kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

কিশোর খুনিদের ভুল শিকার রিকশাচালক রাজু

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

১৭ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কিশোর খুনিদের ভুল শিকার রিকশাচালক রাজু

ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার মাদক কারবারি ছগির হোসেন কারাগারে বসে বসে ভাবলেন, পুলিশকে তথ্য দিয়ে তাঁকে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন সহযোগী মফিজ। তাই মফিজকে খুন করতে হবে। তিনি সেই চিন্তা বাস্তবায়ন করতে সহযোগী হিসেবে পাশে পান স্ত্রী সেলিনাকে। কারাগারে দেখা করতে যাওয়া স্ত্রী ও একদল কিশোরকে দায়িত্ব দিলেন মফিজকে খুন করার। আর কিশোরের দল ‘বীরদর্পে’ কুপিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করল মফিজকে। কিন্তু ঘটনার দিন তারা মফিজের ঘরে ভুলে না ঢুকে গেল রিকশাচালক রাজুর ঘরে। এদের কিরিচের কোপে প্রাণ গেল নিরীহ রাজুর।

খুনের সঙ্গে জড়িত আট কিশোর চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে রাজু হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে যা উল্লেখ করেছে, তাতেই কারাগারে বসে হত্যার নির্দেশনা ও খুনি কিশোর দলের এমন ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের চিত্র উঠে এসেছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে নগর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে রিকশাচালক রাজু আহম্মেদ খুনের রহস্য উন্মোচন, আট আসামি গ্রেপ্তার এবং খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য জানান নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম। এরপর আসামিদের আদালতে সোপর্দ করা হয়। সেখানে চার আসামি নিজদের দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম খায়রুল আমিন ও আল ইমরানসহ চারজন হাকিম কিশোর অপরাধীদের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন।

গ্রেপ্তারকৃতরা হল মিরসরাই থানার মিঠাছড়া গ্রামের উত্তম দাশের ছেলে শিমুল দাশ (২০), লক্ষ্মীপুর সদর থানার সয়দাবাদ গ্রামের মো. বেলায়েত হোসেনের ছেলে তানভীর হোসেন সিফাত (১৮), ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা থানার মঈনপুর গ্রামের মৃত মো. দুলালের ছেলে মো. সুজন (১৮), হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর থানার আন্দুরা গ্রামের মো. আমির হোসেনের ছেলে মো. রাকিব হোসেন (১৮) ও মন্দাবাগ গ্রামের মো. বাছিরের ছেলে মো. নুর নবী (১৮), ডবলমুরিং থানার পানওয়ালাপাড়ার মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে মেহেদী হাসান রুবেল (১৮), হাজিপাড়ার মো. ছগির হোসেনের ছেলে ওসমান হায়দার কিরণ (১৮) ও ছগির হোসেনের স্ত্রী সেলিনা আক্তার শেলী (৪৫)।

উল্লেখ্য, গত ১৪ মে ডবলমুরিং থানার হাজিপাড়া এলাকার একটি বাসা থেকে রিকশাচালক মো. রাজুকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাজুকে মৃত ঘোষণা করেন।

সংবাদ সম্মেলন ও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে আসামিরা প্রায় অভিন্ন তথ্য দিয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আমেনা বেগম বলেন, ‘রাজু হত্যাকাণ্ডের পর ডবলমুরিং থানা পুলিশ ৪৮ ঘণ্টা ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে আট আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।’

হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আমেনা বেগম জানান, গত ২৭ এপ্রিল ইয়াবা ও অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান মাদক কারবারি ছগির হোসেন। তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার পর সন্দেহ করেন, তাঁর সহযোগী মফিজ তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। এ কারণে ছগির হোসেন কারাগারে বসে মফিজকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ছগির হোসেন গ্রেপ্তার হওয়ার পাঁচ দিন পর কারাগারে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান স্ত্রী সেলিনা আক্তার ও আসামি কিরণসহ কয়েকজন। ছগির হোসেন তখন মফিজকে  চিরতরে শেষ করে দিতে নির্দেশনা দেন।

ছগির হোসেনের এমন নির্দেশনার পর তাঁর স্ত্রী সেলিনা আক্তারের সহযোগিতায় আসামিরা মফিজকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৩ মে সেলিনা আক্তার আসামি শুক্কুরকে ১ হাজার টাকা দেন। ছগির হোসেনের ছেলে ওসমান হায়দার কিরণ একটি কিরিচ দেন। পরদিন ১৪ মে আসামিরা সবাই হাড্ডি কম্পানি মোড়ে রুবেলের টং দোকানের সামনে জড়ো হয় এবং ছগিরের ছেলে কিরণ, আসামি শুক্কুর, শিমুল, রাকিব, সিফাত সেখানে উপস্থিত ছিল। সেখানেই খুনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় এবং কার কী দায়িত্ব, সেটা নিজেরা ভাগ করে নেয়। এরপর রাত ১১টায় রাকিব বাসায় ফিরে যায়। অন্যরা একসঙ্গে অবস্থান নেয়।

ফজরের নামাজের পর আসামি শিমুল, শুক্কুর, রাকিব, সিফাত, সুজন মফিজের ভাড়া ঘরে প্রবেশ করে। বাইরে অবস্থান নিয়ে পাহারা দেয় নুর নবী ও রুবেল। মফিজ যে ঘরে থাকে, সেখানে একাধিক কক্ষ আছে। আসামিরা মফিজের কক্ষ মনে করে রিকশাচালক রাজু আহম্মেদের কক্ষে প্রবেশ করে এবং অন্য কক্ষগুলো বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়। আর রাজু আহম্মেদের কক্ষে প্রবেশ করেই অন্ধকারে এলোপাতাড়ি কিরিচ দিয়ে কোপায় রাজুকে। এর পর তারা পালিয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডের সময়ই পাশের রুমে মফিজ ছিলেন। কিন্তু বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার কারণে তিনি বের হতে পারেননি।

নিহত রিকশাচালক রাজু আহমেদ ছিলেন হাজিপাড়ার চান মিয়ার ছেলে। একসময় প্রহরী ও ভ্যানগাড়ি চালাতেন তিনি। বাস্তুহারা কলোনিতে জন্ম নেওয়া রাজু আহমেদ (২০) তাঁর ভিক্ষুক মাকে হারিয়েছেন কয়েক মাস আগে। এর আগেই বাবা মারা যান। এক ভাই প্রতিবন্ধী।

ডবলমুরিং থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জহির হোসেন বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতরা কিশোর অপরাধী। ছগির হোসেন এলাকায় কিশোরদের নিয়ন্ত্রণ করেন। তারাও ইয়াবা সেবন করে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা