kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

নৌযাত্রা, মেরিন গাইড ও শিশুসাহিত্যিক

মঈনুস সুলতান

২৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



নৌযাত্রা, মেরিন গাইড ও শিশুসাহিত্যিক

বালুচরে কায়াক—জাতীয় নৌকা

নিকারাগুয়ার বারকা ডে অরো নামে সমুদ্রসৈকতে আমি আসি সুহূদ সিনিওর ডিগমারের সঙ্গে। এ এলাকা সম্পর্কে ডিগমারের জানাশোনা প্রচুর। আজ আমি তাঁর হিল্লে ধরে যেতে চাচ্ছি ইসলা হুয়ান ভেনাডো নামে একটি দ্বীপে সি টার্টল বা সামুদ্রিক কচ্ছপদের প্রজনন দেখতে। প্রায় জনমানবহীন দ্বীপটিতে বোটে চড়ে একাকী গিয়ে হাজির হওয়ার প্রথা নেই। এসব ট্রিপে এসকট হিসেবে ভাড়া করতে হয় মেরিন গাইডদের। শুনেছি যে সৈকতেই মেরিন গাইড তরুণীরা পর্যটক গোছের খদ্দেরের তালাশে ঘুরপাক করে। তাই তাদের স্পট করার জন্য সিনিওর ডিগমার ও আমি সূর্যস্নানরতদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাঁটি।

সিনিওরের সঙ্গে টুকটাক গল্পগাছা করতে করতে হাঁটছিলাম। দেখি, সৈকতে কাঁকড়ার পদছাপ আঁকা বালুকায় তোয়ালে বিছিয়ে শুয়ে বিকিনি পরা দুটি মেয়ে। এদের একটি পেপারব্যাক পড়তে পড়তে আড়চোখে আমাদের দিকে তাকায়। অন্য মেয়েটির কপালে রাখা শসার কাটা দুটি টুকরো। সিনিওর তাদের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শিস দিয়ে বলেন, ‘ওলা চিকাস্, বুয়েন দিয়া—বা মেয়েরা, শুভ দিন।’ যুবতী দুটি ঝটপট করে উঠে এগিয়ে এসে পরিচিত হয়। এদের একটির নাম বিয়াংকা, অন্যটি ক্রিসটেলা। এরা নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে নিকারাগুয়েনসে, তবে অভিবাসীর সন্তান হিসেবে বাস করে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায়। সামারের ছুটিতে ফিরে এসেছে তাদের মা-বাবার দেশ নিকারাগুয়ায়। সৈকতে সূর্যস্নান ছাড়াও এরা পার্টটাইম পেশা হিসেবে মেরিন গাইডের কাজ করে। চাইলে এদের এসকট বা সাথি করে নাও বেয়ে চলে যাওয়া যায় কাছেরই জনহীন দ্বীপ ইসলা হুয়ান ভেনাডোতে।

পরিচয় হতেই সিনিওর আমার লেখাজোখার স্বভাবের উল্লেখ করে তাদের বলেন, ‘সালুদার আ উন এসক্রিতর বা মেয়েরা সম্ভাষণ জানাও একজন লেখককে।’ এতে ক্রিসটেলা দারুণভাবে অবাক হয়ে বলে, ‘ওয়াও, আ রিয়েল রাইটার, আই ডোন্ট নো হাউ টু সে হ্যালো টু আ রাইটার।’ আমি বলি, ‘তোমার নামটা খুবই সুন্দর,  অন্য কোনো ডাকনাম আছে কি তোমার?’ সে জবাব দেয়, ‘লুক অ্যাট মাই স্কিন কালার, আই অ্যাম ডার্ক, তো পরিবারের সবাই আমাকে ডাকে নিগ্রিতা।’ কথা বলতে বলতে সে ঘন হয়ে কাছে আসতেই আমি তার কাঁধে আলতো করে হাত বুলিয়ে বলি, ‘গার্ল, ইউ শিওর হ্যাভ ফ্লোলেস স্মুদ স্কিন।’ নিগ্রিতা খিলখিল করে হেসে চোখের ঘন পাপড়ি তুলে এমনভাবে তাকায় যে মনে হয়, তার সংবিতে নিঃসঙ্গতার সঙ্গে মিশে আছে এক ধরনের মেলাংকোলি। আন্দাজ করি, মেয়েটি বৃষ্টিপাতের শব্দ শুনতে খুবই ভালোবাসে।

ক্রিসটেলা বা নিগ্রিতা তার তোয়ালে, ব্যাকপ্যাক ইত্যাদি পিক করে আনতে ফিরে গেলে আমি এবার বিয়াংকার দিকে নজর দিই। দারুণ ফিগারের এ মেয়েটি যেন ম্যানস্ ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠা থেকে বিকিনি পরে নেমে এসেছে সমুদ্রসৈকতে। চোখেমুখে একটু মুডি হলেও, কথাবার্তায় এ মেয়ে আরো সাবলীল। শ্যামাঙ্গী নারী তার পাড়াপড়শির কাছে ‘চিকা মরানো’ বলে পরিচিত। সে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে, ‘সিনিওর এসক্রিতর, রাইট সামথিং টাচি হিয়ার’ বলেই সে দুষ্টুমিভরা দুই চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকায়। আমি ভালোবাসার এসপানিওল শব্দ ‘আমর’ তার করতলে লিখে দিই। বিয়াংকা ঠোঁট বৃত্তাকার করে ‘নট সো সুন সিনিওর’, বলে আমার কবজিতে চাপ দেয়। 

ক্রিসটেলা ব্যাকপ্যাক ইত্যাদি কাঁধে ফেলে ফিরে এলে আমি হিপ পকেট থেকে ফ্লাস্ক বের করে জানতে চাই, ‘কিয়ারেস উনা চোপিতা—বা গার্লস্, ওয়ান্ট সাম ড্রিংকস্?’ বিয়াংকা আমার হাত থেকে ফ্লাস্ক নিয়ে ছিপি খুলে জ্যাক ডানিয়েলের সিপ্ নেয়। ক্রিসটেলাও ফ্লাস্কের সামান্য একটু ঝাঁঝালো তরল চেখে বলে, ‘আই উড লাইক আ কাগুয়ামা’, কাগুয়ামা শব্দটির সরাসরি প্রতিশব্দ হচ্ছে সামুদ্রিক কচ্ছপ। ভাবি, মেয়েটি হয়তো লাঞ্চে কচ্ছপের মাংস খেতে চাচ্ছে। অসুবিধা কিছু নেই। ঘাড় হেলিয়ে আমি সম্মতি জানাতেই সিনিওর বলেন, ‘লেটস্ গো টু আ রেস্টুরেন্ট।’

