kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

যখন বিষণ্ন মন

প্রায়ই খবর হয়, হলিউড-বলিউডের অভিনেত্রীরা বিষণ্নতায় ভুগছেন। দেশীয় অনেক অভিনেত্রীই বিষণ্নতায় ভুগেছেন বিভিন্ন সময়ে। মন বিষণ্ন হলে তাঁরা কী করেন? বলেছেন সোহানা সাবা, শবনম ফারিয়া ও অর্চিতা স্পর্শিয়া

১১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যখন বিষণ্ন মন

সোহানা সাবা

তাদের বুকে জড়িয়ে রাখি

 

সোহানা সাবা

আগে আমার রাগ বেশি ছিল। সেটা কমানোর জন্য ১৫ বছর আগে কোয়ান্টাম মেডিটেশনের কোর্স করেছিলাম। উপকার হয়েছিল। আমি মনে করি, বিষাদের সঙ্গে সাফল্যের কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে মেরিলিন মনরো আত্মহত্যা করতেন না। মানুষের যেমন রাগ থাকে, ক্রোধ থাকে, বিষাদের ব্যাপারটাও কোনো না কোনোভাবে কারো মধ্যে ভর করে। অল্পতেই দেখা যেত আমি আপসেট হয়ে পড়তাম। রিজেকশন বা ছোটখাটো না পাওয়া মেনে নিতে পারতাম না। স্কুলে পড়ার সময় অল্পতেই আপসেট হয়ে পড়তাম। কিছু হলেই দুই-তিন দিনের জন্য বিছানায় পড়ে যেতাম, খাওয়াদাওয়া বন্ধ। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু যে মেডিটেশন করেছি তা-ই নয়, নিজের মতো করে নিজেকে ট্রিটমেন্ট করেছি। বিষণ্নতা থেকে বের হওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় বই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়া। একটা উপন্যাস তিন দিন ধরে পড়লে অনেকটাই বের হয়ে আসতে পারি। এরপর সিনেমা দেখি। যেটা সবচেয়ে বড় মেডিসিনের কাজ করে আমার সবচেয়ে আপনজন—মা কিংবা ছেলে, তাদের বুকে জড়িয়ে রাখি। এটা আমাকে তৎক্ষণাৎ রিলিফ দেয়। এখন বিষণ্নতা পেয়ে বসলে সব ফেলে দেশের বাইরে চলে যাই। নিজের মতো করে কয়েক দিনের জন্য ঘুরে আসি। এ সময় উল্টাপাল্টা ভয়ংকর কিছু রাইডে চড়ে বসি। ভয়ংকর এসব রাইডে চড়ে পাগলের মতো চিৎকার করি। চিৎকার করলে বুকের ভারটা হালকা হয়। এটা হলো আমার মেডিসিন। যাঁরা বিষণ্নতায় ভোগেন তাঁদের অনেককেই আমি সাহায্য করি। স্কুলে আমার একটা বেস্টফ্রেন্ড ছিল, নামটা না বলি। ওকে সময় দিতে পারতাম না নানা কারণে। ২০১৩ সালে ও আত্মহত্যা করেছিল। ওই যে বলে না, কাউকে না বলতে পারলে গাছকে বলো। মন খারাপটা কারো সঙ্গে শেয়ার করা উচিত। সেটা অপরিচিত কেউও হতে পারে। সেই জায়গা থেকে আমি একটা কনসেপ্ট দাঁড় করিয়েছি—সাবা’স কনফেশন বক্স। যে কেউ এখানে তাঁর মনের কথা শেয়ার করতে পারেন। অনেক সেলিব্রিটিও আছেন, যাঁরা আমার সঙ্গে মনের কথা শেয়ার করেন। তাঁদের কথাগুলো আমার কাছেই থাকে, কেউ জানতে পারে না। একসময় নিজেই ভুলে যাই।  

 

শবনম ফারিয়া

জ্বর-ঠাণ্ডার মতো ডিপ্রেশনও একটা রোগ

শবনম ফারিয়া

যখনই কেউ মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয় বা ডিপ্রেশনে যায়, প্রথম ধাপেই ফ্যামিলির ভূমিকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমার প্রথম যখন ডিপ্রেশন হয় তখন বাবা বেঁচে ছিলেন। বাবা ডাক্তার, তিনি বুঝতেন কিভাবে আমাকে ট্রিট করা উচিত। বাবা মারা যাওয়ার পর আমার সিরিয়াস ডিপ্রেশন হয়। বাবার অনুপস্থিতিটা আসলে আমি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারিনি। প্রথমবার আমি ইউটিউব-গুগল করে দেখতাম কোনটা করা উচিত, কোনটা করলে কী হয়, কী খাওয়া উচিত। কিন্তু দ্বিতীয়বার ভয়াবহ অবস্থা হয়েছিল। তখন থেরাপিস্টের কাছে যেতে হয়েছিল। খুব বেশি সেশনে যাইনি, তিন-চারটা সেশনের পরই স্বাভাবিক হয়েছিলাম। ডিপ্রেশন শুরু হলেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। যেমন আমি কাজের মধ্যে থাকলে ঠিক থাকি। টানা কাজের মধ্যে থাকতে পারলে অনেকটাই স্বাভাবিক থাকতে পারি। তখন আরো বেশি কাজ করার চেষ্টা করি। এসব ক্ষেত্রে নিজেকে বোঝা লাগে।

ডিপ্রেশন খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। যেকোনো কিছুতেই ডিপ্রেশন হতে পারে। বাবা চলে যাওয়ার পর মনে হলো, আমার তো আর কেউ নেই। আবার আমার ‘পিসিওএস’ রোগ আছে। এই রোগের রোগীরা এমনিতেই ডিপ্রেশনে ভোগে। হরমোনাল ডিজঅর্ডারের কারণে হয় এ রোগ। তা ছাড়া মেয়েদের তো হরমোনাল চেঞ্জ হতে থাকে মাসজুড়ে। একটা মাসে তিন-চারবার হরমোনাল চেঞ্জ হয়। তখনো ডিপ্রেশন হয়। মেয়েদের ডিপ্রেশন একটু বেশিই হয়। ছেলেরা মন খারাপ হলে পাত্তা দেয় না। ছেলেদেরও কিন্তু হয়। কিছুদিন আগে শুনেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র হল থেকে লাফিয়ে পড়েছে। কারণ ও গ্রাম থেকে এসেছে, সুন্দর করে কথা বলতে পারে না, ভালো কাপড়চোপড় পরতে পারে না। এ কারণে ওর ডিপ্রেশন হয় এবং লাফ দেয়। আমাদের দেশে এ বিষয় নিয়ে তেমন কেউ ভাবে না। কেউ মনোবিদের কাছে গেলে ভাবে, আল্লাহ! ও তো পাগল হয়ে গেছে। অথচ জ্বর-ঠাণ্ডার মতো ডিপ্রেশনও একটা রোগ।

 

অর্চিতা স্পর্শিয়া

মন থাকলে মন খারাপ হবেই

অর্চিতা স্পর্শিয়া

ছোটবেলা থেকেই আমি ও আমার মা অনেক স্ট্রাগল করেছি। অনেকবার মন ভেঙেছে। গত বছরও মারাত্মকভাবে বিষণ্নতা ও হতাশায় ভুগেছিলাম। আমরা জ্বর, মাথাব্যথা কিংবা অমুকতমুক রোগ নিয়ে কথা বলি। কিন্তু মানসিক সমস্যা হলে, মন খারাপ হলে তা নিয়ে কথা বলি না। মনে করি, মানসিক অবস্থা নিয়ে কথা বলা ভালো নয়। মানুষ কী বলবে! অথচ এটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি কথা বলা উচিত। আমার তো মনে হয় ঢাকা শহরের বেশির ভাগ মানুষই ডিপ্রেসড। আমি সব সময় কথা বলি। তবে অবশ্যই এমন কাউকে কথাগুলো বলা উচিত যে বুঝবে। কথা বলার চেয়ে বড় কোনো প্রক্রিয়া নেই বিষণ্নতা থেকে বের হওয়ার। মন থাকলে মন খারাপ হবেই। সেটা অপরাধ নয়। আমি মনে করি, বিষণ্নতাই মানুষের সবচেয়ে বড় রোগ। বিষণ্নতার কারণেই চুল পড়ে, ঘুম হয় না, চেহারা খারাপ হয়ে যায়। যে আমাকে চেনে সে সমাধান দিতে পারে না। আবার যে মানুষটা আমাকে চেনে না, তাকে সব বলতে পারি। অনেকে ভাবে সামান্য বিষণ্নতার জন্য আবার ডাক্তার দেখাব! কিন্তু এ সময় কিছু টাকার বিনিময়ে যে সাপোর্টটা পাওয়া যাবে সেটা হয়তো আপনজনের কাছ থেকেও পাওয়া যাবে না।

 

অনুলিখন : মীর রাকিব হাসান

মন্তব্য