kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

মেলার শেষ সপ্তাহের নির্বাচিত ৫ বই
প্রত্যয় প্রতিজ্ঞা প্রতিভা

চিন্তার খোরাক জাগিয়ে তোলেন মনে ও মননে

কমল নাথ

১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে





চিন্তার খোরাক জাগিয়ে তোলেন মনে ও মননে

প্রত্যয় প্রতিজ্ঞা প্রতিভা : যতীন সরকার। প্রকাশক : কথাপ্রকাশ। প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা। মূল্য : ৩০০ টাকা

অর্ধশতাব্দীকালের শাশ্বত সাধনায় বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যে যতীন সরকার অন্যতম চিন্তানায়কের স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সৃজনশীল রচনার যে সম্ভাবনা ও বিকাশ দেখা যায়, মননশীল রচনার ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত। প্রবন্ধসাহিত্য বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় অনগ্রসর। বাংলা সাহিত্যে মৌলিক চিন্তাসম্পন্ন মননশীল প্রাবন্ধিক দুর্লভ। সেই দুর্লভ প্রাবন্ধিকদের অন্যতম যতীন সরকার। এবারের একুশে গ্রন্থমেলায় এসেছে ‘প্রত্যয় প্রতিজ্ঞা প্রতিভা’ নামের প্রবন্ধগ্রন্থটি। এটি যতীন সরকারের সাম্প্রতিকতম প্রবন্ধসংকলন। অসামান্য পাণ্ডিত্য ও ক্ষুরধার যুক্তির সমন্বয়ে এই বইয়ের প্রতিটি রচনা চিন্তা-উদ্দীপক প্রবন্ধে পরিণত হয়েছে। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী জীবনদর্শনের একনিষ্ঠ অনুসারী যতীন সরকার রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের কৃতী বাঙালিদের বহুমাত্রিক প্রতিভার বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করেছেন। ব্যক্তিমূল্যায়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, মে দিবস, দুর্গোত্সব, জঙ্গিবাদের মতো সমকালীন প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন তিনি অকাট্য যুক্তিতে। তিনি তাঁর প্রত্যয়কে প্রতিজ্ঞায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন সমগ্র গ্রন্থজুড়ে। সেই প্রতিজ্ঞাকে বাস্তবতার নিরিখে আরো বেশি জীবনঘনিষ্ঠ করার প্রত্যয়ে তিনি স্মরণ করেছেন কবিসার্বভৌম রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিভার। তিনি যে মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী, সেই বিশ্বাস বুকে লালন করে বস্তুবাদের একনিষ্ঠ ছাত্র হিসেবে এ ভূখণ্ডে বর্তমান সময়ে দু-তিনজন প্রাবন্ধিকের পাশাপাশি তাঁর নামটি উচ্চারিত হয় নিঃসন্দেহে। সেই জীবনবোধের মধ্যগগনে দাঁড়িয়ে যতীন সরকারকে দেখতে হয়, আকাশের এক কোণে দাঁড়িয়ে নয়। সে জন্য বাংলাদেশের প্রবন্ধসাহিত্যে তিনি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ এই জন্য যে ‘পৃথিবীটা কার বশ?’ প্রবন্ধে তিনি যখন উল্লেখ করেন—‘দশ বছর যখন আমার বয়স, তখন আমি গাঁয়ের প্রাইমারি 

স্কুলের ক্লাস ফোরের ছাত্র, তখনই একটি অসাধারণ ধাঁধা ও তার উত্তর শিখে ফেলেছিলাম। ধাঁধাটি হলো, ‘পৃথিবীটা কার বশ?’—এই প্রশ্নবোধক বাক্যটির ভেতর থেকেই এর উত্তর বের করে আনতে হবে। উত্তরটি হলো, ‘পৃথিবীটা’ শব্দটি থেকে ‘টা’-টি আলাদা করে পরের ‘কার’-এর আগে যোগ করে দিতে হবে। অর্থাৎ ‘পৃথিবীটা টাকার বশ।’ সেই থেকে আমি কথাটির অর্থ সম্পর্কে চিন্তা করে এসেছি, এবং একপর্যায়ে জেনেছি যে টাকারই আরেক নাম ‘অর্থ’। তার সঙ্গেই বিত্ত কথাটির যোগ হয়ে গেছে ‘অর্থবিত্ত’। আরো জেনে গেছি যে বিত্তহীন মানুষের জীবন একেবারেই অর্থহীন, অর্থবানের জীবনই সার্থক। আবার ‘অর্থই অনর্থের মূল’—এমন কথাও অনেকের মুখেই শুনেছি, এবং অর্থবানদের অনর্থ সৃষ্টির অনেক ঘটনা ও দুর্ঘটনা নিজেও প্রত্যক্ষ করেছি।’ পড়তে পড়তে হারিয়ে যেতে হয় গভীরে, গভীরতার এক অনন্য সৃষ্টিতে। তিনি যখন ‘ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ : সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্টি’ প্রবন্ধে বলে ওঠেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শুধু ফ্যাসিবাদেরই পরাজয় ঘটেনি, গড়ে ওঠে শক্তিশালী বিশ্ব; সমাজতান্ত্রিক শিবিরও। সাম্রাজ্যবাদীরা, স্বভাবতই সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অভ্যুদয়কে মেনে নিতে পারেনি, সমাজতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্য তারা নানা ফন্দি আঁটতে থাকে। তারাই ঠাণ্ডাযুদ্ধ বা স্নায়ুযুদ্ধ নামে পরিচিত যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি করে। সেই যুদ্ধাবস্থার ধারার বিশ শতকের শেষ দশকে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিপর্যয় ঘটে। এই বইয়ের বিভিন্ন প্রবন্ধের পরতে পরতে রয়েছে নানা ধরনের অভিজ্ঞতার নির্যাস। যা শুধু পাঠ করে উপলব্ধি করতে হয়। তাই বলব, যতীন সরকার যতবার পাঠ করি, ততবারই মনে হয়, তিনি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে চিন্তার খোরাক জাগিয়ে তোলেন মনে ও মননে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা