kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

বিদায় ভার্দা

৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বিদায় ভার্দা

২৯ মার্চ প্রয়াত হয়েছেন ফরাসি নবতরঙ্গ চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচালক অ্যানিয়েস ভার্দা। প্রয়াত নির্মাতার প্রতি রুদ্র আরিফের শ্রদ্ধার্ঘ্য

 

শরীরে স্তন ক্যান্সারের জীবাণু আছে কি না, সেটির বায়োপসি টেস্টের রেজাল্টের জন্য দুই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষারত এক পপতারকা। এই বিশেষ মুহূর্ত তাঁর চোখের সামনে নিজের তারকাখ্যাতিসমৃদ্ধ জীবনকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তীব্র পরিহাসের পরতে। আরোপিত শারীরিক ভাষা, পরচুলা—কোনো কিছুই এখন আর মূল্যবান নয়। জীবন যেন দুলছে পেন্ডুলামের মতো। এমন মুহূর্তগুলো নিয়ে, প্রতিটি মুহূর্তকে যেন বাস্তবের মতোই উপলব্ধি করিয়ে ১৯৬২ সালে নির্মিত চলচ্চিত্রটির নাম ‘ক্লেও ফ্রম ফাইভ টু সেভেন’। এটি অ্যানিয়েস ভার্দার দ্বিতীয় ফিচার ফিল্ম। কে জানত দীর্ঘকাল পর ২০১৯-এর ২৯ মার্চ স্তন ক্যান্সারেই মরতে হবে তাঁকে!

ভার্দার জন্ম ৩০ মার্চ ১৯২৮, বেলজিয়ামের ইক্সেলায়। বেড়ে উঠেছেন দক্ষিণ ফ্রান্সের সেৎ অঞ্চলের সমুদ্রবন্দরে। শিল্প-ইতিহাস বিষয়ে পড়াশোনা শেষে ফটোগ্রাফার হিসেবে চাকরি নিয়েছিলেন ন্যাশনাল পপুলার থিয়েটারে। এই সময় সহযোদ্ধা চলচ্চিত্রকার ক্রিস মার্কার ও অ্যালাঁ রেনের উৎসাহে শুরু করেন চলচ্চিত্র নির্মাণ। প্রথম ফিচার ফিল্ম ‘লা পোয়াতঁ কোর্ত’-এর (১৯৫৫) প্রেক্ষাপট সেৎ অঞ্চলেরই এক জেলেপল্লী। এখানে এসে একদিন হাজির হয় এক শহুরে যুবক। স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। চার বছরের বৈবাহিক জীবনের টানাপড়েনের শেষ টানার উদ্দেশ্য তার। স্ত্রীটিও হাঁপিয়ে উঠেছে। কিন্তু জেলেদের লড়াকু তবু প্রাণবন্ত জীবন তাদের সামনে মেলে ধরল নতুন সম্ভাবনা। শেষতক তারা রাজধানীতে ফিরল হাসিখুশি যুগল হয়ে। খুব সাধারণ গল্প। তেমনই সাধারণ নির্মাণ। তবু একেবারেই লো-বাজেটের এই চলচ্চিত্রটি হয়ে উঠল মাইলফলক। আর ভার্দা হয়ে উঠলেন পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র দুনিয়ায় প্রবল ঝড় তোলা ‘ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ’ ফিল্ম মুভমেন্টের ‘গ্র্যান্ডমাদার’। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ২৪টি ফিচার ফিল্ম ও ২২টি শর্ট ফিল্মসহ নির্মাণের আরো অনেক দ্যুতি ছড়িয়ে গেছেন নিরীক্ষাধর্মী এই চলচ্চিত্রকার। ‘ফার ফ্রম ভিয়েতনাম’, ‘লায়নস লাভ’, ‘ভ্যাগাবন্ড’, ‘কুংফু মাস্টার’, ‘দ্য গ্লিনারস অ্যান্ড আই’ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। জিতেছেন দুটি মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবের সর্বোচ্চ পদক—‘পাম ডি’অর’ (কান, ফ্রান্স) ও ‘গোল্ডেন লায়ন’ (ভেনিস, ইতালি)। প্রথম নারী চলচ্চিত্রকার হিসেবে জিতেছেন ‘একাডেমি অনারারি অ্যাওয়ার্ড’।

তথ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবেও ভার্দাকে মনে রাখতে হবে। সামাজিক ও রাজনৈতিক বক্তব্য উঠে এসেছে তাঁর তথ্যচিত্রে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়েও অসাধারণ কাজ করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম ