গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার জুগিয়াপাড়া গ্রামের আদিবাসী নারী কাজলী মার্ডের প্রতিটি দিনই কাটে সংগ্রামের মধ্যে। স্বামীর ভ্যান চালানোর সামান্য আয়ে কোনোমতে চলে পাঁচ সদস্যের সংসার। তিন মেয়ের পড়াশোনা, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলাতে গিয়ে প্রায়ই দিশাহারা হতে হয় পরিবারটিকে। তবু অভাবের কাছে হার না মেনে মেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
অনেক দিন ধরেই সেলাইয়ের কাজ শিখে আয় করার ইচ্ছা ছিল কাজলীর। কিন্তু একটি সেলাই মেশিন কেনার সামর্থ্য না থাকায় সেই স্বপ্ন অধরাই ছিল। অবশেষে বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় বসুন্ধরা শুভসংঘের দেওয়া একটি সেলাই মেশিন তার জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
সেলাই মেশিন হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত কাজলী মার্ডে বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই ইচ্ছা ছিল সেলাইয়ের কাজ করে কিছু আয় করব। কিন্তু মেশিন কেনার সামর্থ্য ছিল না। এখন কাজ শুরু করতে পারব। সংসারে সাহায্য করতে পারব, মেয়েদের পড়াশোনার খরচও বহন করা সহজ হবে।’
শুক্রবার (২৪ জুলাই) গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা অডিটরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উপজেলার ২০ জন অসচ্ছল নারীর হাতে সেলাই মেশিন এবং দুটি করে গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে দক্ষ হয়ে ওঠা এসব নারী বসুন্ধরা গ্রুপের উপহার হিসেবে সেলাই মেশিন গ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন কালের কণ্ঠের গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি এবং গাইবান্ধা জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি অমিতাভ দাস হিমুন। প্রধান অতিথি ছিলেন দুই বাংলার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক, বসুন্ধরা গ্রুপের উপদেষ্টা ও বসুন্ধরা শুভসংঘের প্রধান ইমদাদুল হক মিলন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘অসহায় ও অসচ্ছল নারীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যেই আমরা সেলাই মেশিন বিতরণ কর্মসূচি চালু করেছি। একজন নারী ঘরে বসে আয় করতে পারলে তার পুরো পরিবার উপকৃত হয়। এই সেলাই মেশিনকে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করুন। একই সঙ্গে আপনাদের দেওয়া গাছগুলোরও যত্ন নিন।’
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তামশিদ ইরাম খান, গোবিন্দগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফারুক আহমেদ, পৌর বিএনপির সভাপতি রবিউল কবির মনু, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার হোসেন দিপু, থানা মহিলা দলের সভাপতি মঞ্জুরি আহমেদ, গোবিন্দগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা, পৌর যুবদলের সদস্যসচিব আনোয়ার হোসেন গোলাম, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মিনহাজুল তালুকদার, থানা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক গোবিন্দ কুমার, সদস্যসচিব মনির হোসেন সরকার, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হাদিসুর রহমান, গোবিন্দগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক শিবলী কায়েস মীরসহ স্থানীয় সাংবাদিক, সমাজসেবক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তামশিদ ইরাম খান বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের মতো একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান গোবিন্দগঞ্জের অসচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সুবিধাভোগীদের মধ্যে সাঁওতাল নারীদের অন্তর্ভুক্ত করাও একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। এই সেলাই মেশিন তাদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।’
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফারুক আহমেদ বলেন, ‘অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বসুন্ধরা শুভসংঘের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। এই সেলাই মেশিন অনেক নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুলে দেবে।’
পৌর বিএনপির সভাপতি রবিউল কবির মনু বলেন, ‘অসচ্ছল নারীদের স্বাবলম্বী করতে বসুন্ধরা শুভসংঘ যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক। ভবিষ্যতেও তারা মানুষের কল্যাণে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বলে আশা করি।’
জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার হোসেন দিপু বলেন, ‘আজ যারা সেলাই মেশিন পেয়েছেন, তারা শুধু কর্মসংস্থানের একটি উপকরণই পাননি, পরিবেশ রক্ষার বার্তাও পেয়েছেন গাছের চারার মাধ্যমে। একটি সেলাই মেশিন যেমন একটি পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ খুলে দিতে পারে, তেমনি একটি গাছ সুন্দর ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলে।’
অনুষ্ঠান শেষে তিন মাসের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা ২০ নারী হাতে সেলাই মেশিন ও গাছের চারা নিয়ে নতুন স্বপ্ন ও পরিবারকে স্বচ্ছল করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বাড়ি ফেরেন।









