kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

যেভাবে তৈরি হলো

শিশুতোষ চলচ্চিত্র হলেও ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছোট-বড় সবারই প্রিয়। সেই সময় ছবিটি তৈরির প্রক্রিয়া মোটেই সহজ ছিল না। পদে পদে অনেক বাধা পেরিয়ে তৈরি হয়েছে ‘গুগাবাবা’। লিখেছেন লতিফুল হক

৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যেভাবে তৈরি হলো

১৯৬৩ সালে দাদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর জন্মশতবার্ষিকীতেই ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ করার কথা ভেবেছিলেন সত্যজিৎ রায়। মাথায় ছিল নিজের ১০ বছর বয়সী ছেলে সন্দীপের অনুযোগও—ছোটদের জন্য তুমি কোনো ছবি করোনি। তবে শেষ পর্যন্ত ছবিটা করতে করতে তিন বছর লেগে যায়। ১৯৬৭ সালে চিত্রনাট্য চূড়ান্ত করেন সত্যজিৎ। আগেই ঠিক করেছিলেন ছবিটা হবে সংগীতনির্ভর। সে জন্য চিত্রনাট্য দাঁড়া করানোর আগেই লিখে ফেলেন ছয়খানা গান! শুটিং শুরুর আগেই সেগুলো রেকর্ডও করা হয়।

ছবি শুরু করা থেকে মুক্তি পর্যন্ত একটার পর একটা ঝামেলা পোহাতে হয় সত্যজিৎকে। শুরুতেই গোল বাধে প্রযোজক নিয়ে। আগে আর ডি বনশলের প্রযোজনার কথা থাকলেও সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তিনি সরে যান। পরে অন্য একটা সংস্থার কাছে গেলে তারাও মুখ ফিরিয়ে নেয়। এগিয়ে আসেন বম্বের বিখ্যাত এক অভিনেতা-প্রযোজক। তবে শর্ত একটাই— প্রধান দুই চরিত্র করবেন তাঁর বাবা ও ভাই! পত্রপাঠ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন সত্যজিৎ। শেষমেশ ছবির দায়িত্ব নেয় পূর্ণিমা ফিল্মস। বাজেট ঠিক হয় চার লাখ রুপি। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই—টানা সাত মাস চলে শুটিং। সেই সময়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ছবির শুটিং নিয়ে কোনো আপস করেননি পরিচালক। ইনডোর ছাড়াও শুটিং হয় পশ্চিম বাংলার বীরভূম, হিমাচল প্রদেশের সিমলা এবং রাজস্থানের জয়সলমিরে। ঝামেলা বাধে মুক্তি নিয়েও। আগে ঠিক ছিল সেপ্টেম্বরে মুক্তি পাবে; কিন্তু সম্পাদনার কাজ শেষ না হওয়ায় সেটা পিছিয়ে যায় ডিসেম্বরে। তত দিনে ‘পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র সংরক্ষণ সমিতি’ করা নিয়ে পরিচালকদের মধ্যে ঝামেলা শুরু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বিভেদের কারণে ছবির মুক্তির তারিখ পাওয়া যাচ্ছিল না। এর মধ্যেই ছবিটির সেন্সর হয়, আমন্ত্রণ আসে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব থেকে। সত্যজিৎ পত্রিকার পাতায় ‘গুপী গাইন’-এর বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করেন। ১৯৬৯ সালের ৩ মে বেঙ্গল মোশান পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়ে ছবির মুক্তির জটিলতা কাটাতে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি নিয়ে বৈঠক হয়। ঠিক হয় ৮ মে মুক্তি। পরে আরেক দফা জটিলতা শেষে পূর্বঘোষিত দিনেই মুক্তি পায়। ‘গুপী গাইন’ নিয়ে সংবাদপত্রে মজার বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দিতে থাকেন পরিচালক। যেমন ৪ মে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে গুপী বাঘার ছবি দিয়ে লেখা ছিল, ‘এস / বাবা / এস!’ আরেকটি বিজ্ঞাপন ছিল এমন—

‘বুক / ধুক্-পুক!

পূর্ণিমা পিকচার্স নিবেদিত

গুপী গাইন বাঘা বাইন

সত্যজিৎ রায়ের ছবি

আজ থেকে বুক।’

১৯৬৯ সালের ৮ মে কলকাতার মিনার, বিজলি, ছবিঘর ও গ্লোব সিনেমায় মুক্তি পায় গুগাবাবা। গ্লোব ছবিটি চালায় ইংরেজি সাবটাইটেলসহ। তিনটি হলে চলে টানা ৩৩ সপ্তাহ। ১৬ মে কলকাতার সব পত্রিকায় ‘গুপী গাইন’-এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। দিনে দিনে ছবির গান জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। ছবির গানে কণ্ঠ দেন অনুপ ঘোষাল। এই ছবিতে গেয়েই তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান। ‘গুগাবাবা’র রেকডিংয়ের সময় অনুপ রবীন্দ্রভারতীতে এমএর ছাত্র, প্লেব্যাকের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। সত্যজিৎ হাতে ধরে শিখিয়ে দেন। পরে এক সাক্ষাৎকারে অনুপ বলেন, “তিনি আমাকে গল্পটি বুঝিয়ে গানের সিচুয়েশন বলে দিয়েছিলেন। গানের রিহার্সাল একটানা ২৪ দিন চলেছিল। প্রথম গেয়েছিলাম ‘ভূতের রাজা দিল বর’। গানটির মুখরা অংশের পর ভায়োলিনের সুর কি ভোলা যায়?” ছবির গানগুলোতে ভারতের সেরা যন্ত্রীরা অংশ নেন; যা জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা বলে মনে করেন অনুপ। তবে সত্যজিৎকে নিয়ে তাঁর একটা আক্ষেপও আছে, ‘সবাই সত্যজিৎকে দুনিয়ার অন্যতম সেরা নির্মাতা বলে থাকে। কিন্তু সুরকার হিসেবেও সে অসামান্য, সে কথাও উল্লেখ করা উচিত।’ সমালোচকদের মতে, ‘গুপী ট্রিলজি’তে সংগীতের ব্যাপক প্রভাব। তিন ছবিতেই ভারতীয় শাস্ত্রীয় ও লোকসংগীতের প্রতি সত্যজিতের আগ্রহ ও দখল বোঝা যায়।

দেশের মতো বিদেশেও সাড়া ফেলে ‘গুপী গাইন’। ১৯৬৯ সালের ২৬ জুন বার্লিন উৎসবে প্রতিযোগিতা বিভাগের ছবির প্রদর্শনী উদ্বোধনই হয় এ ছবি দিয়ে। সেবার উৎসবে সত্যজিতের সঙ্গে ছিলেন ছেলে সন্দীপ, প্রধান দুই অভিনেতা তপেন চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ এবং প্রযোজকরা।

 

জানা-অজানা

 

►  সত্যজিৎ চেয়েছিলেন গুপীর চরিত্রে কিশোর কুমারকে নিতে, ছবির গানগুলোও তাঁকে দিয়ে গাওয়াতে চেয়েছিলেন।

►  ‘চারুলতা’, ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’,  ‘নায়ক’ ইত্যাদি ছবি করার মধ্যেই একটু একটু করে ‘গুপী গাইন’ নিয়ে কাজ করেছেন সত্যজিৎ।

►  ১৯৮০ সালে মুক্তি পায় ছবিটির সিক্যুয়াল ‘হীরক রাজার দেশে’। ট্রিলজির শেষ কিস্তি ‘গুপী বাঘা ফিরে এলো’ মুক্তি পায় ১৯৯২ সালে। তবে ছবিটি সত্যজিৎ নন, পরিচালনা করেছেন সন্দীপ রায়!

►  ছবিটির হিন্দি ভার্সন করতে চেয়েছিলেন গুলজার। কিন্তু নানা কারণে শেষ পর্যন্ত হয়নি।

►  ছবিটির এনিমেটেড ভার্সন ‘গুপী গাওয়াইয়া বাঘা বাজেইয়া’ এ বছরই মুক্তি পাওয়ার কথা।

►  ১৯১৫ সালে ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর প্রথম আত্মপ্রকাশ। তখনো সত্যজিতের জন্ম হয়নি।

►  মুক্তির পর একটি প্রেক্ষাগৃহে টানা ৫১ সপ্তাহ চলেছিল ছবিটি। বাংলা ছবির ক্ষেত্রে যা একটি রেকর্ড।  অনেক দিন টিকে ছিল এই রেকর্ড।

►  ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘সেরা ফিচার ফিল্ম’ ও ‘সেরা পরিচালক’ পুরস্কার জেতে।

►  মূলত ১৯৬৭ সালে হলিউডের ফ্যান্টাসি ছবি প্রকল্প ভেস্তে যাওয়ার পর থেকেই ‘গুপী গাইন’ নির্মাণে উঠেপড়ে লাগেন পরিচালক।

►  ছবিতে বিখ্যাত ভূতের নাচের দৈর্ঘ্য সাড়ে ছয় মিনিট।

►  ২০০৩ সালে দি একাডেমি ফিল্ম আর্কাইভ ছবিটি সংরক্ষণ করে।

►  এটিই প্রথম বাংলা ছবি, যার শুধু গান নয় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, এমনকি ভূতের রাজার সংলাপ নিয়ে এলপি বের করেছিল এইচএমভি। ছবির গান নিয়ে রেকর্ড অনেক ছিল কিন্তু এলপি সেই প্রথম।

►  ভূতের রাজার চরিত্রে কণ্ঠ দেন সত্যজিৎ স্বয়ং! হাল্লা রাজা, শুণ্ডি রাজার পোশাক, তাঁদের সিংহাসন, মুকুট, বরফির কিম্ভূত কস্টিউম, চশমা, সবই পরিচালকের বানানো।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা