kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সচ্ছলতা এসেছে রাসেলদের পরিবারে

গণেশ পাল   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ১৮:২৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সচ্ছলতা এসেছে রাসেলদের পরিবারে

নতুন ঘরের সামনে মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রাসেলরা চার ভাই-বোন

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ শুক্রবার। টানা ২৫ দিন পর বাড়ি আসবে রাসেল। তাই ঘুম থেকে জেগেই পড়ার টেবিল, বিছানাসহ ঘরের জিনিসপত্র পরিপাটি করে গুছিয়ে রেখেছে ছোট তিন বোন। বাবা ইউছুপ আলী শেখ সকালের খাবার খেয়ে রাজমিস্ত্রির জোগালির (সহকারী) কাজে গেছেন।

বিজ্ঞাপন

নিজ হাতে মুরগির মাংস, মসুরের ডাল, পুঁইশাক ও মোটা চালের ভাত রান্না করে ছেলের অপেক্ষায় বসে আছেন মা সালেহা বেগম। দুপুরে নিজ বাড়ি ‘স্বপ্নের নীড়ে’ এসে মায়ের হাতে রান্না করা ওই খাবার খায় গোয়ালন্দের অদম্য মেধাবী সেই রাসেল শেখ। কালের কণ্ঠ শুভসংঘ ও বসুন্ধরা গ্রুপের প্রচেষ্টায় অসহায় ওই পরিবারের আগের পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। অদম্য মেধাবী রাসেল এখন রাজবাড়ী সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির (বিজ্ঞান বিভাগ) ছাত্র। ওই কলেজের ছাত্রাবাসে থেকে নিশ্চিন্ত মনে লেখাপড়া করে ভবিষ্যৎ স্বপ্নপূরণে এগিয়ে যাচ্ছে রাসেল।

গোয়ালন্দ উপজেলার ছোটভাকলা ইউনিয়নের চরবরাট গ্রামে ‘রাসেলদের স্বপ্নের নীড়’ সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বসুন্ধরা গ্রুপের আর্থিক সহায়তায় কালের কণ্ঠ শুভসংঘের বাস্তবায়নে নির্মিত ঘরের বারান্দায় বসে ছোট তিন বোন ইসমা, ময়না ও সিমার সঙ্গে লুডু খেলছে রাসেল। বসতঘরের পাশে গোয়ালঘরের সামনে হাঁস ও মুরগির খাবার দিচ্ছেন রাসেলের মা সালেহা বেগম। সেখানে এই প্রতিবেদকের হঠাৎ উপস্থিতি দেখে সবাই হাসিমুখে এগিয়ে আসে। রাসেল বলে, ‘হোস্টেলে থেকে কলেজে নিয়মিত ক্লাস করছি। বিভিন্ন সাবজেক্ট প্রাইভেট পড়ছি। বিনা বেতনে আমাকে ইংরেজি পড়াচ্ছেন সালাউদ্দিন স্যার, অদ্বৈত স্যার ম্যাথম্যাটিকস, মেহেদী স্যার কেমিস্ট্রি এবং ফিজিকস পড়াচ্ছেন আরিফ স্যার। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও প্রাইভেট পড়া থাকে। পড়ালেখার চাপ অনেক বেশি।

তাই টানা ২৫ দিন পর হোস্টেল থেকে আজ দুপুরে বাড়ি এসেছি। কাল সকালেই কলেজ হোস্টেলে ফিরে যাব। বসুন্ধরা গ্রুপ পাশে দাঁড়িয়েছে বলেই আজ আমি কলেজে পড়ছি। আমিসহ আমার ছোট তিন বোনের লেখাপড়ার জন্য নিয়মিত মাসিক শিক্ষাবৃত্তির টাকা দিচ্ছে শুভসংঘ। ’ কথা বলার এক পর্যায়ে অনেকটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে রাসেল। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সে বলে, ‘বসুন্ধরা গ্রুপ ও কালের কণ্ঠ শুভসংঘ সারা জীবন আমার অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে থাকবে। ইমদাদুল হক মিলন স্যারের কথা আমি কোনো দিন ভুলব না। ’ এদিকে রাসেলের মা সালেহা বেগম একজন সংগ্রামী নারী। তিনি বলেন, ‘বসুন্ধরা আমাগের নতুন ঘর দিছে। পানির কল বসায় দিছে। লেট্রিন বানায় দিছে। তিনডা ছাগল দিছে। হাঁস-মুরগিসহ আরো অনেক কিছু দিছে। মাইনসের বাড়িতে কামকাজ ছাইড়া দিছি। অহন ছাগল, হাঁস-মুরগি পাইলা সময় কাটে। ওই তিন ছাগলের ছয়টা বাচ্চা হইছে। বাচ্চাগুলাও অনেক বড় হইছে। চারটা হাঁসের ডিম ফুটাইয়া ২১টা বাচ্চা হইছে। চারটা মুরগির মধ্যে একটা মুরগি শিয়ালে খাইছে। বাকি তিনটা মুরগি ডিম পারতাছে। তাই সংসারে আর আগের মতন কষ্ট নাই। অহন তিন বেলা রান্না কইরা খাই। ’ তিনি জানান, রাসেলের বাবা ইউছুপ আলী শেখ রাজমিস্ত্রির জোগালির (সহকারী) কাজ করতেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ কয়েক মাস বেকার হয়ে ছিলেন। চিকিৎসার পর তিনি এখন পুরোপুরি সুস্থ। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় রাজমিস্ত্রির জোগালির নিয়মিত কাজ করছেন ইউছুপ আলী। এদিকে রাসেলের ছোট তিন বোন লেখাপড়া করছে। এর মধ্যে ইসমা খাতুন গোয়ালন্দের চৌধুরী আব্দুল হামিদ একাডেমির অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। ময়না খাতুন স্থানীয় আকিরুন্নেছা ইসলামিয়া মাদরাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। সিমা খাতুন চরবরাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। এদিকে প্রতিবেশী বৃদ্ধা চায়না বেগম জানিয়েছেন, রাসেলের বোন ইসমা খাতুনের বিয়ের প্রস্তাব আসছে, কিন্তু কোনো প্রস্তাবে রাজি হচ্ছে না ইসমা। অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ইসমা খাতুন এ প্রসঙ্গে বলে, ‘আমি লেখাপড়া করে অনেক বড় হতে চাই। যে যতই চেষ্টা করুক, প্রাপ্তবয়স না হওয়া পর্যন্ত আমি বিয়ের পিঁড়িতে বসব না। ’ কথাবার্তা শেষে এই প্রতিবেদক যখন চরবাট গ্রাম থেকে ফিরছিলেন, সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে অনেকটা হেলে পড়েছে। কিছুদূর হাঁটাপথ পেরিয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখা যায়, রাসেলদের স্বপ্নের নীড়ে নতুন টিনের চৌচালা সূর্যের আলোকচ্ছটায় চিকচিক করছে।

ফিরে দেখা : গোয়ালন্দের চরবরাট গ্রামের ছোট্ট একটি ছাপরাঘর ছিল। চারপাশে পাটকাঠির বেড়া। ওপরে ভাঙা টিনের চাল। পুরনো হওয়ায় ঘরের বেড়ার বিভিন্ন অংশ ভাঙা। ভাঙা বেড়ার খোলা অংশে ছেঁড়া কাপড় ও প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখা ছিল। ঘরের ভেতরে এক পাশে বাঁশের মাচায় ছেঁড়া কাঁথার বিছানা। অপর পাশে ছোট্ট মাচার ওপরে গাদাগাদি করে রাখা বই-খাতাসহ সাংসারিক বিভিন্ন সরঞ্জাম। ঘরের বরান্দায় এক পাশে ছাগলের ঘর, অপর পাশে আরো একটি বাঁশের মাচা। অন্যের জমিতে তৈরি করা ওই খুপরিঘরে মা-বাবা, ছোট তিন বোনসহ বসবাস করত অদম্য মেধাবী রাসেল শেখ। বাবা ইউছুপ আলী শেখ রাজমিস্ত্রির জোগালির (সহকারী) কাজ করতেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি বেকার হয়ে ছিলেন। মা সালেহা বেগম অন্যের বাড়িতে কাজ করার পাশাপাশি তিনটি ছাগল ও দুটি হাঁস পালন করতেন। মা-বাবার অভাবের সংসারে এক বেলা ভালো খাবার জোটেনি রাসেলের। এরই মাঝে গোয়ালন্দের চৌধুরী আব্দুল হামিদ একাডেমি থেকে গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় সে জিপিএ ৫ পায়। টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়তে পড়েনি বিজ্ঞানের ছাত্র রাসেল। অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে উল্টো নিজেই প্রাইভেট পড়িয়েছে। টিউশনি করে সে স্কুলপড়ুয়া ছোট তিন বোনসহ নিজের পোশাক ও খাতা-কলম কেনার টাকা জোগাড় করত। রাসেলের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন একজন আদর্শ চিকিৎসক হওয়া। কিন্তু অভাবের কারণে নিজ স্বপ্নপূরণে অনেকটা শঙ্কিত ছিল রাসেল। এমন পরিস্থিতিতে অদম্য মেধাবী রাসেল ও তার অসহায় পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায় কালের কণ্ঠ শুভসংঘ। দেশের স্বনামধন্য বসুন্ধরা গ্রুপের আর্থিক সহায়তায় রাসেলের পরিবারের জন্য প্রথমে এক মাসের প্রয়োজনীয় চাল, ডাল, তেল, আটা, লবণ, গুঁড়া দুধ, চিনি, সাবান, বিভিন্ন মসলাসহ হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক উপহার পাঠায় শুভসংঘ কেন্দ্রীয় কমিটি। এরপর বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের নির্দেশে রাসেলদের জন্য বারান্দাসহ টিন ও কাঠের তৈরি চৌচালা নতুন বড় একটি ঘর, ঘুমানোর জন্য কাঠের চৌকি, পড়ার টেবিল, চেয়ার, নতুন টিউবওয়েল ও স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন নির্মাণ করা হয়। পাশাপাশি স্বাবলম্বী করার প্রচেষ্টায় রাসেলের অসহায় পরিবারকে তিনটি ছাগলসহ হাঁস ও মুরগি দেওয়া হয়। মা-বাবাসহ রাসেল ও তার স্কুলপড়ুয়া তিন বোনের জন্য কিনে দেওয়া হয় নতুন পোশাক, পাদুকাসহ প্রয়োজনীয় প্রসাধনী।



সাতদিনের সেরা