kalerkantho

‘টুকটাক’ গ্রেপ্তার হবেন বিরোধী নেতাকর্মীরা

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা ‘টুকটাক’ গ্রেপ্তার হবেন। তবে সিনিয়র নেতাদের গ্রেপ্তার এড়িয়ে সমালোচনা সৃষ্টির পথ বন্ধ রাখতে হবে। যাতে গ্রেপ্তার অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন নির্দেশনা পেয়ে নগর পুলিশ গ্রেপ্তার অভিযান চালাচ্ছে মাঠপর্যায়ে। তবে এ ক্ষেত্রে মামলা এবং ওয়ারেন্ট থাকা নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ বিএনপি নেতাকর্মীদের চেয়ে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের ধরপাকড় অধিক হারে চলবে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের ওই নির্দেশনার পর মাঠপর্যায়ে যে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ সেই অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত তালিকায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়া নেতাকর্মী রয়েছেন বলে জানা গেছে। নগর বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মো. ইদ্রিস আলী দাবি করেছেন, ‘উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়া বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল নেতাকর্মীদের বাসা-বাড়িতে তল্লাশি ও গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। তাঁদের অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে।’ এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে নির্বাচন কমিশনে নগর বিএনপি রবিবার স্মারকলিপি দিয়েছে বলেও তিনি জানান।

গত সোমবার চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের দায়িত্বশীল কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ এ বিষয়ে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করে কালের কণ্ঠের কাছে মন্তব্য করতে রাজি হননি। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর প্রথমে গ্রেপ্তার বন্ধ এবং পরে পুনরায় গ্রেপ্তার অভিযানের নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়ে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা মুখ খুলছেন না।

তবে তাঁদের একজন বলেছেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই মামলা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে তাদের গ্রেপ্তারে বাধা নেই।’ তিনি বলেন, ‘জামায়াত-শিবির গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রাখবে। তবে রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ সতর্ক থাকবে। যাতে সমালোচনা না হয়।’

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ১০ নভেম্বর চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে ‘গ্রেপ্তার আপাতত বন্ধ’ রাখার মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কয়েকটি থানার অফিসার ইনচার্জ এ ধরনের নির্দেশনা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিতও করেছিলেন। সেই আদেশের পর ১০ নভেম্বর থেকে প্রায় এক সপ্তাহ চট্টগ্রাম নগর ও জেলা পুলিশ বিরোধী দল তথা বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ব্যাপকহারে ধরপাকড় করেনি। কিন্তু চলতি সপ্তাহে পুনরায় বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার শুরু হয়েছে।

এর মধ্যে গত শনিবার সকালে বাকলিয়া থানা পুলিশ ইমাম হোসেন (৪৫) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে। তিনি ১৮ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির বলে জানিয়েছেন বাকলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ প্রণব চৌধুরী। তাঁর বিরুদ্ধে নাশকতার তিনটি মামলা আছে এবং তাঁর বাসা থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রচারপত্রসহ উগ্রবাদী বই পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানায়। ইমাম হোসেন গ্রেপ্তারের পরদিন রবিবার কর্ণফুলী থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে বিএনপিকর্মী আবদুর নূরকে (৪৫)। তাঁকে নাশকতার মামলায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্ণফুলী থানার অফিসার ইনচার্জ আলমগীর মাহমুদ। এছাড়া চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আবুল বাসার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মোহরার যুবদল ক্যাডার আনিচুর রহমান আনোয়ারা এবং মো. নূরু মেম্বারকে রবিবার সন্ধ্যায় গ্রেপ্তারের পর সোমবার আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।’

একইদিন সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আফসার উদ্দিন চৌধুরীকে। তিনি চট্টগ্রামের দৈনিক কর্ণফুলীর সম্পাদক। তাঁকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (দক্ষিণ) জাহাঙ্গীর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নাশকতার মামলায় আফসার উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা নেই। তবে চকবাজার থানায় দায়ের করা নাশকতার মামলায় অজ্ঞাত আসামিদের মধ্যে তিনিও আসামি বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে। তাই সোমবার আফসার উদ্দিন চৌধুরীকে চকবাজার থানায় সোপর্দ করা হয়। চকবাজার থানা পুলিশ নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁকে আদালতে সোপর্দ করে।’

বিএনপি নেতাকর্মীদের পুলিশ অব্যাহতভাবে গ্রেপ্তার করছে বলে দাবি করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মো. ইদ্রিস আলী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশ গ্রেপ্তার বন্ধ করেনি। বরং উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়া নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করছে’। তিনি বলেন, ‘উচ্চ আদালত থেকে জামিনে থাকার পরও চান্দগাঁও থানা পুলিশ ১৪ নভেম্বর চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল নেতা জমির উদ্দিন মানিক ও জাহাঙ্গীর আলম বাবুলকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁদের অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায়। একইভাবে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে থাকা কমার্স কলেজ ছাত্রদল নেতা সাইফুদ্দিন কামরান ও মো. নাজিম উদ্দিনকে ১৬ নভেম্বর কোতোয়ালী থানা পুলিশ জেলগেট থেকে গ্রেপ্তার করে। অথচ, আগামী ২৮ নভেম্বর কলেজে তাঁদের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। একই দিন পাঁচলাইশ থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে নগর যুবদল নেতা ওমর ফারুককে। ডবলমুরিং থানার মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়া যুবদল নেতা ওমর ফারুককেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ।’

এদিকে নগর জামায়াতের নায়েবে আমির আফসার উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের পর সোমবার বিবৃতি দিয়েছেন নগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ শাহজাহান, সেক্রেটারি মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির মুহাম্মদ জাফর সাদেক। তাঁরা দাবি করেন, আফসার উদ্দিন চৌধুরীকে বিনা অপরাধে আটক করে মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।

মন্তব্য