kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

লামা-আলীকদমে নাব্যতা হারাচ্ছে মাতামুহুরী

অবাধে পাথর আহরণ ও নদীর তীরে তামাক চাষের বিরূপ প্রভাব

তানফিজুর রহমান, লামা (বান্দরবান)   

১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বান্দরবানের লামা ও আলীকদমে বিধি বহির্ভূতভাবে পাথর আহরণ ও নদীর তীর কেটে তামাক চাষের বিরূপ প্রভাবে নাব্যতা হারাচ্ছে মাতামুহুরী। নদীর তলদেশ এখন সবুজ ফসলের মাঠে পরিণত হয়েছে।

অস্বাভাবিকভাবে নাব্যতা হারানোর কারণে বর্ষা মৌসুমে সামান্য বর্ষণের ফলে নদী ফেঁপে উঠে সৃষ্ট বন্যায় প্রতিবছর উপজেলা দুটির ব্যাপক জানমালের ক্ষতি হয়। স্থানীয়রা জরুরি ভিত্তিতে নদী ড্রেজিংয়ের দাবি জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের সীমান্তে ক্রাউডং বা ময়ভার পর্বতমালা থেকে মাতামুহুরী নদী উৎপন্ন হয়ে আলীকদমের রিজার্ভ বনভূমির উপর দিয়ে সর্পিল গতিতে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে লামা উপজেলা পর্যন্ত এসে পশ্চিম দিকে মোড় নিয়ে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার দিকে প্রবাহিত হয়েছে। এ নদীর উৎপত্তি স্থান থেকে ৩২৪ কিলোমিটার পথে রয়েছে ১২টি খাল ও ৫৪টি ঝিরি। এ নদী তার অববাহিকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছিল।

গত কয়েক দশক ধরে স্থানীয়দের লোভ-লালসায় নদীর অববাহিকায় পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেছে। লামা ও আলীকদমের পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝিরি খুঁড়ে বিধিবহির্ভূতভাবে পাথর আহরণ অব্যাহত থাকার বিরূপ প্রভাব পড়েছে নদীর ওপর। নিয়ম বহির্ভূতভাবে পাহাড় কেটে এবং খুঁড়ে পাথর আহরণের ফলে বর্ষা মৌসুমে প্রবল বর্ষণের সময় এসব পাহাড়ের অংশ বিশেষ ধসে পড়ছে। ধসে পড়া পাহাড়ের বালু ও মাটি বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে মাতামুহুরী নদীতে গিয়ে পড়ায় নদী দ্রুত তার নাব্যতা হারিয়েছে।

অপরদিকে, আশির দশকে এতদঞ্চলে তামাক চাষ শুরুর মধ্য দিয়ে মাতামুহুরী নদীর ওপর দ্বিতীয় দফায় বিপর্যয় নেমে আসে। অতি মুনাফার লোভে মাতামুহুরী নদীর দুকূল কেটে চাষ উপযোগী করে তোলে তামাক চাষ করে স্থানীয় কৃষকেরা। বর্ষা মৌসুমে ওই সকল মাটি মাতামুহুরী নদীতে গিয়ে পড়ে নদীর বাঁকে বাঁকে কচ্ছপের পিঠের মতো অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। অস্বাভাবিকভাবে নাব্যতা হারানোর সুযোগে নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা নদীর তলদেশে বাদামসহ বিভিন্ন মৌসুমি তরিতরকারির চাষ করেছেন। একসময় যেখনে ছিল গভীর পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের বাস। এখন সেখানে পুরো নদীর তলদেশ জুড়ে শোভা পাচ্ছে সবুজ ফসলের মাঠ।

বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রিয়দর্শী বড়ুয়া জানান, ১৯৮০-৮৫ সালে মাতামুহুরী নদীর গভীরতা ছিল ৩০ থেকে ৪০ ফুট। কিন্তু গত এক দশকে ব্যাপক হারে পাথর আহরণ এবং নদীর তীর কেটে তামাক চাষের বিরূপ প্রভাবে এ নদী দ্রুত নাব্যতা হারিয়েছে।

নদী তীরবর্তী বাসিন্দা মো. নবীর উদ্দিন জানান, একসময় চকরিয়াসহ পার্শ্ববর্তী মানিকপুরের ব্যবসায়ীরা মালামাল আনা নেওয়ার সুবিধার্থে নদীপথ ব্যবহার করলেও বর্তমানে নদীর পানি কমে যাওয়ায় নৌ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া এ নদী নাব্যতা হারানোর কারণে সামান্য বৃষ্টিতে পানি ফেঁপে উঠে পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় নদী তীরবর্তী লামা পৌরশহরসহ লামা ও আলীকদম উপজেলার ব্যাপক জানমালের ক্ষতিসাধন হয়ে থাকে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে লামা, আলীকদম ও চকরিয়া উপজেলার দুই সহস্রাধিক জেলে পরিবার। গত কয়েক বছরে ব্যাপকহারে নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় মাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে এবং কৃষিজ সেচ কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।

বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রকিবুল হাসান জানান, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদী পুনরুদ্ধারের সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পর্কিত একটি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রকল্পটির কাজ শুরু হলেই নদী দুটির বর্তমান অবস্থার উন্নতি হবে।

প্রমত্তা মাতামুহুরীর তলদেশে এখন আর অথৈ পানি নেই। নেই জেলেদের জাল ফেলার সুযোগ। সর্বত্রই জেগে রয়েছে কচ্ছপের পিঠের মতো বালির চর। দ্রুত এ নদীর ড্রেজিংয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন স্থানীয়রা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা