলনে যোগ দিতেন। কারণ তিনি ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং নিজস্বতার মূল্য বুঝতেন। তাঁর মতে, ‘শান্তি আর স্বাধীনতা ছাড়া এই জগতে কোনো সুখ নেই।’

পুশকিনের ওনেজিনসহ কোনো কোনো লেখা জটিলতায় ভরা। তাঁর ওনেজিন অনুবাদের সময় স্বয়ং ভ্লাদিমির নবোকভও বিপন্ন বোধ করেন। অনুবাদের ক্ষেত্রে অসুবিধার কারণে পুশকিনের অনেক লেখা ইংরেজিভাষী পাঠকদের কাছে অপরিচিত থেকেছে। অবশ্য তার পরও পুশকিন পশ্চিমের লেখকদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছেন। তাঁর স্বদেশিদের কাছেও ছিলেন সমান প্রিয়। ১৮৮০ সালে রুশ লেখকদের এক অধিবেশনে পুশকিনকে স্মরণ করে দস্তয়েভস্কি বলেন, ‘পুশকিনের মতো বিশ্বজনীন সহমর্মিতা আর কোনো কবির মধ্যে পাওয়া যায়নি। শুধু সহমর্মিতা নয়, তাঁর বিস্ময়কর গভীরতা এবং বিদেশের মানুষদের মধ্যে তাঁর আত্মার পুনরাবির্ভাব সবখানেই দেখা যায়। তাঁর আত্মার এই পুনর্জাগরণ প্রায় নিখুঁত।

►দুলাল আল মনসুর

মন্তব্য