আমরা ছনে ছাওয়া কাঠের দোতলা চাং-বাংলোর মতো একটি রেস্তোরাঁর সিঁড়ি বেয়ে ওপরতলায় উঠে আসি। সিনিওর ডিগমার পানীয়ের অর্ডার দিতে দিতে বলেন, ‘দিস ইজ সুয়াপা রেস্টুরেন্ট, এরা সৈকতের সবচেয়ে ভালো সি ফুডের সরবরাহকারী। এখানকার খাবার লাভলি মেয়ে দুটিরও পছন্দ হবে।’ আস্ত একটি কচ্ছপের খোলে পানীয় পরিবেশিত হলে কাগুয়ামা শব্দে যে ক্রিসটেলা কচ্ছপের মাংস খেতে চায়নি তা বুঝতে পারি। ড্রিংকসিট নিকারাগুয়ার সমুদ্রসৈকতে কাগুয়ামা বা সি টার্টল বলে পরিচিত হলেও আদতে তা হোয়াইট ওয়াইন ও ক্লাউডি লেমোনেডের মিশ্রিত এক ধরনের ককটেল। আনারসের কিউব ভাসা এ পানীয় লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে ‘হোয়াইট সাংগ্রিয়া’ বলে পরিচিত। বাথরুম থেকে বিকিনি বটমের ওপর ম্যানগ্রোব বনের ছাপচিত্র আঁকা ত্রিকোনা ছরং জড়িয়ে বেরিয়ে আসে বিয়াংকা। তার বিকিনি-টপ ছাপিয়ে উদ্ভাসিত হওয়া স্তন যুগলে অসাবধানে লেগে আছে কিছু বালুকা। সে বড় বড় চোখে সারা কামরা স্ক্যান করে আমার সঙ্গে চোখাচুখি হতেই মিষ্টি করে হাসে। আমি ওয়াইন গ্লাসে কচ্ছপের খোল থেকে হোয়াইট সংগ্রিয়া ঢেলে তার হাতে তুলে দিই। সে তাতে চুমুক দিয়ে বলে, ‘ভেরি টেইস্টি অ্যান্ড সুদিং; কিন্তু এরা ককটেলে বেশ খানিকটা হোয়াইট রাম মিশিয়েছে মনে হয়।’ সিনিওর ডিগমার কচ্ছপের খোলের তরল মিক্সে ভেসে থাকা কয়েকটি আঙুর চামচ দিয়ে বিয়াংকার গ্লাসে তুলে দিয়ে বলেন, ‘চিকা মরানো, মনে হয় মেকআপ ছাড়াই তোমাকে সবচেয়ে ভালো দেখায়।’ মেয়েটি প্লান্টি দেয়, ‘হোয়াই ইউ থিংক আই লুকড্ প্রিটি উইদাউট মেকআপ?’ ডিগমার তিন আঙুলে তার গণ্ডদেশ আলতো করে চেপে দিয়ে বলেন, ‘ইয়োর আন পাউডারড্ চিকস্ আর বেগিং ফর কিসেস্।’ এতে ফিক করে হেসে বিয়াংকা তাঁর দিকে মুখ বাড়িয়ে দেয়। সিনিওর তার দুই গালে হালকা করে ঠোঁট ছুঁইয়ে হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে যান বিলিয়ার্ড টেবিলের দিকে।

খাবারের পালা চুকতেই সিনিওর ডিগমার কায়াক জাতীয় নাও ভাড়া করে ইসলা হুয়ান ভেনাডো দ্বীপে যাওয়ার প্রস্তাব করেন। এতে আমরা সবাই সমবেতভাবে উদ্দীপ্ত বোধ করি।

সিনিওর ডিগমার যাত্রার আয়োজনে মেতে ওঠেন। তিনি ডিনারের জন্য তরতিয়া রুটি, আবাকাডো দিয়ে তৈরি গোয়াকোমলি সচ, জলের বোতল ইত্যাদি খরিদ করে রসদপত্র বরফ দেওয়া কুলারে পোরেন। আমি ভাড়া করি জলতলে সাঁতরে বেড়ানোর জন্য চারটি স্লরকেল। তাতে উত্সাহিত হয়ে সিনিওর নির্জন দ্বীপে রাত্রিযাপনের জন্য স্লিপিং ব্যাগ ভাড়া করার প্রস্তাব করেন। মেয়ে দুটি মনে হয় বেজায় ‘আগ্রেডাবলে বা সব কিছুতেই সহজে সম্মত।’ তারা কোনো হেলদোল না দেখিয়ে হুয়ান ভেনাডো দ্বীপে রাত্রিযাপনের আয়োজনে আর কী কী ভাড়া করতে হবে, তার পরামর্শ দেয়। আমিও কায়াকযোগে নির্জন একটি দ্বীপে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠি।

