kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

বর্ণিল বৈশাখে প্রাণের উচ্ছ্বাস

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বর্ণিল বৈশাখে প্রাণের উচ্ছ্বাস

চট্টগ্রাম নগরের ডিসি হিলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে নৃত্য

পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসবে মেতেছিল বন্দরনগর চট্টগ্রাম। বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন রবিবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নগরজুড়ে শুরু হয় বৈশাখী অনুষ্ঠান। এসব অনুষ্ঠান ঘিরে ছিল সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের বাঁধভাঙা জোয়ার। সব জনস্রোত মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে। বাঙালির নানা সাজে সবাই মেতে ওঠেন।

গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহ উপেক্ষা করে দিনভর বৈশাখী অনুষ্ঠানগুলো ছিল লোকেলোকারণ্য। মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ বর্ণাঢ্য আয়োজনে মুখর অনুষ্ঠান। নগরের নজরুল স্কয়ার (ডিসি হিল) থেকে সিআরবি শিরিষতলা, শিল্পকলা একাডেমি, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, কর্ণফুলী নদীর পাড়, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবসহ চারদিকে শুধু বৈশাখী উৎসব। এসব অনুষ্ঠান ঘিরে বসে মেলা। এ ছাড়া পথে পথেও কম ছিল না বৈশাখের আয়োজন। সেই সঙ্গে নগরের অভিজাত-তারকা হোটেল-রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে পান্তা-ইলিশ আর আবহমান বাংলার নানা স্বাদের মুখরোচক খাবারের স্বাদ গ্রহণে ছিল ভিড়।

এদিকে বৈশাখের সকল অনুষ্ঠান ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থার নিশ্ছিদ্র্র নিরাপত্তা ছিল। মানুষের ঢল সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে প্রশাসনকে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে নানা অনুষ্ঠানে বাংলা নববর্ষ ১৪২৬’র প্রথম দিন উদযাপন করেছে চট্টগ্রামবাসী। বর্ণিল পোশাকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বছরের প্রথম দিনটিতে যেন নগরজুড়ে রঙে যেন আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। দিনভর চট্টগ্রামবাসী মেতে ওঠেছিল আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে।

নগরে বৈশাখের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও মেলা ঘুরে দেখা যায়, আবহমান বাংলার চিরাচরিত ঐতিহ্য আর বৈশাখের আবহ ধরে রাখতে মুড়ি-মোয়া-মণ্ডা-মিঠাই থেকে শুরু করে হরেক রকমের খাবারের পাশাপাশি ছিল বিভিন্ন সামগ্রী। খাবারের সঙ্গে মেলায় পুতুল-বাঁশি-হাঁড়ি-পাতিল এসবের প্রতিও ছোটদের আদুরে আবদার ছিল বড়দের কাছেও। অনুষ্ঠানে নাচ-গানের সঙ্গে কথামালা ছিল। কেউ সাধু ভাষায় আবার কেউ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বৈশাখের নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। তীব্র গরমের কারণে ডাব, আইসক্রিমসহ পানীয়ের প্রতি চাহিদা বেশি ছিল। এ ছাড়া একে অন্যের সঙ্গে নববর্ষের প্রথম দিন ‘শুভ নববর্ষ’ বলে করমর্দন, কোলাকুলি করে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছে।

তবে এবারও নগরের প্রধান দুই অনুষ্ঠানস্থল ছিল ডিসি হিল এবং সিআরবি শিরিষতলা। পাহাড়-সমতলে ঘেরা এই দু্ই এলাকায় লাখো মানুষের সমাগম হয়েছে। ভিড়ের কারণে আশপাশে বেশ কয়েকটি সড়ক-উপসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। যেখানে বৈশাখী অনুষ্ঠান, এর আশপাশে ছিল যানজট।

ডিসি হিলে সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদের আয়োজনে বর্ষবরণের উৎসবের সূচনা হয় ‘সূচি অঙ্গন বাংলাদেশ’ এর শিল্পীদের ভৈরবী রাগের ধ্রুপদী সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। এরপর একে একে দলীয় সংগীত পরিবেশন করে সংগীত ভবন, রক্তকরবী, ছন্দানন্দ, সুর সাধনা,  শৈশব, সুজামি সাংস্কৃতিকসহ আবৃত্তি, নৃত্য সংগঠনের একক ও দলীয় পরিবেশনা। আয়োজকরা জানান, ঐতিহ্যের ধারা বজায় রেখে এবার ৪১তম বারের মতো চট্টগ্রামের ডিসি হিলে বাংলা বর্ষবরণের এ অনুষ্ঠান হয়েছে। সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ এবং আগামীতে সুন্দর জীবনের প্রত্যাশা করা হয়। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘বাংলাদেশ অসামপ্রদায়িক দেশ, পহেলা বৈশাখ সর্বজনীন উৎসব, সবার প্রাণের উৎসব। নতুন বছরে আমি সকলের কল্যাণ কামনা করি।’

এর প্রায় এক কিলোমিটার দূরে সিআরবি সাতরাস্তার মোড়ের শিরিষতলা। নগরের অন্যতম প্রধান এই বৈশাখী অনুষ্ঠান ভায়োলিনিস্ট চিটাগাং নামের একটি সংগঠনের বেহালাবাদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। গানে-নাচে উৎসবমুখর পাহাড়ঘেরা নৈসর্গিক সিআরবি এলাকায় সকাল থেকে মানুষের ভিড় ছিল। দুপুরের পর থেকে দিনভর সেখানে জনসমুদ্র পরিণত হয়। সিআরবি এলাকার বৈশাখী অনুষ্ঠানের পাশে পাহাড়ের পাদদেশে বিকেলে অনুষ্ঠিত হবে সাহাবুদ্দিনের বলীখেলা। তা দেখতে হাজারও মানুষের ভিড় ছিল। বিকেল তিনটা থেকে ঘণ্টাব্যাপী এই বলীখেলায় বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ৫১ জন বলী অংশ নেয়। দুই রাউন্ডে বিভক্ত খেলায় প্রথম রাউন্ড থেকে ৪৩ জন বিদায় নেন। আর মূল পর্বে অংশ নেন আটজন। তাঁদের মধ্যে যুগ্মভাবে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন কক্সবাজারের চকরিয়ার বাদশা ও কুমিল্লার শাহজাহান।

এদিকে ‘কর্ণফুলী বাঁচলে এই জনপদ বাঁচবে, বাঙালির অস্তিত্ব বাঁচবে’ স্লোগানে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী বাঁচানোর দাবি নিয়ে এবার ব্যতিক্রমধর্মী মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট। গত রবিবার সকাল ১০টায় নগরের বাদশা মিঞা সড়কে চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের হওয়া বর্ণাঢ্য এই মঙ্গল শোভাযাত্রা বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এতে র‌্যাব-পুলিশের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেস্টনী ছিল। কাঠ আর কাগজ দিয়ে বানানো বড় আকৃতির সাম্পান, মাছ, পেঁচা ও হাঁসের প্রতিকৃতি ছিল শোভাযাত্রার সামনে-পেছনে। হাতে হাতে ছিল ব্যানার-ফেস্টুন, মুখোশ। ঢোলবাদ্য বাজিয়ে, নেচে গেয়ে হাজারো শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন। তবে শোভাযাত্রায় এবার বাড়তি অনুষঙ্গ ছিল- সবার কপালে ‘নুসরাত হত্যার বিচার চাই’ লেখা কালো কাপড়।

একইদিন সকাল সাড়ে ৯টায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সামনে থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। এ সময় সবাই নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছিলো বৈশাখের সাজে। শোভাযাত্রা নগরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। এরপর সেখানে অনুষ্ঠিত হয় অনুষ্ঠান। এতে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. আব্দুল মান্নান, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার শংকর রঞ্জন সাহা, দীপক চক্রবর্তী, নুরুল আলম নিজামী, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা, চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া শিল্পকলা একাডেমিতে দিনব্যাপী চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

নগরের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়াম সংলগ্ন চসিক আয়োজিত বৈশাখী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। করপোরেশনের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা সুমন বড়ুয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্যানেল মেয়র কাউন্সিলর চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, কাউন্সিলর এইচ এম সোহেল, শৈবাল দাশ সুমন ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ বিশেষ অতিথি ছিলেন।

এদিকে সিএমপি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এক্স স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে সাবেক মন্ত্রী ডা. আফছারুল আমীন এমপি বলেন, ‘আনন্দ-উল্লাসে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকল বাঙালির জাতীয় উৎসব এই পহেলা বৈশাখ।’

অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. নাজমুল হায়দারের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ফারুকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিল সিএমপি উপ-কমিশনার (সদর) শ্যামল কুমার নাথ।

যুব রেড ক্রিসেন্ট, চট্টগ্রামের আয়োজনে প্রথমবারের মতো বৈশাখী উৎসব হয়েছে। মো. ইসমাঈল হক চৌধুরী ফয়সালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চসিক মেয়র ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি চট্টগ্রাম সিটি ইউনিটের চেয়ারম্যান আ জ ম নাছির উদ্দীন। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটের ভাইস-চেয়ারম্যান ডা. শেখ শফিউল আজম, সিটি ইউনিটের ভাইস-চেয়ারম্যান এম এ সালাম।

 

সিআরবির শিরিষতলায় দলীয় সংগীত পরিবেশনা (বাঁয়ে) এবং রাউজানে মঙ্গল শোভাযাত্রা।  ছবি : রবি শংকর জাহেদুল আলম

মন্তব্য