kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

মেলার প্রথম সপ্তাহের নির্বাচিত ৫ বই
কয়লাতলা ও অন্যান্য গল্প

কয়লাতলার জীবন ও এর ভাষ্য

হানযালা হান

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কয়লাতলার জীবন ও

এর ভাষ্য

কয়লাতলা ও অন্যান্য গল্প : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। প্রকাশক : অন্যপ্রকাশ। প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা। মূল্য : ৩৮০ টাকা।

একটি সাদা গোলাপ। খালি চোখে দেখলে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ তৈরি হওয়ার কথা না। কিন্তু কোনো চোখে যদি লাল রঙের চশমা পরিয়ে দেখানো হয়, তবে গোলাপের রং হয়ে যায় লাল। চশমার কাচের রং যদি কালো হয়, ফুলের রং হয় কালো। হলুদ চশমা পরলে রংও হয় হলুদ। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, বস্তুর নিজস্ব একটা গুণ আছে; কিন্তু মানুষ তাকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে তা তার ওপর অনেকটা নির্ভর করে। এ কথা বলার মানে হচ্ছে, সাহিত্য যখন পাঠক পড়েন তখন কোনো না কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে পড়েন। ফলে অনেক সময় আসল বক্তব্যটা ধরা যায় না। আবার সাহিত্য গোলাপের মতো দৃষ্টিগ্রাহ্য সহজ কোনো বস্তুও না। এ হচ্ছে অনেকটা গোলাপের গন্ধের মতো, যা শুধু অনুভূতি দিয়ে অনুভব করতে হয়।

‘প্রথম দিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল, সত্তার নূতন আবির্ভাবে—কে তুমি?’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মনে জাগা এ প্রশ্ন বহু পুরনো। মূলত এ প্রশ্ন নিয়ে দর্শনের চর্চা শুরু। এর উত্তরও অনেকে অনেকভাবে দিয়েছেন। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে কাহলিল জিবরানের কথা, ‘যেহেতু নদী ও সমুদ্র এক, তাই জীবন ও মৃত্যুও এক।’ তবে দার্শনিকদের মধ্যে এ নিয়ে নানা মত চালু আছে। সাহিত্যেও এ নিয়ে কয়েকটি ধারা আছে। অস্তিত্ববাদ তেমনি একটি।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের লেখা ‘কয়লাতলা ও অন্যান্য গল্প’ বইয়ের ‘কয়লাতলা’ গল্পটি শুরু অস্তিত্ববিষয়ক মৌলিক প্রশ্ন দিয়ে। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র রইসু। সে স্বপ্নে মৃত্যু দেখে। স্বপ্নটা এমন, ‘পায়ের নিচে মাটি কাঁপে। একটি ফাটল জাগে। সেটি বড় হয়। সেই ফাটল দিয়ে দুটি লিকলিকে হাত, বোড়া সাপের পেটের মতো মসৃণ কিন্তু ঘিনঘিনে, আমার পা জড়িয়ে ধরে টানে। একসময় মসৃণ ভাবটা চলে যায়, যেন হাতের ভেতর থেকে খসখসে আঁশ বেরিয়ে আসে, এরপর হাতটা হয়ে যায় উল্টো করে গাঁথা অসংখ্য পেরেকের।’ স্বপ্ন দেখার পর সে চিত্কার করে কাঁদে। একই স্বপ্ন বারবার দেখে। এর ব্যাখ্যা জানার জন্য দাদির কাছে যায়। গল্পের শুরুটা এভাবে, ‘অবেলায় বুড়ি হয়ে যাওয়া আমার দাদি আমার ছেলেবেলার এক বৃষ্টির দুপুরে আমাকে বাড়ির পেছনের কচুঝোপে নিয়ে কচুপাতায় বৃষ্টির টাপুরটুপুর দেখিয়ে বললেন, মানুষের জীবনটা এই রকম, ফুরুত্, আজ আছে, কাল নাই।’ এ কথার মধ্যে শিল্পী নিলুফার ইয়াসমিনের গাওয়া ‘জীবন সে তো পদ্মপাতার শিশিরবিন্দু’ গানের প্রতিফলন আছে। সে যা-ই হোক, জীবন নিয়ে এ প্রশ্ন প্রায় সব মানুষকে কোনো না কোনো সময় ভাবায়। তো রইসু স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানার জন্য এরপর নিমাই স্যারের শরণাপন্ন হয়। স্যার তাকে উত্তর দেন না। শুধু পরামর্শ দেন, স্বপ্ন দেখার পর ঠা ঠা করে হাসবে। এই হচ্ছে গল্পের প্রথম পর্ব ‘স্বপ্নের আঘাত’। বাকি তিনটি পর্ব হচ্ছে ‘ট্রেনকাণ্ড’, ‘ইউটোপিয়া’ ও ‘ডিসটোপিয়া’।

দ্বিতীয় অংশে গ্রামে একটি তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। তেল সংগ্রহের জন্য আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ আসে। ঘটনাক্রমে আগুন লেগে বিরানব্বইজন মানুষ পুড়ে কয়লা হয়। রইসু ঘটনাক্রমে পত্রিকা অফিসে টি-বয়ের কাজ নেয়। গল্পের এই অংশে সংবাদপত্র জগতের একেবারে নেতিবাচক সত্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেখানে নীতি-নৈতিকতা উপেক্ষা করা হয়।  এক পর্যায়ে শ্রেণিশত্রু খতমের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে।

আরেকটি গল্পের নাম ‘বাঁদর’। এই বাঁদর শেষ পর্যন্ত আর নিছক প্রাণী থাকে না, হয়ে ওঠে মানবিকবোধ ও শক্তিসম্পন্ন চরিত্র। এ বইয়ের আরেকটি গল্প ‘দুই সাক্ষী’। পুলিশের বিনা বিচারে হত্যার প্রসঙ্গ এসেছে। বইটির প্রায় সব গল্পই একটানে পড়ার মতো। কোনো কোনো গল্পের বর্ণনা কাব্যিক, ‘চাঁদের খাঁচা’য়, ‘অনেক দিন ধরেই তার অস্থিরতাগুলো একটি জায়গায় এসে জমাট বাঁধছিল, যেমন কোনো পাহাড়ি নদীর পানি একটি চড়াইয়ের নিচে জমতে থাকে, একসময় চড়াইয়ের পাড় ছাপিয়ে প্রবল শক্তিতে ঢালুতে আছড়ে পড়ে। অথবা কোনো বৈশাখ দিনের দুপুর থেকে অশান্ত হয়ে ওঠা আকাশটাতে যেমন মেঘ জমে, বিদ্যুৎচমকায়, এরপর হঠাৎএকটি প্রলয় নেমে আসে।’ শুধু প্রলয়ের না, এ এক আনন্দের প্রস্তুতিপর্বও। পাঠক, আপনাকে এই প্রলয়-আনন্দে স্বাগত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা