kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

ধা রা বা হি ক উ প ন্যা স ম ৎস্য গ ন্ধা

মৎস্যগন্ধা

হরিশংকর জলদাস

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



মৎস্যগন্ধা

অঙ্কন : মানব

এর মধ্যে মাস তিনেক গত হয়েছে। পড়শিরা প্রথম প্রথম মত্স্যগন্ধার খোঁজখবর নিত। উঠানে পথ আগলে ম্লান মুখে ভবানী বলত, ‘কালী ভালো নেইরে মাসি। দিন দিন তার পাগলামি বেড়ে চলেছে। কেউ কাছে গেলে খামচে দিতে চাইছে। এই দেখ, দেখ না আমার হাতটি! দু-মুঠো ভাত মুখে পুরতে গেলাম, অমনি খেপে-খামচে...।’ কথা শেষ করল না ভবানী, গতকাল উঠানকোনার ঝোপে আচড়ে যাওয়া ডান হাতটি মাসির সামনে তুলে ধরল।

মাসি আঁতকে উঠল। পাশে দাঁড়ানো যমুনার মা নাছোড়কণ্ঠে বলল, ‘তা গিন্নি মা দূর থেকেও কি আমরা কালীকে একবার দেখতে পাব না?’ ভবানী বলে উঠল, ‘দেখতে পাবে না কেন? পাবে। তবে কালী যদি তোমাদের আক্রমণ করে বসে, সে দায় আমি নেব না। কালী তো পাগলিনী প্রায়। ওর মাথার তো এখন আর ঠিকঠিকানা নেই!’

‘কালীকে দেখার কোনো দরকার নাইরে যমুনার মা। চল চল, বাড়ি চল।’ তাড়াতাড়ি বলল মাসি।

যমুনার মা নড়ে না। তার উত্সুক্যের শেষ নেই। ছটফটে কালী ভূতে ধরার পর কী রকম হয়েছে? সে এখন সড়গড়ে গলায় কথা বলে, না পেঁচার মতো বেজার মুখে বসে থাকে? তার চোখ দিয়ে কি আগুন বেরোয়, না চোখগুলো মাছের চোখের মতো ড্যাবডেবে? ও কি বোবা হয়ে গেছে, না আপন মনে বিড়বিড় করে? এসব জানার বড় আগ্রহ যমুনার মায়ের। কিন্তু গিন্নি মায়ের কথা শুনে ভয়ও যে পায়নি, এমন নয়। এই দোনামনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আচ্ছা গিন্নি মা, কালীর অসুখ কি কখনো ভালো হবার নয়? ভূতটা কি ওকে ছেড়ে যাবে না কখনো?’

‘ঈশ্বর জানেন যমুনার মা।’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভবানী বলে। দুহাত জড়ো করে বিধাতার উদ্দেশে প্রণতি জানায়। বলে, ‘তাঁর দিকেই তো তাকিয়ে আছি আমরা। তাঁর কৃপায় যদি ভালো হয়ে ওঠে কালী।’

শুধু ইশ্বরের দয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলে কি চলবে রাজ গিন্নি? কবিরাজ-বদ্যি দেখাতে হবে না! আজ এত মাস হয়ে গেল, কোনো বদ্যি তো আপনাদের উঠানে দেখলাম না। না না, এটা ঠিক করছেন না আপনারা। মেয়েটাকে পেটে ধরেননি বটে। কিন্তু কন্যার আদর দিয়ে তো বড় করে তুলেছেন? কালীর প্রতি দাশরাজার আর আপনার অবহেলা মেনে নিতে পারছি না আমরা।’ বলে মাসি।

এই সুযোগটির জন্য অপেক্ষা করছিল ভবানী। মাসির সব অভিযোগের কোনো প্রতি-উত্তর করল না সে। শুধু বুকের মধ্যখান থেকে দীর্ঘ একটা শ্বাস ত্যাগ করল ভবানী।

করুণ কণ্ঠে বলল, ‘ডাক্তার-বদ্যি যে একেবারে দেখাইনি, তা নয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। শুনেছি ভাটি এলাকায় নামকরা একজন বদ্যি আছে। তার নাম নিলেই নাকি ভূত-পেত্নী পালিয়ে যায়। ঝাড়ফুঁকের মুখোমুখি হলে তো কথাই নেই।

‘তা ওই বদ্যির কাছে নিয়ে যাচ্ছেন না কেন কালীকে?’ যমুনার মায়ের কণ্ঠস্বরে অভিযোগের উষ্মা।

বিষণ্ন চোখে ভবানী বলে, ‘নিয়ে যাব। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই ভাটি অঞ্চলের ওই বদ্যির কাছে নিয়ে যাব কালীকে। ওই দিকেই আমার বাপের বাড়ি। কালীকে একেবারে সুস্থ করে তবেই বাড়ি ফিরব।’

‘তাই করেন রাজগিন্নি।’ মাসি বলে।

ভবানী বলে, ‘সমাজের সবাইকে বলো আমার মেয়ের জন্য একটু আশীর্বাদ করতে। আমার মেয়েটি যাতে প্রাণে বেঁচে থাকে।’ শেষ বাক্যটি ভবানী কেন বলল, মাসি বা যমুনার মা বুঝল না। সন্তান প্রসব যে যমরাজার দুয়ার থেকে ফিরে আসা, তা খোলসা করে কিভাবে বলে ভবানী?

সিন্ধুচরণের বাড়ির পেছন দিক। ছোট্ট একটি উঠান। উঠানটি ঝোপঝাড়ে ঘেরা। সরু একটা পথ সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। একটি ডোবার সামনে গিয়ে পথটি শেষ হয়েছে। ডোবাটি মজে গেছে। ওতে লতা-গুল্মে জড়াজড়ি। ওই উঠানটির ডানপাশে একটা নাম-নাজানা গাছ। বড় বড় পাতা। অনতি উচ্চ। বর্ষার আগে আগে ফুল আসে। সাদা সাদা। ফল ধরে। ঝরে যায়। মৃত্যুর ভয়ে ওই ফল কেউ কোনো দিন খেয়ে দেখেনি। তাই ওই ফল খাদ্য, না অখাদ্য এখনো নির্ণিত হয়নি।

রাতে নিজের কোটারিতে থাকলেও মত্স্যগন্ধার দিনটি কাটে ওই গাছটির নিচে। আপনমনে কখনো গালে হাত দিয়ে, কখনো মাথা নিচু করে, কখনো বা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে কাটায় মত্স্যগন্ধা। উদর তার স্ফীত। চেহারা ক্লান্ত-বিষণ্ন। মা অথবা বাপের সঙ্গে তেমন করে কথা বলে না মত্স্যগন্ধা। যখনই বাবা তার কাছে আসে, চুপচাপ পাশে বসে থাকে। মায়ের কথার উত্তর হুঁ-হ্যাঁ করে জবাব দেয় মত্স্যগন্ধা।

আজ তার পাশে মা নেই, বাপও নেই। বেশ কদিন ধরে বাপ সিন্ধুচরণকে দেখছে না মত্স্যগন্ধা। বাবা কোথায় গেল! প্রতিদিন অন্তত একবার এসে বাপ তার পাশে বসত। আজ বেশ কদিন ধরে তো বাপ তার কাছে আসছে না! মাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। ভাবতে ভাবতে মত্স্যগন্ধা আনমনা হয়ে গেল। তার মন ফিরে গেল সেই বিকেলে, সেই বীভত্স ভয়ংকর সন্ধ্যায়।

নৌকাটির পাশে মুনিকে দেখে তার ভক্তিই জেগেছিল মনে। এ পথে সাধারণত ঋষিদের দেখা যায় না তেমন। ক্বচিৎএক-আধজন আসেন। তাও অনেক দিন পর পর। ছোটবেলায় বাবার তরীতে একবার এক তাপসকে দেখেছিল মত্স্যগন্ধা। তবে তিনি আজকের জনের মতো জটাধারী, ঘন গভীর শ্মশ্রুমণ্ডিত, দীর্ঘনখা, হাড্ডিসার ছিলেন না। তিনি ছিলেন এঁর চেয়ে নবীন। আড়চোখে সে বহুবার তাকিয়েছিল তাঁর দিকে। মেয়েবেলার কৌতূহলই ছিল মত্স্যগন্ধার চোখেমুখে। এ রকম বিচিত্র পোশাকের আর অদ্ভুত চেহারার মানুষ আগে আর দেখেনি মত্স্যগন্ধা। বাবা সিন্ধুচরণ বলেছিল, ‘প্রণাম করো মা, ঋষিকে প্রণাম করো।’ বাবার কথা শুনে ঋষিকে গড় হয়ে প্রণাম করেছিল সে।

কিন্তু ওই ভয়ংকর অপরাহ্নের ঋষিটি ছিলেন অন্যরকম। কুঁচকে যাওয়া চর্ম। পাকা চুল-দাড়ি-ভ্রু। জীর্ণ শরীর। ঘোলাটে চোখ। কৌপীন পরিহিত। তাঁকে দেখেও ভক্তি জেগেছিল মনে। পরিচয় পেয়ে শ্রদ্ধা আরো গাঢ় হয়েছিল। কিন্তু সেই শ্রদ্ধা চটে যেতে খুব বেশি দেরি হয়নি। ঋষি পরাশর তাঁর অতীত ভুলেছেন, ঐতিহ্য ভুলেছেন। তাঁর অর্জিত জ্ঞান, তাঁর বৈদগ্ধ্য তিনি বিস্তৃত হয়ে দেহলোলুপতার সামনে হাঁটু গেড়ে বসেছেন। বলেছেন—তোমার কাছে মিলন প্রার্থনা করছি।

কাকুতিভরা কণ্ঠে মত্স্যগন্ধা বলেছে, ‘আমি সামান্য ধীবরকন্যা। আমার সতীত্ব আর জাতিত্ব নষ্ট করবেন না।’

মিথ্যা প্রবোধ দিয়েছেন পরাশর, ‘তুমি অদ্রিকা নামের মত্স্যার পেটে জন্মাওনি, জন্মেছ অদ্রিকা নামের অপ্সরার গর্ভে। তুমি ছোট জাত নও, তুমি উঁচু জাতের।’

পরাশরের কথায় ভোলেনি মত্স্যগন্ধা। বাঁকা একটু হেসে মুনির দিকে তাকিয়ে থেকেছিল। বুঝতে পেরেছিলেন ঋষি—এই পথে বাসবীকে কবজা করা যাবে না। ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। মেয়েদের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য তাঁর জানা না থাকলেও এইটুকু জানতেন, নিজের রূপ-প্রশংসা সব নারী পছন্দ করে। তাই তিনি বলেছেন, ‘তুমি রূপময়ী মত্স্যগন্ধা। ঐশ্বর্য তোমার পায়ের কাছে লুটিয়ে আছে। তোমার রূপমাধুরী দেখে ত্রিভুবনের যেকোনো পুরুষ বিহ্বল হবে। আমি বিভোর হয়েছিল তন্বী। তুমি আমায় রমণ তৃপ্তি দান করো।’ দু-হাতে নিজের কান চেপে ধরেছিল মত্স্যগন্ধা। তার কপাল-কপোল স্বেদ বিন্দুতে ভরে উঠেছিল। অপমানে আর লজ্জায় কাঁপতে শুরু করেছিল সে। এ কী অবমাননা! হায় ঈশ্বর, এ কী অমর্যাদা! নিজের ভেতরটাকে শক্ত করে তুলেছিল। অবয়বের কমনীয়তা সরে গিয়েছিল। রুক্ষ রূঢ় একটা অভিব্যক্তি তার চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল। ভেবেছিল—কঠোর একটা জবাব দেবে। কিন্তু পরাশরের অবমাননাকর প্রস্তাবে মত্স্যগন্ধা এতই বিহ্বল হয়ে পড়েছিল যে বাকশক্তিই হারিয়ে ফেলেছিল সে। একটা গরগরে গোঁ গোঁ বেরিয়ে এসেছিল মত্স্যগন্ধার মুখ থেকে। পরাশর মত্স্যগন্ধার যন্ত্রণার মানে ধরতে পারেননি। ধরে নিয়েছিলেন—এ বুঝি মত্স্যগন্ধার সম্মতির ধ্বনিগুচ্ছ। বুঝে নিয়েছিলেন—এ বুঝি তার সংগমে সম্মতিদানের শিহরণ। তাই তো পরাশর বলে উঠেছিলেন, ‘আমি বুঝতে পেরেছি তন্বী, দিনের বেলায় প্রকাশ্যে রতিক্রিয়ায় রত হতে চাইছ না তুমি। চাইবেই বা কী করে, লোকলজ্জা বলে একটা কথা আছে না? কিন্তু আমার যে তর সইছে না মত্স্যগন্ধা। তুমি নৌকাটাকে একটু আড়ালে নিয়ে চলো। তাতে লজ্জায় তুমি কাহিল হবে না।’

‘থামুন। বন্ধ করুন আপনার এ রকম অভব্য কথা। আর কত অপমান করবেন আমায়। কত মানসিক নির্যাতন করবেন? পেয়েছেন কী? ভেবেছেন কী আমাকে? কাঙালিনী? ক্ষুধাজর্জর অনাথিনী? নির্জনে অনূঢ়া কন্যাকে পেয়ে মুখে যা আসে বলে যাচ্ছেন? নৌকা ঘুরিয়ে দিচ্ছি আমি। গৃহে ফিরে যাব আমি।’ সগর্জনে বলে গিয়েছিল মত্স্যগন্ধা।

মত্স্যগন্ধার তর্জন-গর্জনে ভড়কে গেলেন না পরাশর। উপরন্তু মত্স্যগন্ধার ওপর বল প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিলেন। মত্স্যগন্ধার ওপর সেই মাঝ যমুনায় ছোট্ট তরণীতে চড়াও হতে হতে বললেন, ‘মুনি-ঋষিদের সঙ্গে রতিকর্মে মর্ত্যরমণীর দেহ অপবিত্র হয় না তন্বী। আমার সঙ্গে যৌনমিলনের পরও তুমি আগের মতো সতেজ আর আকর্ষণীয় থাকবে। তোমার প্রতি পুরুষদের আগ্রহ বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে যাবে।’

‘আমাকে যেতে দিন। আমার সর্বনাশ করবেন না।’ গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে উঠেছিল মত্স্যগন্ধা।

পরাশর তখন বাহ্যজ্ঞানশূন্য। মত্স্যগন্ধার দেহে বিবরসন্ধানে মত্ত তিনি তখন। কামান্ধ পরাশর তখন বলে যাচ্ছেন, ‘আমার সঙ্গে সংগমকালেই তোমার দেহ থেকে মাছের গন্ধ দূরীভূত হবে। সুগন্ধবতী হয়ে উঠবে তুমি বাসবী। তোমার শরীর সুরভিত হয়ে উঠবে। মর্ত্যলোকে যোজনগন্ধা বলে খ্যাতি পাবে তুমি।

‘ও মা! মা রে...।’ বুক মর্দিত করে, চোখমুখ অন্ধকার করে আর্তচিত্কার বেরিয়ে এলো মত্স্যগন্ধার মুখ থেকে। দু-হাত দিয়ে মুখ ঢাকল সে। তার আর্তনাদে সেই নাম না-জানা গাছে বসা পাখপাখালি উড়ে গলে। তার কাতরধ্বনি বাতাসে কম্পন তুলল। মত্স্যগন্ধার হাহাকার ধ্বনি ভেতর ঘরে গৃহস্থালি কাজে রত ভবানীর কানে গিয়ে ধাক্কা দিল। পড়ি কী মরি করে ভবানী কন্যার দিকে ছুটল।

ভবানী কাছে এসে দেখে মত্স্যগন্ধার নিমীলিত চোখ। গাছে হেলান দিয়ে আছে। সেই বিপুল কেশরাশি চারদিকে ছড়ানো। দীর্ঘ ঘনঘোর কালো চুলের মধ্যে মত্স্যগন্ধার মুখমণ্ডল দেখা যাচ্ছে। বিষণ্ন বিপন্ন। টানা টানা মুদিত চোখ দুটি থেকে অশ্রুধারা নিচের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে। তার বক্ষ স্পন্দিত হচ্ছে কি না বোঝার উপায় নেই। অতি মৃদু একটা হাওয়ার লহর তার নাসিকা দিয়ে ঢুকছে-বের হচ্ছে।

