kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

মেলার শেষ সপ্তাহের নির্বাচিত ৫ বই
দুর্ভাবনা ও ভাবনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে

এমন কেউ আর সমগ্র পৃথিবীতে আসেননি

শ্যামল চন্দ্র নাথ

১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এমন কেউ আর সমগ্র পৃথিবীতে আসেননি

দুর্ভাবনা ও ভাবনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে : আকবর আলি খান। প্রকাশক : প্রথমা প্রকাশন। প্রচ্ছদ : মাসুক হেলাল। মূল্য : ৬০০ টাকা

আমি মনে করি, রবীন্দ্রনাথ আছেন। রবীন্দ্রনাথ থাকবেন। রবীন্দ্রনাথ এখনো প্রাসঙ্গিক, প্রাসঙ্গিক মনে করি এই কারণে যে তাঁর মতো এমন কেউ আর সমগ্র পৃথিবীতে আসেননি। যাঁকে একসঙ্গে সাহিত্যের পাশাপাশি অন্য অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। শত অবমূল্যায়নের পরও তিনি থেকে যাবেন শুধু বাংলা ভাষার জন্য নয়, পুরো পৃথিবীতে সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে। তাঁর নৈরাশ্যবাদ গ্যেটেকেও ছাপিয়ে যায়, এমনকি সাহিত্যের সব শাখায় বিচরণীয় প্রতিভা বিশ্বসাহিত্যে আর নেই। আসবে বলেও মনে হয় না। তাঁর এই পরিব্যাপ্তি সর্বত্র। এবারের একুশে গ্রন্থমেলায় ‘দুর্ভাবনা ও ভাবনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে। এই গ্রন্থখানি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খানের কল্পনাপ্রসূত গ্রন্থ নয়, বাস্তব আকর গ্রন্থ। আকবর আলি খানকে আমি চিনি প্রায় এক যুগ হয়ে গেছে। তিনি জীবনানন্দ দাশ নিয়ে ব্যতিক্রমী চিন্তার খোরাক জুগিয়েছিলেন আমাদের ‘বনলতা সেন’ কবিতাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে। রবীন্দ্র প্রতিভার মূল্যায়ন নিয়ে নানা রকম মতবিরোধ আছে। একদল বাঙালি মনে করেন, রবীন্দ্রনাথ বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি। এই মতের প্রতিপক্ষ দল মনে করেন, রবীন্দ্রনাথকে অতিমূল্যায়ন করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যেসব ধারণা বা অপধারণা প্রচলিত আছে, এই বইয়ে সেগুলো যাচাই এবং সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথকে যেসব প্রশ্নে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে, সেসব প্রশ্নের বেশির ভাগই অসার। অন্যদিকে যেসব প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথকে অতি উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, সেসব প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের যেসব দুর্বলতা ছিল, সেগুলো চাপা দেওয়া হয়েছে। সামগ্রিক বিশ্লেষণে রবীন্দ্রনাথ একজন পরিপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন না, পরিপূর্ণ ব্যক্তি কেউই হন না। সবাই দোষ-গুণে মানুষ, রবীন্দ্রনাথও এর ব্যতিক্রম নন।  এই বইয়ে রবীন্দ্রনাথের সাতটি ভুল ধারণা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, অন্যদিকে ছয়টি প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে রবীন্দ্রনাথের শুভানুধ্যায়ীরা রবীন্দ্রনাথের অবদানকে অতিরঞ্জন করেছেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মুসলমানদের যেসব দুর্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কেও চারটি অধ্যায় রয়েছে এই বইয়ে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এ নতুন আলোকপাত আলোড়িত করবে না, শঙ্কায় ফেলবে—প্রবন্ধগ্রন্থখানি না পড়লে তা বোঝা যাবে না। যদিও রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায়ই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনেক বিতর্ক ছিল। তবু তাঁর যেমন অনেক অন্ধ অনুরাগী ছিল, তেমনি অনেক আপসহীন সমালোচকও ছিল। আশা করা হয়েছিল যে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর এ বিতর্ক হয়তো স্তিমিত হয়ে আসবে। বাস্তবে তা ঘটেনি। ভারতে রবীন্দ্রনাথের গ্রহণযোগ্যতা বাড়লেও তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ১৯৬১ সালে যখন রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপিত হয়, তখন পাকিস্তানের শাসকরা রবীন্দ্রনাথের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশেও এ বিতর্ক অব্যাহত থাকে। যেমন ‘রবীন্দ্রনাথ ও সাম্প্রদায়িকতা’ প্রবন্ধে আকবর আলি খান বিভিন্ন সময় ও উপাত্ত নিয়ে দেখাতে চেয়েছেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথ কোনো ধরনের বিরোধিতা করেননি।  প্রসঙ্গক্রমে এটাও বলা যায়, ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ঢাকার অভিজাত ব্যক্তিদের আমন্ত্রণে ১৯২৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে রবীন্দ্রনাথ ঢাকা সফরে যান। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্ররা সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে রবীন্দ্রনাথকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা প্রদান করেন। কাজেই আমরা বলতে পারি, অনেকেই ধর্মগত কারণে কিংবা ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে রবীন্দ্রনাথকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করা কিংবা নানা কারণে অগ্রাহ্য করেন; কিন্তু পুরো বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে রবীন্দ্রনাথ একজনই। তাই বলব, রবীন্দ্র প্রতিভার অবমূল্যায়ন ও অতিমূল্যায়নের এই দুই ধারার বিপরীতে বাঙালি সংস্কৃতির এই সেরা প্রতিভার একটি যথার্থ না হলেও তথ্যনিষ্ঠ মূল্যায়ন কিংবা কারো কারো চোখে অবমূল্যায়ন দেখতে পাব এই প্রবন্ধগ্রন্থে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা