kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

সেই বৈশাখ আর এই বৈশাখ

১১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সেই বৈশাখ আর এই বৈশাখ

আগে কিভাবে বৈশাখ উদ্‌যাপন করা হতো আর এখন কেমন হয়, জানিয়েছেন তিন প্রবীণ তারকা। তাঁদের কথা শুনেছেন ইসমাত মুমু

আমাদের দেখাদেখি কলকাতায়ও এই মেলা হচ্ছে

সৈয়দ হাসান ইমাম

পহেলা বৈশাখ তো মধ্যবিত্ত জীবনে সেভাবে হতো না। আমাদের শৈশবে এটা ছিল ব্যবসায়ীদের অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো না, হতো হালখাতা। কোনো কোনো দোকানে বড় করে আয়োজন হতো। লাল একটা খাতা ছিল, সেখানে সব বাকির হিসাব লেখা থাকত। হালখাতার দিন সব শোধ করে দিতে হতো। সেদিন কিন্তু স্কুল খোলা থাকত। স্কুল থেকে ফেরার পথে সেসব দোকান ঘুরে আসতাম। নতুন কাপড়ও পরতাম সেদিন। গ্রামে তখন মেলা হতো। তখনকার বৈশাখী আমেজের পুরোটাই ছিল গ্রামকেন্দ্রিক।

নাগরিক জীবনে এটা প্রথম আমরাই নিয়ে এলাম, ছায়ানটের মাধ্যমে। তারপর তো এই রূপ নিয়েছে। আমাদের দেখাদেখি কলকাতায়ও এই মেলা হচ্ছে; যদিও এত বড় করে ওখানে হয় না। পহেলা বৈশাখের যে শোভাযাত্রা, আর্ট কলেজের সহায়তায় সেটা আমরা কয়েকজন মিলে সূচনা করেছিলাম—আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, কামাল পাশা, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু আর আমি। প্রথমবার আমাদের বাজেট ছিল সাত হাজার টাকা। আর্ট কলেজ থেকে মুখোশ পরে বের হতাম। এই মুখোশ যখন আমরা ঠিক করি, তখন    ভাবলাম এগুলো অকশন করলে তো কিছু টাকা পাওয়া যায়। অকশনে আমি ৫০০ টাকা দিয়ে একটা ঘোড়ার মুখ কিনলাম। এখন কী হয় ঠিক জানি না। এখন আর ভোরবেলায় গিয়ে মিছিলে যোগ দিতে পারি না। ইচ্ছা করে, কিন্তু শারীরিক সক্ষমতা নেই। দিনের বেলা এখনো ওখানে গিয়ে কবিতা পড়ি। অশোকগাছের নিচে আমরা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম প্রথম। ড. নওয়াজিশ আলী খান সাজেস্ট করেছিলেন। অশোকগাছটিই পরে মুখে মুখে বটগাছ হয়ে গেছে।

 

বন্ধুরা মিলে ‘বিচিত্রা’ অনুষ্ঠান করতাম

আবুল হায়াত

আমার ছোটবেলা কেটেছে চট্টগ্রামে। ছাত্রজীবনের পহেলা বৈশাখ ছিল খুবই মজার। ছাত্রজীবন আর শৈশব তো একই সূত্রে গাঁথা। স্কুল-কলেজে বাড়তি আয়োজন করে এই অনুষ্ঠান হতো না। বন্ধুরা মিলে ‘বিচিত্রা’ অনুষ্ঠান করতাম। চৌকির ওপর মঞ্চ বানিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতাম। আমি অভিনয় করতাম। আমাদের সেই প্রগ্রামে দর্শকের সংখ্যা নেহাত কম ছিল না। এটা ওই শৈশব বা ছাত্রজীবনেরই গল্প।

ঢাকায় থিতু হওয়ার পর পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের ধরন পাল্টে গেল। পাকিস্তান আমলে ঢাকায় রমরমা করে কেউ বৈশাখ উদ্‌যাপন করতে পারত না। ব্যবসায়ীরাই তখন দিনটিতে হালখাতা করত। আমরা নতুন জামা-কাপড় পরে দিনটা ভালোভাবে কাটানোর চেষ্টা করতাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বটমূলের আয়োজন বড় পরিসরে হতে শুরু করল। এখন তো এটা সর্বজনীন উৎসব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি কেমন যেন ঘরকুনো হয়ে উঠলাম। আগে রমনা বটমূলের আয়োজনে নিয়মিত যেতাম। সেখানে সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হতো। তাঁদের সঙ্গে গান আর আড্ডায় সকাল গড়িয়ে দুপুর হতো। তারপর ঘরে ফিরতাম। এখন তো আর বাইরে তেমন যাওয়া হয় না। উৎসবটা আমার ঘরমুখো হয়ে গেছে।

 

পাকিস্তান আমলে স্কুল কলেজ বন্ধ দেওয়া হতো না

দিলারা জামান

আমাদের ছাত্রজীবনে পহেলা বৈশাখ এত আয়োজন করে উদ্‌যাপন করা হতো না। তবে নতুন বছর যে শুরু হচ্ছে, এই ব্যাপারটা ছিল তখনো। নতুন জামা-কাপড় পরতাম। কিন্তু নতুন জামা-কাপড় লাগবেই, এমনটা ছিল না। বাড়িতে ভালো রান্না হতো। মিষ্টি পায়েস রান্না হতো। দিনটা ভালোভাবে কাটানোর চেষ্টা করতাম। এমন একটা বিশ্বাস ছিল যে বছরের প্রথম দিনটা ভালো গেলে সারা বছর ভালো যাবে। সময় বদলে গেছে। জীবন বদলে গেছে। এখন যেমন এটা বিরাট আনন্দ, চারদিকে হৈচৈ, নতুন কাপড় পরা, লাল-সবুজ—কত রং! আমাদের সময় এত রং, মানুষের বাইরে যাওয়া, ঘোরাঘুরি—এসব ছিল না। আমরা স্কুল-কলেজে এটা আলাদা করে কখনো পাইনি। তবে মেলা হতো তখনো। মাটির জিনিসপত্র পাওয়া যেত। আমরা যেতাম আমাদের গার্জিয়ানদের সঙ্গে। তবে পাকিস্তান আমলে বৈশাখটা ওভাবে উদ্‌যাপন করা সম্ভব হতো না। মানে স্কুল-কলেজ বন্ধ দেওয়া হতো না।

কয়েক বছর ধরে পহেলা বৈশাখে তেমন বের হওয়া হয় না। আমি উত্তরার যেখানে থাকি, সেই সেক্টরে সকালবেলা সবাই একসঙ্গে মিলিত হয়। শিশুদের একটা স্কুল আছে আফসানা মিমির—‘ইচ্ছেঘুড়ি’। ওখানে যাই। শিশুরা রঙিন পাখি, খেলনা নিয়ে একসঙ্গে বের হয়। ওদের সঙ্গে মিছিলে যোগ দিই। এবারও ওরা দাওয়াত করেছে। ওদের ওখানে যাব বলে আশা রাখি। তবে আমার মেয়েদের মিস করি। ওরা তো কানাডায় থাকে। ওরা যখন বাংলাদেশে ছিল, তখন পহেলা বৈশাখ বেশ ভালোভাবে উদ্‌যাপন করতাম। বাসায় তখন একটা উৎসবের মতো ছিল। এখন ওরা নাকি বিদেশে নিজেদের মতো করে দিনটা উদ্‌যাপন করে।

 

 

মন্তব্য