এ সৈকত থেকে সামান্য দূরে পনেলোয়া ফিশিং ভিলেজ। পিকআপ ট্রাকে চড়ে আমরা জেলে পল্লী অতিক্রম করে অতঃপর চলে আসি বারকা ডে অরো নামে আরেকটি সৈকতে। জায়গাটিতে সমুদ্র শান্ত হয়ে ঢুকে পড়েছে বেশ খানিকটা ইনল্যান্ডে। এবড়োখেবড়ো পাথর ছড়ানো বালুচরে পড়ে আছে কয়েকখানা কায়াকজাতীয় নৌকা। সিনিওর ডিগমার সাবধানে গাছের তলায় পিকআপ পার্ক করেন। গাড়ি থেকে নামতেই চোখে পড়ে, দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো বঙ্কিম হয়ে বেলাভূমি চলে গেছে দূর-দূরান্তে। বেশ খানিকটা দূরে, সমুদ্রজলের কিনারে দাঁড়িয়ে শাবকসহ দুটি অশ্ব। বালুকাবেলার সুনসান নীরবতা ও পারে আছড়ে পড়া নোনাজলের মৃদু ছলাত ছলাত আওয়াজ মনে হয় ঘোড়া তিনটিকেও আবিষ্ট করে রেখেছে। অশ্বারোহী এক যুবতী তার সাদা ঘোড়াটি হাঁকিয়ে জল ছুঁয়ে ছলাত ছলাত শব্দে এগিয়ে আসে। সে ঘোড়ার ওপর এমন রিলাক্সড ভঙ্গিতে আধশোয়া হয়েছে যে মনে হয়, মেয়েটি বিভোর হয়ে আছে দিবাস্বপ্নে। ক্রিসটেলা ও বিয়াংকা তার দিকে চেয়ে হাত নাড়ে।

 

বিচিত্র মাছ হাতে কিশোর মাঝি

অতঃপর ডিগমারের তাড়ায় আমরা হেঁটে চলে আসি একটি গ্রিনহাউসে। তার আঙিনায় ঝুরিওয়ালা অচেনা একটি বৃক্ষ শতাব্দীর সাক্ষী হয়ে ছড়াচ্ছে তরুবর-শোভন প্রাজ্ঞতা। আমরা গ্রিনহাউসে ঢুকি, ওখান থেকে পারমিশনের টিকিট কিনে জনহীন দ্বীপ ইসলা হুয়ান ভেনাডোতে যাওয়ার জন্য। কাচের ঘরটিতে প্রচুর তরুলতা। এখানে ভেষজ গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে প্রস্ফুটিত পুষ্পের মন ফুরফুরে করে তোলা সৌরভ। চিত্রিত নকশা হয়ে উড়ছে সবুজের কৃত্রিম কারাগারে বন্দি কিছু প্রজাপতি।

টবে সারজলে বেড়ে ওঠা অনেক তরুর আবডালে আমরা সিনিওর হোসে করডোবার সাক্ষাত্ পাই। রুপালি চুল ও ঝোলা গোঁফে বৃদ্ধকে যুদ্ধফেরত অবসরপ্রাপ্ত কর্নেলের মতো দেখায়। একটি রকিং চেয়ারে বসে আনমনে দোল খেতে খেতে সিনিওর করডোবা এসপানিওল অনুবাদে হ্যারি পটারের চিত্রিত বইটি পড়ছেন। ইসলা হুয়ান ভেনাডোর পারমিশনের রসিদজাতীয় টিকিট বিক্রির দায়িত্বে আছেন তিনি। মেরিন গাইড হিসেবে বিয়াংকা ও ক্রিসটেলার সঙ্গে তাঁর চেনাজানা আছে। এরা টিকিটের কথা বললে সিনিওর হাইপাওয়ারের চশমার ফাঁক দিয়ে তাদের সঙ্গে খুনসুটি করে কিছু বলেন। এতে অত্যন্ত আহ্লাদি ভঙ্গিতে মেয়ে দুটি তাঁর দিকে গণ্ডদেশ বাড়িয়ে দেয়। সিনিওর ফোঁকলা মুখে হেসে মেয়েদের দরাজভাবে চুমো খান। এতে অধৈর্য হয়ে সিনিওর ডিগমার আমাকে ‘এসক্রিতর বা রাইটার’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সিনিওর করডোবা উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে ‘বিয়েনবেনিডো মি এরমানো বা ওয়েলকাম হে আমার ভ্রাতা’ বলে বসার জন্য টুল দেখিয়ে দেন। আমার আন্দাজ হানড্রেড পার্সেন্ট কারেক্ট। বছর ১২ আগে সিনিওর করডোবা নিকারাগুয়ার সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। বর্তমানে ইনি পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোক্তা হয়ে ইসলা হুয়ান ভেনাডো দ্বীপকে কচ্ছপের ব্রিডিং গ্রাউন্ড হিসেবে সংরক্ষণের কাজে হাত লাগিয়েছেন। তিনি ঝোলা গোঁফে তা দিয়ে জানতে চান, ‘এসক্রিতো লিব্রজ পারা নিনিওস—বা বাচ্চাদের জন্য তুমি বই লিখেছ কি?’  আমি নেতিবাচকভাবে মাথা দুলিয়ে বলি, ‘এখনো লিখে উঠতে পারিনি সিনিওর।’ তিনি একটু হতাশ হয়ে বলেন, ‘পরবর্তী প্রজন্মের বাচ্চারাই তো আমাদের ভবিষ্যত্, তা তুমি শিশুদের জন্য লিখতে শুরু করে দাও।’ কথা বলতে বলতে পাশের টেবিল থেকে তুলে আমাকে তাঁর লেখা তিনটি শিশুতোষ বই দেখান।

টেবিলটিতে অযত্নে পড়ে আছে একটি জংধরা টাইপরাইটার, তার পাশে ছোট ছোট টবে রাখা হরেক কিসিমের চিত্রিত পাতার মিনিয়েচার গাছগাছালি। আন্দাজ করি, সিনিওর টিকিট বিক্রির ফাঁকে টেবিলটি ব্যবহার করেন শিশুদের জন্য বই লেখার কাজে। ‘মেসা ডে এসক্রিতর সিমপ্রে মে ইনতেরেসান মুচো—বা একজন লেখকের লেখাজোখার টেবিল আমাকে হামেশা আকর্ষণ করে সিনিওর’—এ কথা বলে আমি টেবিলটি খুঁটিয়ে দেখতে গেলে তিনি তার ড্রয়ার টেনে ওখান থেকে বের করেন লণ্ঠনের চিমনির মতো দেখতে একটি বয়াম। তখনই অবাক হয়ে দেখি, গ্রিনহাউসের কোনায় সিমেন্টের দেয়ালের কাছে ফুলের টব রাখার লোহার র্যাকে বসে একটি টিয়াপাখি। তার ঠিক তলায় বসে একটি বিড়াল মৃদুস্বরে মিয়াও আওয়াজ দিয়ে পাখিটির দিকে পা তুলে দিয়ে যেন কিছু প্রার্থনা করছে। একপর্যায়ে টিয়াটি সামান্য উড়ে তার দাঁড়ে গিয়ে খাবারের বাটি থেকে টুপ করে নিচে ফেলে দেয় বিড়ালের জন্য দুটি দানা।

সিনিওর করডোবা বয়াম থেকে কফির কাপে ঢেলে আমাকে পরিবেশন করেন এক পাত্র রাম। আমি টিয়া ও বিড়ালের প্রসঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন করলে সিনিওর ‘সালুদ বা চিয়ার্স’ বলে সামান্য একটু রাম পান করে বলেন, ‘এদের আমি প্রশিক্ষণ দিচ্ছি পরস্পরের বন্ধু হওয়ার। বাচ্চাদের জন্য আমি যে বই লিখতে যাচ্ছি, তার নাম হবে ‘আমিসটাড ডে উন গাতো ই উন লরো বা ফ্রেন্ডশিপ অব আ ক্যাট অ্যান্ড আ প্যারোট।’ আমি তাঁর পরবর্তী বইটির শিরোনামের তারিফ করি। তিনি ফোকলা দাঁতে হেসে একটি ক্যাশ বাক্স থেকে বের করে আমাদের হুয়ান ভেনাডো দ্বীপের টিকিট দেন। রাইটার হিসেবে আমি ৫০ শতাংশ ছাড়ে একটি টিকিট পাই। তিনি টিকিটটি আমার হাতে দিতে দিতে অনুরোধ করেন, সি টার্টল বা সামুদ্রিক কচ্ছপদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমি যেন কিছু লিখি। আমাদের আলাপচারিতাকে ইন্টারাপ্ট করে মেরিন গাইড মেয়ে দুটি কলকলিয়ে কলোকোয়েল এসপানিওলে তাঁকে কিছু বলে। সিনিওর করডোবা মজা করে তাদের ‘স্কিনি ডিপ’ বা দ্বীপের সৈকতে নগ্নস্নান না করার পরামর্শ দেন। ক্রিসটেলা, ‘পরকে নো—বা হোয়াই নট?’ বলে মুখ ঝামটা দিলে—সিনিওর কাঁচুমাচু হওয়ার কৃত্রিম ভঙ্গি করে মন্তব্য করেন, ‘মেয়েরা শোনো, তোমরা নগ্নস্নানে মাতলে পর্যটকদের খামাখা হূদয় ভাঙবে, সিম্পোলমেন্টে রমপেরা সুস কোরাজনেস বা ইট উইল সিম্পলি ব্রেক দেয়ার হার্টস্, এতে কচ্ছপদেরও কোনো উপকার হবে না।’ আমরা দ্বীপে নামার টিকিট হাতে নিয়ে তাঁর আরো কিছু অযাচিত উপদেশ শিরোধার্য করার ভান করে বিদায় নিই।

বিয়াংকা ও ক্রিসটেলা প্রায়ই পর্যটকদের সঙ্গী হয়ে হুয়ান ভেনাডো দ্বীপে যায়। পথঘাট তাদের ভালো করে চেনা। বারকা ডে আরোর ঘাটে মানুষজন তেমন নেই। শুধু সাদা ঘোড়ায় চড়ে যুবতী নারীকে আমরা দুলকি চালে সৈকতের বালুকা ছিতরিয়ে ছুটতে দেখি। আমাদের দিকে চোখ পড়তেই মেয়েটি কেন জানি ঝুঁকে মাথা নিচু করে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে অশ্বটির কেশর। বিয়াংকা ও ক্রিসটেলা তাদের চেনা বোটম্যান তালাশ করে। আমরা দূরে নোঙর করা কয়েকটি নৌকার দিকে রওনা হই। পানিভর্তি একটি নৌকার খোল থেকে বিচিত্র একটি মাছ দুই হাতে জড়িয়ে উঠে দাঁড়ায় কিশোর বয়সী এক মাঝি। আমরা অবাক হয়ে আশ্চর্য মাছটির শিরদাঁড়ায় লাগানো সুদীর্ঘ ফিন দেখি।

বেশ খুঁজে পেতে বিয়াংকা ও ক্রিসটেলা তাদের চেনা বোটম্যানের নাগাল পায়। ইঞ্জিন লাগানো কায়াক নৌকাটি আমরা ভাড়া করি। মাঝি পিকআপ থেকে রসদপত্র, স্লিপিং ব্যাগ, স্নরকেল ইত্যাদি ক্যারি করে নৌকায় তোলেন। ফোমের কুশন পেতে আমি বিয়াংকার সঙ্গে বসি। সামনে আমাদের দিকে পেছন ফিরে ক্রিসটেলার সঙ্গে বসেছেন সিনিওর ডিগমার। তিনি সিগারে আগুন দিতেই ফটফটানো আওয়াজে চালু হয় বোটের রিকেটি ইঞ্জিন। আমাদের নৌকার ওপর জলে ডানার ছায়া ফেলে ওড়ে কয়েকটি সিন্ধুসারস।

মন্তব্য