kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

বই আলোচনা

আগস্ট আবছায়া : প্রেম-সম্পর্ক, ইতিহাস-পরম্পরার রুদ্ধশ্বাস উপন্যাস

লীনা দিলরুবা

২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আগস্ট আবছায়া : প্রেম-সম্পর্ক, ইতিহাস-পরম্পরার রুদ্ধশ্বাস উপন্যাস

আগস্ট আবছায়া : মাসরুর আরেফিন । প্রকাশক : প্রথমা। মূল্য : ৮০০ টাকা।

মাসরুর আরেফিনের লেখা ’আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসটি উত্তম পুরুষে লেখা। এর কাহিনি মূলত অবসেসড এক পুরুষকে কেন্দ্র করে, যে  একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন পড়ায়। দর্শনের ছাত্র বলেই কিনা, তার মাথায় সারাক্ষণ যুক্তি কিংবা যুক্তির ফ্যালাসি খেলা করে। অবিবাহিত এই দর্শনের প্রফেসর ঢাকার বসুন্ধরায় থাকে। তার দুজন প্রেমিকা। একজন থাকে ঢাকাতেই, বসুন্ধরায়, নাম মেহেরনাজ। আরেকজন থাকে নেপালে, তার নাম সুরভি ছেত্রি। মেহেরনাজ তার ছাত্রী। সুরভি বা মেহেরনাজ দুজনারই প্রচুর লেখাপড়া, দুজনই সুন্দরী। প্রফেসরও লেখাপড়া জানা মানুষ। বিশ্বসাহিত্য তিনি চষে বেড়িয়েছেন। তিনি অবসেসড নানা বিষয় নিয়ে। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তিনি মানতে পারেননি। প্রতিবছর আগস্ট মাস এলেই তিনি দিশাহারা হয়ে যান। কেন এভাবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল, কারা এর জন্য প্রকৃতপক্ষে দায়ী—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি এই হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার বহু বছরের জেদ তাঁকে পেয়ে বসে। তাঁর এই জেদটি অনেকটা রোগে পরিণত হয়। আশপাশের মানুষকে এ বিষয়টা নিয়ে এত ব্যতিব্যস্ত করে রাখে, প্রত্যেকে জেনে যায়, প্রফেসরের ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত ঘটনার নানা কৌতূহল, জেদ। একবার ১৫ আগস্টের দিনে তাঁর মধ্যে ঘটে পরাবাস্তববাদী রূপান্তর। প্রফেসর তখন সময় ও বাস্তবতার সব শৃঙ্খল ভেঙে চলে যায় ১৯৭৫ সালের ১৪-১৫-১৬ আগস্টে। নিজের চোখে দেখে এবং বিবরণ দেয়, কিভাবে ফারুক-রশিদ-ডালিম-মোশতাক গং ১৫ আগস্টের পটভূমি তৈরি করছে। কতটা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে। সে দেখে প্রত্যেকটি মৃত্যুর ঘটনা। সে দেখে খুনিদের, যাদের সে ডাকাত বলেও সম্বোধন করে, তাদের কাণ্ডকলাপ। উপন্যাসে ইবরাহিম নামের একটি চরিত্র হাজির করানো হয়, এই ইবরাহিমকে দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের একটি বাস্তবতা ও প্রফেসরের মুখ দিয়ে আরেক বাস্তবতাকেও তুলে ধরা হয়েছে। ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর রক্তপাতের ঘটনা নিয়ে সত্য-মিথ্যার মধ্যখানের যে নিরেট দেয়াল, সেটিও মাসরুর আরেফিন তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে ভাঙচুর করেছেন। তাঁর কল্পনার ও পরাবাস্তবতার এ অংশটুকু অতুলনীয়।

উপন্যাসটি মানবজীবন থেকে প্রলম্বিত হয়ে সৃষ্টির রহস্য, এর আদি-অন্তের দিকে ছড়িয়ে গেছে, জন্ম আর বেঁচে থাকার অর্থবহ এবং অর্থহীন প্রবহমানতাকে স্পর্শ করেছে। মাসরুর আরেফিন কখনো প্রুস্ত, কখনো কাফকা, কখনো নিটশে, কখনো বিভূতিভূষণ এবং আরো কবি, লেখকের চিন্তা, দর্শন, বিশ্লেষণকে হাজির করেছেন, নিজের ভাবনার সঙ্গে আত্তীকরণ করেছেন। ধর্মকে নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। আর যা করেছেন, দেখিয়েছেন মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কগুলোর মমতা আর ছলনার দিক। দেখিয়েছেন প্রেমময় সম্পর্কের মোহনীয়তা ও নিষ্ঠুরতাও। এই আপাত গন্তব্যহীন, কখনো অর্থহীন মানবজীবনের রহস্য কী? কতবারই তো আমরা মুখোমুখি হয়েছি এই প্রশ্নের। মাসরুর আরেফিন আবারও মুখোমুখি করালেন, হয়তো তাত্পর্যপূর্ণ হয়তো তাত্পর্যহীন এই মানবজীবনের নানা মীমাংসার। যখন সম্পর্ক ভেঙে পড়ে, যখন প্রেম হারিয়ে যায়, যখন জীবিকার তাগিদে মানুষ মেনে নেয় জগতের সব নিষ্ঠুরতা।

এই উপন্যাসটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক লেখকের দেখিয়ে দেওয়া ছোট ছোট জীবন দর্শনগুলো। অগ্রজ লেখকদের চিন্তার সঙ্গে নিজের চিন্তাকে জুড়ে দিয়ে ভাবনাগুলোকে তিনি যেভাবে প্রলম্বিত করলেন, এটি উল্লেখ করতেই হবে। বহু চরিত্র, বহু প্রসঙ্গ, বহু ধারা-উপধারা লেজজুড়ে যে বড় উপাখ্যান তিনি দাঁড় করিয়েছেন, এটি উপন্যাস নিয়ে তার শক্তির জায়গা প্রমাণ করে। তার কাছ থেকে ভবিষ্যতে ভিন্ন কোনো আখ্যান ও অভিনব কোনো কিছু পাব বলেও মনে হয়।

এ উপন্যাসের দুর্বল জায়গা শেষ অধ্যায়টি। এটুকুর কারণে উপন্যাসটি কিছুটা ঝুলে গেছে।

একদিকে ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত ইতিহাস, অন্যদিকে প্রেম ও মানবজীবনের অর্থ-অনর্থকতার বিষয় মাসরুর আরেফিন যেভাবে উন্মোচন আর বিশ্লেষণ করলেন, সে কারণে এ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে সসম্মানে এর জায়গা খুঁজে নেবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা