kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

সিলেট নগরে পানি সংকট

অবৈধ গ্রাহকই বেশি, টনক নড়ল নগর সংস্থার

সিলেট অফিস   

২৩ মে, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অবৈধ গ্রাহকই বেশি, টনক নড়ল নগর সংস্থার

সিলেট মহানগরে পানির চাহিদা প্রতিদিন আট কোটি লিটার। এর অর্ধেকের মতো পানি সরবরাহ করতে পারে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। তাদের হিসাবে বৈধ গ্রাহকদের চাহিদা প্রায় দুই কোটি লিটার। বাকি পানির চাহিদা পূরণ হচ্ছে অবৈধ পথে। অর্থাৎ সিসিকের সরবরাহকৃত পানির অর্ধেকই চলে যাচ্ছে অবৈধ গ্রাহকের কাছে। এদিকে বৈধ গ্রাহকদের কাছে সিসিকের বকেয়া পানির বিল ১০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ফলে দ্বিগুণের বেশি অবৈধ গ্রাহক বাবদ বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সংস্থাটি। অবৈধ সংযোগে জড়িত সিসিকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ বিষয়ে উদাসীন নগর সংস্থা রমজান সামনে রেখে হঠাৎ তৎপর হয়ে উঠেছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, নগরের কয়েকটি এলাকায় পানির জন্য রীতিমতো হাহাকার চলছে। বস্তি এলাকার অবস্থা বেশি খারাপ। কোনো কোনো বস্তিতে পাঁচ শতাধিক লোকের জন্য রয়েছে একটিমাত্র নলকূপ। পানির জন্য এসব এলাকায় দীর্ঘ লাইন এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

সিলেট নগরের জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। নগরের ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে তিনটি ওয়ার্ডে এখনো পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নেই। প্রতিদিন সাড়ে চার কোটি লিটার পানি সরবরাহ করতে পারে সিসিক। বাকি পানি নগরবাসী সংগ্রহ করে নিজস্ব গভীর নলকূপ, সাধারণ নলকূপ ও সুরমা নদী থেকে।

নগরের দাঁড়িয়াপাড়া, মির্জা জাঙ্গাল, কাজী ইলিয়াস, মীরবক্সটুলা, আম্বরখানা বড়বাজার, পাঠানটুলা, পনিটুলা, গোয়াইপাড়া, খাসদবীর, চৌকিদেখি, পীরমহলা, বাগবাড়ী, খুলিয়াপাড়া, ভাঙাটিকর, শেখঘাট, কুয়ারপার, লামাবাজার, মণিপুরি রাজবাড়ী, কাস্টঘর, চালিবন্দর, জলারপার, পুরান লেন, বারুতখানা, জেল রোড, সোবহানীঘাট, মীরাবাজার, জয়নগর, মানিকপীর সড়ক ছড়ারপার, মেন্দিবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি সমস্যা প্রকট। এসব এলাকায় অগভীর নলকূপেও এখন পানি উঠছে না।

মাছু দীঘিরপাড় এলাকার বাসিন্দা কলেজছাত্র সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘সিটি করপোরেশন যে পানি সরবরাহ করে তা খাওয়ার উপযোগী নয়। এমনকি কাপড়চোপড়, থালা-বাসনও ধোয়া যায় না। বাধ্য হয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।’ নগরের নয়া সড়ক এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন রানা অভিযোগ করে বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে নিয়মিত পানি পাওয়া যায় না। কখনো কখনো টানা দুই-তিন দিন পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ থাকে না। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। পানি সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়ও নেই। ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বন্ধন আবাসিক এলাকার বাসিন্দা শাকিল মজুমদার বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহ লাইন আমাদের এলাকায় শুরু হয়নি। আগে অগভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতাম। এখন নলকূপেও পানি উঠছে না। এ অবস্থায় পানির জন্য প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’

সিলেট পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর নগরের আয়তন বাড়লেও পানীয় জলের সুবিধা বাড়েনি। এখনো দক্ষিণ সুরমার ২৫, ২৬ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডবাসী সিসিকের পানি সুবিধা পায়নি। কর্তৃপক্ষ বলছে, সাবেক পৌর এলাকায় যেখানে পানির লাইন আছে, সেখানেই পানি দিচ্ছে তারা। অনেক এলাকায় পাইপলাইন টানা আছে; কিন্তু পানি দিতে পারছে না করপোরেশন।

সিসিক সূত্রে জানা গেছে, সিসিকের হোল্ডিংয়ের সংখ্যা সাড়ে ৫৪ হাজার। আবাসিক ও বাণিজ্যিক মিলিয়ে সিসিকের পানির বৈধ গ্রাহক সাড়ে ১৪ হাজার। করপোরেশনের হিসাবে তাদের পানির চাহিদা গড়ে এক কোটি ৯ লাখ লিটার। বাকি প্রায় তিন কোটি ৪১ লাখ লিটার পানিই যাচ্ছে অবৈধ সংযোগকারীর কাছে। অনেকে ১-২ ইঞ্চি পাইপের পানি সংযোজনের অনুমতি নিয়ে অসাধু কর্মকর্তাদের উেকাচ দিয়ে ৩-৪ ইঞ্চি পাইপ বসিয়ে পানি নিচ্ছে, কেউ কেউ পানির মূল লাইনে বসিয়েছে বৈদ্যুতিক মোটর। এতে বৈধ গ্রাহকরা টাকা পরিশোধ করেও নিয়মিত পানি পাচ্ছে না। এসব কাজে জড়িত করপোরেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। বিষয়টি ওপেন সিক্রেট হলেও এ বিষয়ে তৎপরতা দেখা যায়নি সিসিকের। তবে কিছুদিন ধরে অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে তৎপরতা শুরু করেছে সিসিক। ৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদমাধ্যমকে বিষয়টি জানান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে তিন দিনের আলটিমেটামও দেন। ৮ মে সেই সময় শেষ হয়েছে। অবৈধ সংযোগকারীদের সাত দিনের মধ্যে নির্ধারিত ফি দিয়ে সংযোগ বৈধ করারও সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বৈধ গ্রাহকদের কাছে পাওনা ১০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা উদ্ধারে। সাত দিনের মধ্যে যারা বকেয়া পরিশোধ করবে তারা ৩০ শতাংশ ছাড় পাবে।

পানির বিপুলসংখ্যক অবৈধ সংযোগ এবং এর সঙ্গে সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশের বিষয়টি স্বীকার করেছেন সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বকেয়া পরিশোধে ছাড়ের সুযোগ নিতে এবং অবৈধ সংযোগ বৈধ করার সুযোগটি কাজে লাগাতে অনেকেই সিটি করপোরেশনে ভিড় জমাচ্ছে।’ অবৈধ সংযোগে করপোরেশনের লোকজনের জড়িত বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছি। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা