kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

রমজানে বাজার তদারকি

নগরে জোরালো, গ্রামে টিলেঢালা!

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নগরে জোরালো, গ্রামে টিলেঢালা!

রমজান মাস ঘিরে চট্টগ্রাম নগরে চলছে বাজার তদারকি। নগরে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের পাশাপাশি র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) অভিযান চালিয়েছে। অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ে অভিযান চলছে ঢিলেঢালাভাবে। সেখানে বাজার তদারকি নিয়ে খুব বেশি কাজ হচ্ছে না। এর মধ্যে অবশ্য ব্যতিক্রম হাটহাজারী। সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন রীতিমতো ‘বাজিমাত’ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। ভেজাল ঘি, ভেজাল মসলা ও পচা চা পাতাসহ নানা পণ্যের ‘ভেজাল আবিষ্কারক’ হিসেবে নিজের কর্মের মাধ্যমে উপজেলাবাসীর মনে স্বস্তি এনেছেন।

নগরে রমজানের শুরুতেই কাঁচা মরিচের দাম বেড়েছিল। আর রমজানের প্রথম সপ্তাহে বাড়ে কলার দাম। কাঁচা মরিচের বাজার ও ফিরিঙ্গিবাজার কলার আড়তে অভিযান চালিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে এনেছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান। তিনি ঊর্ধ্বমুখী দামের নাগাল টেনেছেন আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে।

আবার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে নামার আগেই সক্রিয় ছিলেন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন। তিনি ভেজাল ঘিয়ের কারখানা, ভেজাল মসলা উৎপাদন, পচা চা পাতার কারখানা ‘আবিষ্কার’ করেন নিজ দায়িত্বে। এসব ভেজাল ভোগ্যপণ্যের কারখানা ‘আবিষ্কার’ করে যেন নিজেই হয়েছেন ‘ভেজাল আবিষ্কারক’!

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী রমজান মাস ঘিরে বাজার তদারকির অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা শুরু করে ২৮ এপ্রিল। ওই দিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ কায়সার খসরু এবং মো. আলী হাসান অভিযানের সূচনা করেন। এরপর অভিযানে নেতৃত্ব দেন পর্যায়ক্রমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইসমাইল হোসেন, মো. ফোরকান এলাহী অনুপম, তাহমিলুর রহমান, মাহফুজা জেরিন, রেজওয়ানা আফরিন, সাবরিনা আফরিন মুস্তাফা, শারমিন আখতার, মুশফিকীন নূর, সুরাইয়া ইয়াসমিন ও মো. তৌহিদুল ইসলাম।

এসব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নগরের হাট-বাজার ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদন কারখানায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে ১৬ মে পর্যন্ত জরিমানা আদায় করেছেন প্রায় আট লাখ ৯২ হাজার ৩০০ টাকা। এই অভিযান ২৬ মে পর্যন্ত চলমান থাকার কথা রয়েছে। আবার জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত চট্টগ্রামের স্বনামধন্য ভোগ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিযান চালিয়ে অন্তত ১০ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেন।

কী ধরনের ভেজাল পাওয়া যাচ্ছে বাজারে? এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান বলেন, ‘বাজারে ভেজাল ভোগ্যপণ্য পাওয়ার পাশাপাশি, পচাবাঁশি খাবার, মূল্য তালিকা না টাঙানো, ওজনে কম দেওয়া, ভোগ্য পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়াসহ নানা ধরনের অনিয়মের বিষয়ে অভিযান চলে।’

নগরের পর জেলার ১৬ উপজেলায় খোঁজ নিয়ে পাওয়া গেছে কিছুটা হতাশার চিত্র। সেখানে আশাব্যঞ্জক তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। শুধু ব্যতিক্রম পাওয়া গেছে হাটহাজারীতে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন জানান, বাজার মনিটরিংয়ে প্রায় তিন লাখ টাকার মতো জরিমানা আদায় এবং অন্তত ২০ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ভেজাল ঘি, চা, মসলার কারখানা আবিষ্কার, মসলা কারখানায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের লেবেল ছাপিয়ে দেশি মসলায় ব্যবহারসহ নানা অনিয়মের রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে।

উপজেলা পর্যায়ে বাজার তদারকি ঢিলেঢালা কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তাঁরাও সক্রিয়ভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও জরিমানা করছেন। বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার দাবি করেন, ‘আমি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। এই পর্যন্ত প্রায় এক লাখ টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে।’

বোয়ালখালী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) একরামুল ছিদ্দিক বলেন, ‘ঢিলেঢালা নয়, জোরদারভাবেই বাজার মনিটরিং হচ্ছে।’

সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরুল হুদা বলেন, ‘আমি এই মুহূর্তে ট্রেনিংয়ে ঢাকায় আছি। উপজেলায় সহকারী কমিশনার নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন।’

আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ জোবায়ের আহমেদ বলেন, ‘আনোয়ারায় বাজার মনিটরিং জোরদার আছে। এই পর্যন্ত লক্ষাধিক টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।’

নগরের চেয়ে উপজেলা পর্যায়ে বাজার তদারকিতে ঢিলেঢালাভাব কেন জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘উপজেলায় ঢিলেঢালা নয়, সেখানেও সক্রিয়ভাবে অভিযান চলছে। তবে উপজেলা পর্যায়ে বাজারের সমস্যা নগরের চেয়ে কম। সেখানকার অবস্থা ভালো আছে।’

এবার টার্গেট কাপড়ের মার্কেট : রমজানের শুরু থেকেই বাজার তদারকি জোরদার করেছিল জেলা প্রশাসন। ১৫ রমজান থেকে কাপড়ের দোকান মনিটরিং করবে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভোক্তা অধিকার আইনে এই অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘রমজান শুরুর আগেই বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছিল। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা একাধিক অভিযান চালিয়েছেন। জেলা প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকার কারণে বাজারমূল্য লাগামছাড়া হতে পারেনি। কলা ও মরিচের দাম কিছুটা বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন অসাধু ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ। কিন্তু দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। এই কারণে নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে বাজার মূল্য।’

‘ভেজাল আবিষ্কারক’ রুহুল আমিন : দেশি বিদেশি ব্রান্ডের নানা কম্পানির মসলা পাওয়া যায় হাটহাজারীতে। আবার দেশি ব্র্যান্ডের বাঘা বাড়ি থেকে নামিদামি ব্র্যান্ডের ঘি পাওয়া যায় হাতের কাছেই। রকমারি চা  আপাতত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, হাটহাজারীর ভোক্তাদের দামি ব্র্যান্ড ও বিদেশি পণ্যের প্রতি জোক বেশি। কিন্তু বাস্তবতা বুঝিয়েছেন রুহুল আমিন। তিনি ঘি, মসলা কিংবা চা-কারখানায় গিয়ে ‘আবিষ্কার’ করেছেন সব ভুয়া ও নকল লেবেল। বাঘা বাড়ি ঘি নামে লেবেল ছাপা হয়, কিন্তু উৎপাদন হয় ভেজাল। মসলা কারখানা থেকে দেশি বিদেশি ব্র্যাণ্ডের নাম লেখা লেবেল উদ্ধার করলেন, আর মসলা ফেলেন ভেজাল। একইভাবে পচা চা পাতা পেলেন বস্তায় বস্তায়। অথচ লাখো ভোক্তা এতোদিন ধরে কথিত

দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্যই কিনছিলেন।

উপজেলা পর্যায়ে রুহুল আমিন ছাড়া অন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা ঢিলেঢালা কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘রুহুল আমিন আলাদা। তাঁর কাজের প্রশংসা করতেই হয়। কাজ পাগল রুহুল আমিন ভালোই করছে। আর অন্য উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারাও ভালো করছেন। তবে নগরের চেয়ে উপজেলার বাজার পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো আছে। এ ছাড়া নগরের প্রবেশদ্বারখ্যাত হাটহাজারী, পটিয়া, কর্ণফুলী কিংবা সীতাকুণ্ডের দিকে আমাদের বাড়তি নজর থাকেই।’

মন্তব্য