kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

ধা রা বা হি ক উ প ন্যা স ম ৎ স্য গ ন্ধা

ম ৎ স্য গ ন্ধা

হরিশংকর জলদাস

১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



ম ৎ স্য গ ন্ধা

অঙ্কন : মানব

সেদিন সিন্ধুচরণের নৌকা গাঁয়ের ঘাটে ভিড়তে ভিড়তে দুপুর গড়িয়ে গিয়েছিল। স্রোত অনুকূলে ছিল না। সারাটা পথ বইঠা চালিয়ে আসতে হয়েছিল। বুড়ো শরীরে বইঠা চালানো কষ্টকর। দুঃসাধ্যও। কিন্তু সেই সকালে এত দীর্ঘ জলপথ অতিক্রম করে আসতে সিন্ধুচরণের তেমন কষ্ট অনুভব হয়নি। স্রোতের প্রতিকূলে বইঠা চালাতে গিয়ে শরীরটা জানান দিয়েছে বটে; কিন্তু সিন্ধুচরণ হাল ছাড়েনি। হাঁপিয়ে উঠলে মাঝেমধ্যে বইঠা জলে ফেলায় বিলম্ব করেছে; কিন্তু একেবারে থেমে যায়নি।

সিন্ধুচরণ জানে, স্রোতের টান নদীর মাঝ বরাবর বেশি। তাই নৌকাটি সে কিনারা ঘেঁষে চালিয়েছে। তাতেও কবজির জোর যে লাগেনি, এমন নয়। মাঝেমধ্যে বইঠা চালানো থামিয়ে দিতে ইচ্ছা করেছে। কিন্তু ভেতরের আরেক সিন্ধুচরণ বলে উঠেছে—থেমে গেলে কি চলবে সিন্ধুচরণ? তোমার কন্যার না সন্তান হবে? তোমার মেয়েটি না দুঃসহ বেদনা থেকে মুক্তি পাবে? তুমি না সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে? ভাবতে ভাবতে বইঠায় জোর লাগিয়েছে সিন্ধুচরণ। নৌকা এগিয়েছে কৈবর্তপাড়ার ঘাটের দিকে।

নৌকাটি ঘাটে বেঁধে মুখ তুলতেই কোত্থেকে ভুসুকু দৌড়ে এসেছিল।

‘অ সরদার, অ রাজামশাই, কোথায় ছিলে? রানি মা কোথায়?’ ভুসুকু পাগলা? আকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল।

গোটা বেলার পরিশ্রমে শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত সিন্ধুচরণের। মনটাও যে অবসাদগ্রস্ত! এ অবস্থায় ভুসুকুর কথা ভালো লাগছিল না সিন্ধুচরণের। ভুসুকুকে এড়াতে চাইল সে।

নরম গলায় বলল, ‘পথ ছাড়ো ভুসুকু। অনেক দূর থেকে আসছি। শরীরটা জরজর। কথা বলতে ইচ্ছা করছে না এখন।’

‘কেন কথা বলতে ইচ্ছা করছে না সরদার? কোথা থেকে আসছ? শরীর খারাপ কেন?’ সিন্ধুচরণের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে বলতে থাকল ভুসুকু।

মনটা খিঁচিয়ে উঠল সিন্ধুচরণের। থমথমে কণ্ঠে বলল, ‘সরে দাঁড়াও ভুসুকু।’

ভুসুকুকে একগুঁয়েমিতে পেয়ে বসেছে। নাছোড় ভঙ্গিতে বলেছে, ‘সরে দাঁড়াব না সরদার। আমার প্রশ্নের জবাব দিয়ে যেতে হবে তোমায়।’

সিন্ধুচরণের মাথায় রক্ত চড়ে গেল হঠাৎ। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। চোখ গরম করে ভুসুকুর গায়ে জোর ধাক্কা দিল একটা। ধাক্কাটা সামলাতে পারল না ভুসুকু। দুপ করে বালির ওপর পড়ে গেল। চিত হয়েই পড়েছে সে। ওই অবস্থায়ই বস্ফািরিত চোখে সরদারের দিকে সে তাকিয়ে থাকল। ভাবতে থাকল—সামনে দাঁড়ানো লোকটা কি তাদের সরদার! রাজা তাদের! লোকটা সিন্ধুচরণই তো! নিশ্চয়ই না, এ সিন্ধুচরণ হতে পারে না। তাদের রাজা সিন্ধুচরণ তো কখনো কারো মনে ব্যথা দেয় না! ধাক্কা দেওয়া তো দূরের কথা, তাদের সরদার কারো সঙ্গে কড়া গলায় কথা বলেছে—বলতে পারবে না কেউ। বড় নরম, বড় দরদি, বড় পরোপকারী তাদের রাজা সিন্ধুচরণ। কিন্তু আজ! আজ কী হলো রাজার? অন্যান্য দিন মাথা এলেবেলে থাকলেও আজ মাথাটা বেশ পরিষ্কার ভুসুকুর। বিস্ময়ের ঘোর কাটতেও সময় লাগছে তার। ওই অবস্থায়ই বালুকাবেলায় পড়ে থাকল ভুসুকু। দাশরাজা সিন্ধুচরণের হূদয়ে কী মোচড় লাগল? বোঝা গেল না। ভুসুকুকে ধাক্কা দিয়ে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সিন্ধুচরণ। বুকের নিচে অপরাধবোধ তোলপাড় করে উঠেছিল। মন চাইল হাত বাড়িয়ে ভুসুকুকে টেনে তুলতে। আবার সেই মনই বিদ্রোহী হয়ে উঠল—কী দরকার টেনে তোলার? কত কঠিন জলপথ ডিঙিয়ে সেই সুদূর চরণদ্বীপ থেকে এসেছে সে। শ্রমে-ঘামে দেহটা চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। সামনে পা বাড়াতেও ক্লান্তি লাগছিল। ওই সময় কোত্থেকে এসে পথ আগলে দাঁড়াল ভুসুকু! তা না হয় মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু কোথায় ছিলে, রানি মা কোথায়—এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হবে কেন তাকে? ঠিকই করেছ তুমি সিন্ধুচরণ। বেয়াড়া ভুসুকুর ধাক্কাটা প্রাপ্য ছিল। কিন্তু ও যে পাগল। ভালো আর মন্দের জ্ঞানগম্যি যে ওর বোধের মধ্যে নেই! সময় আর অসময়ের পার্থক্য যে ভুসুকু হারিয়ে ফেলেছে!

মরুক গে—বলে সামনের দিকে পা বাড়াল সিন্ধুচরণ। দু-এক কদম এগোলও।

হাউমাউ করে উঠল ভুসুকু, ‘অ ঈশ্বর রে! এখন আমি কোথায় যাব রে! আমাকে ধামাভরা খই কে দেবে রে!’ একটু থামল ভুসুকু। গলায় জোর ঢেলে কাঁদতে কাঁদতে আবার বলতে থাকল, ‘রানি মা থাকলে আমাকে খই দিত, থালা ভরা ভাতও দিত। এখন কে আমাকে খাবার দেবে গো রানি মা! আমার যে ক্ষুধা লেগেছে রে রানি মা! পাড়ার কেউ আমাকে যে খেতে দেয় না রে রানি মা!’

থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সিন্ধুচরণ। আ হা হা! এ কী করেছে সে! ক্ষুধার্ত একজন মানুষকে ধাক্কা দিয়েছে! সে না এই পাড়ার সরদার! সে না দাশবংশের রাজা! অসহায়, দরিদ্র, ক্ষুধার্তদের সাহায্য করাই তো রাজার কাজ। তা না করে সে ভুসুকুকে অপমান করেছে! সে তো রাজধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছে।

ভবানীকে কেন খুঁজছিল ভুসুকু—ভুসুকুর বিলাপ থেকে বুঝতে পেরেছে সিন্ধুচরণ। ভবানী পাগলা ভুসুকুর খাবার জুগিয়ে যেত তাহলে রীতিমতো! গত কয়েক দিন নিশ্চয়ই ভুসুকুর ডাকে সাড়া দেয়নি ভবানী। নিশ্চয়ই উঠানে দাঁড়িয়ে খাবার চেয়ে চেয়ে ক্লান্ত হয়ে ফিরে গেছে ভুসুকু।

চরণদ্বীপে রওনা দেওয়ার সময় ভবানীকে বলে এসেছিল, ‘ঘর বানাতে যাচ্ছি চরণদ্বীপে। ঘর বানানো শেষে ফিরে আসব। ফিরে এসে তোমাদের নিয়ে যাব ওখানে। এই কয় দিন পাড়া-পড়শি থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখো। ওরা ধীরে ধীরে বুঝে যাক মেয়ের কষ্টে বেচারি কালীর মা একেবারে বোবা হয়ে গেছে। আগে যে ভবানী সবার সঙ্গে মেলামেশা করত, সবার সুখে-দুখে লাগত, এখন সেই রানি একেবারে কুঁকড়ে গেছে। মানুষের সঙ্গে মেশা একেবারে থামিয়ে দিয়েছে।’ বলে দম নেওয়ার জন্য থেমেছিল সিন্ধুচরণ।

ওই সময় ফ্যালফেলে চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থেকেছিল ভবানী।

সিন্ধুচরণ আবার বলতে শুরু করেছিল, ‘তাতে আমাদের সুবিধা হবে। যেদিন আমরা এই কৈবর্তপাড়া ছেড়ে চলে যাব, তাতে খুব বেশি বিচলিত হবে না পাড়ার মানুষেরা। ভাববে—মনের দুখে হয়তো সপরিবারে দেশান্তরি হয়েছে রাজা।’

সিন্ধুচরণ এখন বুঝতে পারল ভুসুকুর রানি মাকে খোঁজার কারণ। প্রবল ডাকাডাকিতেও নিশ্চয়ই সাড়া দেয়নি ভবানী। বুকটা দুমড়ে গেল সিন্ধুচরণের।  পেছন ফিরল সে। দ্রুত পায়ে ভুসুকুর কাছে এগিয়ে গেল। কোমর ভেঙে ভুসুকুর হাত ধরল সিন্ধুচরণ। পরম মমতায় টেনে তুলল। একেবারে বুকের কাছে টেনে নিল ভুসুকুকে। জড়িয়ে রাখল বেশ কিছুক্ষণ।

তারপর বলল, ‘চল ভুসুকু, আমার সঙ্গে চল। আজ তোকে পেট ভর্তি করে খাওয়াব।’

সেই দুপুর গড়ানো দিনে ভুসুকুকে উদরপূর্তি করে খাইয়েছিল ভবানী।

ভুসুকু খেতে খেতে বলেছিল, ‘তুমি আমাকে এত দিন খেতে দাওনি কেন রানি মা? ঘরে থেকেও সাড়া দাওনি কেন?’

ভবানী দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। কী জবাব দেবে সে? কী করে তাদের পারিবারিক সংকটের কথা ভুসুকুকে বোঝায় ভবানী? প্রতিদিন সকালে দুপুরে উঠানে দাঁড়িয়ে ভুসুকু হাহাকার করত। বিচলিত গলায় কাকুতি-মিনতি করত দুমুঠো ভাতের জন্য কি এক ধামা খইয়ের জন্য। ঘরে মজুদ থাকা সত্ত্বেও ভুসুকুকে কোনো খাবার দিত না ভবানী। স্বামীর বারণ যে! ভুসুকু যখন বলত—রানি মা, তুমিই একদিন বলেছিলে, তোমার যখন খিদে লাগবে চলে এসো বাছা। তোমাকে প্রচুর খাবার দেব। কই, এখন তো দিচ্ছ না। এত ডাকাডাকি করছি, জবাবও দিচ্ছ না তুমি! তখন ভবানীর চারদিক আঁধার আঁধার লাগত। তার মাতৃহূদয়ে তোলপাড় করে উঠত। কিন্তু তার যে কিছুই করার ছিল না তখন! স্বামী যে তার চারদিকে লক্ষ্মণরেখা টেনে দিয়ে গিয়েছিল।

