kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

মাধবপুরে মাদকের থাবা

হোতারা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি   

৩০ মে, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাধবপুরে মাদকের থাবা

হবিগঞ্জের মাধবপুরে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাদকের বিষবাষ্প মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এ এলাকায় এখন হাত বাড়ালেই মিলছে মরণনেশা মাদক। তা ছাড়া প্রায় প্রতিদিনই পুলিশ, বিজিবি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হাতে ধরা পড়ছে মাদকের চালান। টাকার বিনিময়ে মাদক বহনকারী যান ও চুনোপুঁটি কারবারিরা ধরা পড়লেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদকের মূল হোতারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।

রাঘব বোয়ালরা মাদক আইনের বাইরে থাকায় মাধবপুরে মাদকের প্রসার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে সচেতন মানুষের ধারণা। ২০১৪ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় মাধবপুর উপজেলায় ১৭ জন অস্ত্র ও চোরাচালানকারীর নাম প্রকাশিত হয়েছিল। তারা উপজেলার ধর্মঘর, চৌমুহনী, বহরা, শাহজাহানপুর ও জগদীশপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। তালিকাভুক্ত ১৭ জনের সৃষ্ট শতাধিক মাদক, চোরাকারবারসহ দুর্ধর্ষ অপরাধীর বিচরণ রয়েছে মাধবপুরে। তাদের বেপরোয়া চলাফেরায় সাধারণ জনগণ ভীতসন্ত্রস্ত। দুর্ধর্ষ মাদক ও চোরাচালান সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় উপজেলাবাসী। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সীমান্ত রক্ষীবাহিনী ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযান পরিচলানা করে এলেও কারবারিদের দমানো যাচ্ছে না। বরং মাদকের প্রসারতা দিন দিন বাড়ছে।

মাধবপুর উপজেলার শাহজাহানপুর, জগদীশপুর ও নয়াপাড়া—এই তিন ইউনিয়নের রেল ও সড়কপথ চা বাগান বেষ্টিত হওয়ায় ওই সব এলাকা মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী স্থানীয় ইউপি সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় মাদক ও চোরাচালানকারীরা সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছে। তারা এলাকায় বিচরণ করে বুক ফুলিয়ে। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ট্রাক, প্রাইভেট কার, পিকআপসহ মহিলা ও স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিশু-কিশোরকে দিয়ে মাদক পাচার করা হয়।

২০০৮ সালে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সঙ্গে ক্রসফায়ারে নিহত হয় মাদকসম্রাট নয়াপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল হাকিম। এর আগে তেলিয়াপাড়া ইউনিয়নের মাদকসম্রাট আব্দুল সোবহান মাদক মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়। তাদের উত্তসূরিরাও দাপটের সঙ্গে মাদকের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক ও র‌্যাবের মহাপরিচালকের নির্দেশে গত ৪ মে থেকে মাদক নির্মূলে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু মাধবপুরে নির্বিঘ্নে চলছে মাদকের কারবার। প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদকসহ পাচারকারীরা ধরা পড়লেও মূল হোতা ও নিয়ন্ত্রণকারীরা থেকে যাচ্ছে অধরা। রহস্যজনক কারণে মামলার এজাহার থেকে তাদের নামও বাদ পড়ছে। সীমান্তবর্তী উপজেলা মাধবপুরের সবখানে এখন হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক। মাদকের সহজ লভ্যতায় ক্রমেই বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। এ কারণে সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন রয়েছে অভিভাবকসহ সচেতন মহল।

প্রায় ৩০ কিমি সীমান্ত এলাকার কাঁটাতার ভেদ করে পার্শ্ববর্তী ভারত থেকে ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবাসহ সব প্রকার মাদকদ্রব্য মাধবপুরে প্রবেশ করে। পরে সড়ক ও রেলপথে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তা পাচার করা হয়। মাদক কারবারিদের নিয়ন্ত্রণে শতাধিক মাদকের স্পট ছাড়াও এখানে ভ্রাম্যমাণ মাদক বিক্রেতার সংখ্যা রয়েছে কয়েক শ। মাদক কারবারিদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলাব্যাপী তাদের দাপটও বাড়ছে। গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর কুখ্যাত মাদক কারবারি হাবিব সোহাগ (৩৪) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে। উপজেলা ধর্মঘর থেকে বাঘাসুরা ১১টি ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামেই রয়েছে মাদক বিক্রেতাদের সিন্ডিকেট ও স্পট।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক খাইরুল আলম জানান, লোকবলের অভাবে বড় চালান আটক করা সম্ভব হয় না। তবে খুচরা বিক্রেতা ও সেবনকারীদের আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদলতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হচ্ছে।

সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার এস এম রাজু আহমেদ জানান, মাদক নির্মূলকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে মাদকবিরোধী সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, মাদক উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত আছে। মাদকসংশ্লিষ্ট যে-ই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

তবে সচেতন মহল ও অভিভাবকরা মনে করে, মাধবপুরে মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসন প্রশংসনীয় ভূমিকা না রাখতে পারলে একসময় পুরো উপজেলা মাদকের কালো থাবায় পিষ্ট হবে।

 

মন্তব্য