kalerkantho

রবিবার । ২৬ জুন ২০২২ । ১২ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৫ জিলকদ ১৪৪৩

পা হারানো মনু মোল্লাকে বসুন্ধরার খাদ্যসহায়তা

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা    

২৫ মে, ২০২২ ১৪:০৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পা হারানো মনু মোল্লাকে বসুন্ধরার খাদ্যসহায়তা

রেল দুর্ঘটনায় তার ডান পা ঠিক হাঁটুর নীচ থেকে কাটা পড়ে। প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন, তবে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবন চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। এক পায়ে সকল কাজ করা যায় না। এ কারণে একপর্যায়ে বাধ্য হয়েই ভিক্ষাবৃত্তির জীবন বেছে নিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

একটানা আট বছর ভিক্ষাবৃত্তি করেছেন। তবে তা দেশে নয়, বেশিরভাগটাই বিদেশে, ভারতে। এখন আর তা করেন না, বাদ দিয়েছেন। কাটা পায়ে একটি প্লাস্টিকের পা লাগিয়েছেন। আর তাতেই কোমর সোজা করে মাটিতে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারেন। রিকশা চালান। খুব কষ্ট হয়, আয় হয় অতি সামান্য। কিন্তু পোষ্য অনেক।  

নাম তার মনু মোল্লা। খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলায় বাড়ি। থাকেন খুলনা শহরের বাগমারায়। নিত্য অভাবের সংসারের জোয়াল টানতে টানতে তিনি ক্লান্ত। শারীরিক অক্ষমতা, ক্লান্তির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রতিদিন রিকশা নিয়ে বেরোতে পারেন না। বেরোলেও ঠিকমতো ভাড়া হয় না। সোমবারও রিকশা চালাতে গিয়েছিলেন। সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত রিকশা নিয়ে ঘুরে মাত্র ১০০ টাকা আয় করেছেন। নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। করোনাকালেও আয় ছিল না, মানুষের সহায়তার ওপর নির্ভর করে টিকে ছিলেন। এখন সেই সহায়তা অব্যাহত নেই। ফলে তিনি খুবই অসহায় বোধ করছিলেন। এমনি সময় তার সাথে দেখা হয়, কথা হয় শুভসংঘের এক বন্ধুর।  

সেই বন্ধুটি শুভসংঘের নেতা-সংগঠক আবু সাঈদের সাথে কথা বলেন। তিনি কথা বলেন কেন্দ্রীয় পরিচালক জাকারিয়া জামানের সাথে। আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়ে ঠিক হয় দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরার পক্ষ হতে মনু মোল্লাকে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হবে। সহায়তা এমন হবে যাতে ওই পরিবারটির অন্তত মাসখানেকের জন্য বাজারের চিন্তা না করতে হয়। এই ভাবনা বাস্তবে রূপায়নের জন্য শুভসংঘ খুলনা শাখার বন্ধুরা সাধারণ সম্পাদক মো. আবু সাইদ খান, সহ-সভাপতি কাজী মাহবুব রহমান, রাজীব সরকার রাহুল, চিরঞ্জিত সরকার ও বিশাল খাদ্যসামগ্রী (২৫ কেজি চাউল, ডাল, তেল, নুন, আটা, আলু, পেঁয়াজ, রসুন প্রভৃতি) নিয়ে হাজির হন খুলনা নগরের বাগমারা ব্রিজের কাছে মনু মোল্লার ভাড়া বাড়িতে। সঙ্গে ছিলেন কালের কণ্ঠ খুলনা ব্যুরো প্রধান, সিনিয়র রিপোর্টার গৌরাঙ্গ নন্দী।  

একজন আইনজীবীর জমি সেটি। সেখানেই ছোট ছোট অনেকগুলো ঘর। জ্যৈষ্ঠ মাসের ঠা ঠা রোদের মাঝেও বাড়িটির একাধিক কোণে পানিতে সয়লাব। পানি আটকে আছে, জলাবদ্ধতা। ছোট ছোট ঘরের সারি, ঠিক যেন বস্তি ঘর। ঘরের পাশেই পয়ঃনিষ্কাশনের জায়গা। বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করে এঁকেবেঁকে বেশ খানিকটা এগিয়ে মনু মোল্লার ঘর পাওয়া গেল। দশ হাত প্রস্থ, পনেরো হাত লম্বার ঘরটির মেঝেতে ইট বসানো হলেও তা স্যাঁতস্যাতে। এক কোনায় দরজা। টিনের ছাউনি, বাঁশের বেড়া দেওয়া এই ঘরটির ভাড়া দিতে হয় মাসে পনেরোশ টাকা।

বসুন্ধরার খাদ্যসহায়তা নিয়ে মনু মোল্লার দরজার সামনে শুভসংঘের বন্ধুরা হাজির হলে তার মুখে হাসির ঝিলিক ওঠে। শুভসংঘের বন্ধু বিশালকে দেখেই তিনি বুঝতে পারেন তাদের জন্যই এই সহায়তা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কারণ, বিশালের সাথে আগেভাগে মনু মোল্লার কথা হয়েছিল। সকল কথা জেনে বিশাল তাকে বলেছিল, আলালোচনা করে দেখি আপনাকে সামান্য খাদ্য সহায়তা দেওয়া যায় কিনা। একদিন আগে এসব কথাবার্তা, আর পরদিন যখন এক বস্তা চাউল ও এক বস্তা ভর্তি অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে সেই বিশাল তার দরোজার সামনে হাজির হয়, তখন তার আর এর মর্মার্থ বুঝতে বাকি থাকেনি। তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় খাদ্যসামগ্রী। তার পা হারানোর কথা, পরিবারের অবস্থা নিয়ে কথা হয়। খাদ্য সহায়তা পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তিনি কাজী মাহবুবকে বলেন, আমি সকলকে প্রাণভরে দোয়া করি।
  
মনু মিয়া জানান, তাদের ছয়টি সন্তান। চার মেয়ে, দুই ছেলে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। বড় মেয়েটির সঙ্গে তার স্বামীর ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ায় তার কাছে চলে আসে। সেই মেয়েটিও মারা গেছে। মেয়েটির চারটি সন্তান তার কাছে, তারা গ্রামের বাড়ি তেরখাদায় থাকে। ছেলে দুটো দিনমজুরির কাজ করে। খুলনার বাসায় তার ছোট ছেলেটিকে নিয়ে তারা স্বামী-স্ত্রী মোট তিনজন থাকেন। দিনমজুরি, রিকশা চালানো প্রভৃতি কাজ করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। ১৯৮৯ সালে রেল দুর্ঘটনায় ডান পা কাটা পড়লে তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন। স্বাভাবিক কাজকর্ম করা খুবই অসুবিধাজনক। বেছে নিয়েছিলেন ভিক্ষাবৃত্তির জীবন। নিজের শহর খুলনায় থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করা দুরূহ হবে ভেবে চলে যান ভারতে। গুজরাট, দিল্লী প্রভৃতি এলাকায় ভিক্ষা করেছেন। সেই ভিক্ষাবৃত্তির টাকায় পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। এখন আবারও রিকশা চালান। কিন্তু সামর্থ্যহীনতা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।  



সাতদিনের সেরা