kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে

কার গান?

২০০৩ সালে ‘কৃষ্ণ’ অ্যালবাম প্রকাশের পর বেশ জনপ্রিয় হয় গানটি। কিন্তু বেশির ভাগ শ্রোতা, এমনকি গানের জগতের অনেকেই জানেন না গানটি কার। অনুসন্ধান করেছেন সৈয়দা আঁখি হক

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কার গান?

ভুল তথ্য বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বইয়েও

‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে, ফুলে পাইলা ভ্রমরা’ গানটি শোনেনি এমন বাঙালি কমই আছে। ২০০৩ সালে লন্ডনে প্রকাশিত ‘কৃষ্ণ’ অ্যালবামে শিল্পী কায়ার কণ্ঠে গানটি বেশ শ্রোতাপ্রিয় হয়। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ জানে না গানটির রচয়িতা সম্পর্কে। অনেকেই জানে, এটি বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গান। অনেক গায়ক বিভিন্ন মঞ্চে উঠে বাউলসম্রাটের নামই বলেন। যদিও জীবদ্দশায় বাউল আব্দুল করিম কখনোই গানটিকে নিজের বলে দাবি করেননি। ‘কৃষ্ণ’ অ্যালবামে অবশ্য কারো নামই দেওয়া হয়নি; ‘সংগ্রহ’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। জনপ্রিয় এই গানটির রচয়িতা সিলেটের দক্ষিণ সুরমার ধরাধরপুর গ্রামের সুফি কবি আরকুম শাহ [১৮৫১-১৯৪১]।

আরকুম শাহর জীবদ্দশায় ১৩৪৩ বঙ্গাব্দে [ইংরেজি ১৯৩৬] সিলেটি নাগরীলিপিতে ৯৪টি গান নিয়ে ছাপা হয় ‘হকিকতে সিতারা’। ১৩৮১ বাংলায় প্রকাশিত সংকলনের ৭৬ পৃষ্ঠায় গানটি ছাপা হয়। ২০১৭ সালে প্রকাশিত আমার লেখা ‘আরকুম শাহ : জীবনদর্শন ও গীতিবিশ্ব’ বইয়েও আছে গানটি। এখানে ‘জাপানি ভাষায় অনূদিত পাঁচটি গান’ অধ্যায়ে ছাপা হয় অনুবাদ করা গানটি। আরকুম শাহর গানটি ভুল কথায়ও গাইছেন অনেকে। সঠিক পাঠ এখানে তুলে ধরলাম—

 

কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে, ফুলে পাইলা ভ্রমরা

ময়ূর বেশেতে সাজইন রাধিকা

চুয়া চন্দন ফুলের মালা, সখীগণে লইয়া আইলা

কৃষ্ণ রাধার গলে দিলা, বাসর হইল উজালা

কৃষ্ণয় দিলা রাধার গলে, রাধায় দিলা কৃষ্ণর গলে

অদলও বদল করি, আনন্দে করইন খেলা

চুয়া চন্দন ছিটাইলা, সুগন্ধেতে মোহিত উজালা

আনন্দে সখীগণ নাচে, দেখিয়া প্রেমের খেলা

কৃষ্ণ প্রেমের প্রেমিক যারা, নাচে গায়ে খেলে তারা

কুলমানের ভয় রাখে না, ললিতা আর বিশাখা

পাগল আরকুম বলে পুরুষ-নারী, হস্তে হস্তে ধরাধরি

বৃন্দাবন আজ এশেকর ঝড়ি, খেলিতেছে প্রেমের পাশা

 

সাধারণ শ্রোতা ভুল করতে পারেন। কিন্তু বাংলা একাডেমি কিভাবে ভুল করল! ২০১৪ সালে একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা সিলেট’ বইটির ১৯৮ পৃষ্ঠায় শাহ আব্দুল করিমের নামে পাঁচটি গান রয়েছে। শুধু এই গানটি সম্পর্কিত তথ্যই নয়, ভুল আছে বইটির পদে পদে। ক অধ্যায়ের ৪ নম্বর গান ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে’ ছাপা হয় শাহ আব্দুল করিমের নামে। তাঁর জীবদ্দশায় ২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘শাহ আব্দুল করিম রচনা সমগ্র’তে কিন্তু গানটি নেই। একজনের গান অন্যের নামে গাইলে তিনি বরাবরই প্রতিবাদ করতেন।

খ অধ্যায়ের ১৬৮ পৃষ্ঠায় ‘মাটির পিঞ্জিরায় সোনার ময়না রে’ ৩৪ নম্বর গানটি ছাপা হয়েছে দুধু মিয়ার [যদিও তাঁর নাম দুদু মিয়া] ভণিতায়। কিন্তু গানটি আছে ‘শাহ আব্দুল করিম রচনা সমগ্র’র ৮৮ পৃষ্ঠায়।

গ অধ্যায়ের ২০১ পৃষ্ঠায় ‘সিলেটের বাইরের কবি কর্তৃক রচিত যেসব সংগীত সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত’ শিরোনামে ৪ নম্বর গান ‘প্রাণবন্ধু আসিতে সখী গো’। গানটি ‘শাহ আব্দুল করিম রচনা সমগ্র’তে ১১৭ পৃষ্ঠায় রয়েছে। অতি পরিচিত গানটি কিভাবে অন্য জেলার হয়?

ঘ অধ্যায়ের ২০১ পৃষ্ঠায় ৬ নম্বর গান ‘নির্জন যমুনার জলে, বসিয়া কদম্ব তলে’। এই গানটির সঠিক পাঠ হলো— ‘নির্জন যমুনার কূলে’।

ঙ অধ্যায়ে ২০০ পৃষ্ঠায় ‘দুর্বিন শাহ, অন্যান্য সংগীতের মধ্যে রয়েছে’ শিরোনামে আটটি গানের মধ্যে শুধু দুটি গান দুর্বিন শাহর। বাকি ছয়টি বিভিন্নজনের। এ ছাড়া অসংখ্য ভুল তথ্য, পাঠবিকৃতিসহ বানান ভুল রয়েছে বইটিতে। এসব বিষয়ে কথা হয় বইটির প্রধান সম্পাদক ও বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলগুলো সংশোধন করা উচিত। আমি বাংলা একাডেমিতে এ বিষয়ে আলাপ করব।’

আরো কথা হয় বাংলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ভুল তো মানুষেরই হয়। তবে এমন ভুল যাতে আর না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। আপনারা প্রমাণসহকারে যোগাযোগ করুন। দ্বিতীয় সংস্করণে প্রথম সংস্করণের ভুল উল্লেখ করে সংশোধন করব।’

মন্তব্য