অতি সন্তর্পণে ভবানী মত্স্যগন্ধার কাছ ঘেঁষে বসল। বরাভয়ের ডানহাতটি কন্যার মাথার ওপর রাখল ভবানী। এই সময় তার কোনো কথা বলতে ইচ্ছা করল না। কী বলবে সে? কী বলার আছে তার? তার সব কথা যে ফুরিয়ে গেছে। কালীকে নিয়ে তার কী বিপুল স্বপ্ন ছিল। কী নিবিড় গহিন এক বাত্সল্য কালীর জন্য তার বুকের তলায় জমা হয়েছিল। সমাজে বাঁজা বলে দুর্নাম ছিল তার। এই কালী তার বন্ধ্যা নামটি ঘুছিয়েছে। না হোক সে তার উদরে-ধরা কন্যা। কিন্তু মেয়ে তো সে তার? সমাজ মানুষরা তাকে কালীর মা বলে ডাকে তো? তাতেই সই। পাখি যেমন আপন বাচ্চাকে ডানা দিয়ে ঢেকে রাখে, সেও তেমনি কালীকে সেই ছোট্টবেলাটি থেকে বুকে আগলে রেখে সব বিপদ আপদ ঠেকিয়েছে। আদরের কণা দিয়ে কালীর চারপাশে একটা দেয়াল তৈরি করেছে। এই দেয়ালের এপাশে কোনো অশুভতাকে আসতে দেয়নি সে। আজ সেই কালী, স্নেহের সেই পুতলি দলিত। তার সব বাঞ্ছা, সব আতিশয্য যে ফুরিয়ে গেছে আজ।

মাথায় হাত রাখার পরও চোখ খুলল না মত্স্যগন্ধা। আগের মতো বোজা চোখ তার নিস্পন্দ দেহ।

ভবানী মৃদু কণ্ঠে ডাকল, ‘মা। কালী মা।’

মত্স্যগন্ধা নিরুত্তর।

ভবানী আবার বলল, ‘কথা বলছিস না কেন? তোর মা যে তোকে ডাকছে! কথা বল মা। চোখ খোল।’

মত্স্যগন্ধা ধীরে, অতি ধীরে চোখ খুলল। এক সাগর বিষাদ সেই চোখে।

মত্স্যগন্ধা জিজ্ঞেস করল, ‘মা, বাবা কোথায়?’

‘তোর বাবা? তোর বাবা দরকারে একটু...।’

মায়ের কথা শেষ করতে দিল না কালী। বলল, ‘বহুদিন বাবাকে দেখছি না। কোথায় গেছে বাবা?’

ভবানী ঠিক করে রেখেছিল—কালীর দ্বীপান্তরে যাওয়ার ব্যাপারটি আগেভাগে জানাবে না কালীকে। চরণদ্বীপে সব কাজ সম্পন্ন হলে যাওয়ার আগ মুহূর্তে কন্যাকে জানাবে। আগেভাগে বললে কালীর মনঃকষ্ট বাড়বে শুধু। তাই দাশরাজা সিন্ধুচরণের চরণদ্বীপে যাওয়া, সেখানে দীর্ঘসময় অতিবাহিত করে বাসযোগ্য একটা ঘর তৈরি করা, ঘরের আশপাশটা পরিষ্কার করা—এসব ব্যাপার কালীর কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছে ভবানী। কিন্তু আজ কালী যখন চোখে চোখ রেখে তার বাপের সন্ধান জানতে চাইল, আর কোনোকিছু গোপন করতে ইচ্ছে করল না ভবানীর।

বলল, ‘তোর বাবা চরণদ্বীপে গেছে।’

‘চরণদ্বীপ! চরণদ্বীপটি আবার কোথায়?’

‘যমুনার মাঝখানে।’

‘যমুনা...।’ বলে মত্স্যগন্ধা ডুকরে উঠল। যমুনা নামটি মত্স্যগন্ধার জীবনে মস্তবড় এক অভিশাপ যেন। এ যেন তার সর্বনাশের তরঙ্গক্ষেত্র। মেয়ের ব্যাকুলতা দেখে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকল ভবানী। তারপর বলল, ‘ওই দ্বীপেই যে যেতে হবে মা আমাদের।’

‘কেন? ওখানে কেন যাব মা?’

‘ওই নির্জন দ্বীপে লোকচক্ষুর আড়ালেই যে তোকে সন্তান জন্ম দিতে হবে রে মা।’ ভবানীর ভাঙাচোরা গলা থেকে কথাগুলো বেরিয়ে এলো।

  চলবে ►

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা