kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

স্বামী পাড়ি জমান বিদেশে

নববধূর ঠাঁই রান্নাঘরে, কৌশলে আটকে রেখে ধর্ষণ!

বোয়ালখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি   

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিয়ের পর এক গৃহবধূর ঠাঁই হয়েছে রান্নাঘরে। দারিদ্র্যে জর্জরিত পরিবারে বেড়ে উঠা ওই গৃহবধূর পরিবার মেয়ের সুখের আশায় বিয়ে দেয় এক প্রবাসীর কাছে। যেখানে স্বামীর ভালোবাসা পাওয়ার কথা ছিল। উল্টো সেখানে স্বামীর ভাগ্নের লালসার শিকার হতে হয়েছে অসহায় ওই গৃহবধূকে।

অবশেষে নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছেন ওই গৃহবধূ। গত বৃহস্পতিবার বোয়ালখালী থানায় তিনি নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনে এ মামলা দায়ের করেন।

গৃহবধূ জানান, ২০১৮ সালের ২৬ মে একদিনের কথায় বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া ইউনিয়নের আকুবদণ্ডী গ্রামের এক প্রবাসীর সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। বিয়ের দিন স্বামী একই গ্রামের তাঁর বোনের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে রান্নাঘরে ঠাঁই হয় তাঁর। এর আটদিনের মাথায় স্বামী বিদেশে পাড়ি জমান।

বোনের বাড়ির গরুর ঘাস কাটা থেকে শুরু করে ঘরের সমস্ত কাজকর্ম তাঁকে দিয়ে করানো হত। স্বামীর সঙ্গেও যোগাযোগ করতে দেওয়া হত না। ২০১৮ সালের ১০ জুন স্বামীর ভাগ্নে কাজী আবদুল জলিল রাত ১১টার দিকে রান্নাঘরে ধর্ষণ করেন। তাঁর শোর চিৎকারে ঘরের সবাই আবদুল জলিলের পক্ষ নিয়ে গালমন্দ করে এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। এরপর থেকে দফায় দফায় বিভিন্ন সময়ে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন করে আসছিলেন জলিল। সর্বশেষ ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে আবারও ধর্ষণের শিকার হন। এর পরদিন মায়ের সঙ্গে দেখা হলে ঘটনার বিষয়ে জানান ওই গৃহবধূ।

স্থানীয়রা জানান, মেয়েটির বাবা দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতেন। এক দুর্ঘটনায় তিনি পঙ্গু হয়ে পড়লে মেয়েটির মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসারের হাল ধরেন। আর্থিক সংকটের কারণে ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা করাতে পারেননি। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মেয়েটি বড়। এর মধ্য হঠাৎ উচ্চবিত্ত শিক্ষিত পরিবার থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয় বিয়ের। খোঁজ-খবর বা পরামর্শের সুযোগ না দিয়ে ওই দিনই মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন ওই প্রবাসী স্বামীর ভাগ্নে আবদুল জলিল। তাঁদের আপ্যায়নের সুযোগও তাঁরা দেননি। কাজী নিজেদের ঘরে রয়েছে জানিয়ে ওই দিন আক্দ ও দুই লক্ষ টাকার কাবিননামা সম্পন্ন করেন তাঁরা। বিয়ের পর থেকে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে কাউকে যেতে দেওয়া হয়নি। এমনকি মা বাপের যাওয়া নিষেধ ছিল। আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন না তাঁরা। মেয়েটিকে বাড়ির সমস্ত কাজকর্ম করাতেন আর বাড়ির কাজের মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিতেন প্রতিবেশীসহ আত্মীয়স্বজনদের কাছে। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই প্রবাসীর আরো দুই স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। 

মেয়েটির মা বলেন, ‘কোনোদিন সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের দেখা পাইনি। তাই এতো বড়লোক পরিবার থেকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ায় না করতে পারিনি। দিনের পর দিন তারা আমার মেয়ের যে সর্বনাশ করেছে তা মুখে বলে শেষ করা যাবে না। আমরা গরিব মানুষ, দিনে এনে দিনে খাই। ওরা এতো খারাপ মানুষ বুঝতে পারিনি। মেয়েকে দেখতে গেলে বিভিন্ন রকম হুমকি ও চোর অপবাদ দিয়ে তাড়িয়ে দিতে। মেয়ে পড়ালেখা জানে না, তারা যা বলেছে তাই বিশ্বাস করত। পরবর্তীতে অনেকটা জোর করে মেয়ের সঙ্গে দেখা করলে মেয়ে ধর্ষণের ঘটনা জানায়। এ বিষয়ে তাদের জানালে তারা হুমকি ধমকি ও মামলা দেওয়ার ভয় দেখায়।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিয়ে করেছে মেয়ে সংসার করবে স্বামীর সঙ্গে এইতো নিয়ম। তবে এ নিয়মের কোনো বালাই নেই ওই পরিবারে। নিজের কোনো কক্ষও ছিল না তার। নামে স্বামী ছিলে, কয়েকটি পুরনো কাপড় আর রান্নাঘরই ছিল মেয়ের সংসার। অল্প বয়সের মেয়ে, লেখাপড়া জানে না। স্বামী শিক্ষিত, বড় লোকের ছেলে। কত স্বপ্ন দেখেছিল মেয়েটি। সবই স্বপ্ন রয়ে গেল বরং কপালে জুটল শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এসব সয়ে সয়ে মেয়েটি এখন পাগলপ্রায়।’ 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পোপাদিয়া ইউনিয়নের আকুবদণ্ডী গ্রামের শরীয়ত উল্লাহর ছেলে কাজী আবদুল জলিল (৩৫)। তিনি পেশায় পোপাদিয়া ইউনিয়নের নিকাহ্ রেজিস্ট্রার ও একটি মসজিদের খতিব। এ ছাড়া তাঁদের টাইলস ও স্যানিটেশনের ব্যবসা রয়েছে।

বোয়ালখালী থানার উপ-পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ওবাইদুল ইসলাম বলেন, ‘মেয়ের মায়ের মুখে এ লোমহর্ষক ঘটনা শুনে গত ১১ এপ্রিল সন্ধ্যায় শ্বশুরবাড়ি থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি। পরবর্তী মেয়ের স্বীকারোক্তি মতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করা হয়েছে। আসামি গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

মন্তব্য