ভবানী ভুসুকুর কথাকে এড়িয়ে গিয়ে বলেছিল, ‘খা বাছা, খা। ভবিষ্যতে আর এ রকম হবে না রে বাপ।’ গোঁফে-দাঁড়িতে ভাত মাখানো, মুখটা তুলে শিশুর কণ্ঠে ভুসুকু বলেছিল, ‘ঠিক বলছ তো রানি মা? ক্ষুধায় আর কষ্ট পাব না তো আমি?’

ভুসুকুকে ভবানী আশ্বস্ত করেছিল, ‘তা-ই হবে বাপ, ঠিক তা-ই হবে।’

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়নি। যেই সকালে ভবানীরা গ্রাম ছেড়েছিল, সেদিন থেকে ভুসুকুকে কেউ তেমন করে খাবার দেয়নি। না খেয়ে না খেয়ে একদিন ওই বটগাছটির তলায় অভুক্ত ভুসুকু মরে পড়ে ছিল।

প্রত্যাবর্তনের দিন অপরাহ্নে নরসিংহ জেঠার সঙ্গে দেখা করেছিল সিন্ধুচরণ। যমুনা পারের বটগাছটির তলায় গিয়ে বসেছিল দুজনে। সিন্ধু নিজ থেকে কিছু বলার আগেই জেঠা বলে উঠেছিল, ‘বলো সিন্ধু, ওদিককার কী সংবাদ বলো।’

সিন্ধুচরণ জেঠাকে আদ্যোপান্ত সব খুলে বলেছিল। বেজিদের কথা, পাখিদের কথাও বলতে ভোলেনি সিন্ধু। ঘরটা সে যথাযথভাবে বানিয়ে আসতে পেরেছে, তা বলতে গিয়ে সারা মুখমণ্ডলে তৃপ্তির আভা ছড়িয়ে পড়েছিল সিন্ধুচরণের।

সব শোনার পর বড় উত্ফুল্ল হয়ে উঠেছিল নরসিংহ জেঠা। দরাজ কণ্ঠে বলেছিল, ‘তাহলে সিন্ধু, আর কোনো বাধা রইল না। এবার রওনা দেওয়ার পালা। একটা দিনক্ষণ দেখে যাত্রা করো এবার।’

‘আর দিনক্ষণ, জেঠা! ঘরে ফিরে দেখি, মত্স্যগন্ধার এখন-তখন অবস্থা! হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে মেয়েটার। হাত-পা-মুখ ফোলা ফোলা। চোখ গর্তে ঢোকা। যেকোনো দিন রওনা দিতে পারলেই মঙ্গল।’

‘পোয়াতি হলে ওরকম হয় সিন্ধু। আবার কেটেও যায় ওসব। দেখো—তোমার নাতি-নাতনি কিছু একটা হয়ে গেলে মত্স্যগন্ধা সেরে উঠবে। আগের চেয়েও সবল-সতেজ হয়ে উঠবে সে।’

‘বলছ তুমি জেঠা এ রকম? সত্যি আমার মত্স্যগন্ধা আগের মতো প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠবে? ফিরে পাবে সে তার আগের স্বাস্থ্য?’

জেঠা এবার আশ্বাসের কণ্ঠে বলল, ‘আমি যা বলছি, তা-ই হবে সিন্ধু। দেখে নিয়ো তুমি।’

সিন্ধুচরণ জোড় হাত ওপর দিকে তোলে। গভীর ভক্তিতে কাকে যেন প্রণাম জানায়। চোখ দুটি তার বুজে থাকে।

‘তা কখন রওনা দিচ্ছ সিন্ধু।’ জেঠার কথায় সংবিতে ফিরে সিন্ধুচরণ।

বলে, ‘তুমিই বলো জেঠা কখন রওনা দিই?’

‘রওনা দিতে হবে লোকচক্ষুর আড়ালে। অতি ভোরে অথবা গহন সন্ধ্যায় রওনা করলে ভালো হয়। অতি ভোরে মানুষ ঘুম থেকে ওঠে না। সন্ধ্যায় সবাই ঘরে থাকে।’ বলল জেঠা।

‘যেকোনো ভোরেই রওনা দিতে চাই। চরণদ্বীপের অন্ধকার আমার সহ্য হয়ে গেছে। ওদের সহ্য হতে সময় লাগবে। তাই বলি কী—ভোরেই রওনা দিই আমরা।’

‘তা ঠিক বলেছ তুমি। ঘরবাড়ির কথা চিন্তা কোরো না তুমি। আমি দেখাশোনা করে রাখব। মানুষদের বলব—কালীর নিরাময়ের আশায় তুমি সপরিবারে দেশান্তরে গেছ।’

সিন্ধুচরণ কিছু বলল না। কৃতজ্ঞতার দুটি করুণ চোখ তুলে জেঠার দিকে তাকিয়ে থাকল শুধু।

‘ও হ্যাঁ, আরেকটি কথা সিন্ধু। ওদের ওই নির্জন দ্বীপে রেখে তুমি আবার চলে এসো না। জায়গাটা সয়ে উঠতে ওদের সময় লাগবে। ওখানকার পরিবেশে খাপ খাওয়াতে প্রথম প্রথম অস্বস্তি লাগবে ওদের। তুমি সঙ্গে থাকলে ওরা সাহস পাবে।’

‘তুমি ঠিক বলেছ জেঠা। মত্স্যগন্ধার কিছু একটা না হওয়া পর্যন্ত আমি চরণদ্বীপ ছাড়ব না।’

জেঠার পরামর্শক্রমে দিন তিনেক পরের এক প্রত্যুষে কৈবর্তপাড়া ছেড়েছিল সিন্ধুচরণরা।

গৃহকাজের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি গোজগাছ করে রাখা হয়েছিল। গভীর রাতে ওগুলো নৌকায় তুলেছিল সিন্ধু। মত্স্যগন্ধাকে ধরে ধরে নৌকার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরম যত্নে নৌকার পাটাতনে মত্স্যগন্ধাকে শুইয়ে দিয়েছিল ভবানী। নিজেও উঠে বসেছিল নৌকায়। হাতে বইঠা নিয়ে নৌকার পাছায় গিয়ে বসেছিল সিন্ধু।

গলা একটু উঁচিয়ে সিন্ধুচরণ বলেছিল, ‘যাই জেঠা। আশীর্বাদ কোরো। আমার মেয়েটিকে আশীর্বাদ করো জেঠা।’ বলতে বলতে বাষ্পরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল সিন্ধুর কণ্ঠ।

সেই রাতের শেষ যামে নরসিংহ জেঠা যমুনাপারে দাঁড়িয়ে ছিল। ডান হাতটা অভয়ের ভঙ্গিতে তুলেছিল জেঠা। ঘোমটা টেনে দুহাত কপালে ঠেকিয়ে ভবানী প্রণাম জানিয়েছিল জেঠার উদ্দেশে।

সূর্যদেব গগনে ওঠার প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই সিন্ধুচরণ যমুনার মাঝখানে তার তরিটি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে স্রোতের টান।

তারপর তো এই চরণদ্বীপ! আটটি রাতে আর আটটি দিবসের অবসান। তারপর তো নবম দিবসের প্রত্যুষের আবির্ভাব। তারপর কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের ভূমিষ্ঠ হওয়া। সিন্ধুর উল্লাস, ভবানীর কন্যামুক্তির আনন্দ মিলেমিশে সেই দিনের সকালটা মোহময় হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু মত্স্যগন্ধা যে বিষাদের কালো ছায়ায় আবৃত হয়ে থাকল! সর্বগ্রাসী যন্ত্রণা যে তাকে কুরে কুরে খেতে লাগল! কৃষ্ণ দ্বৈপায়নকে সে কি বুকের কাছে টেনে নেবে, না ওই রাক্ষসী যমুনা জলে নিক্ষেপ করবে?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা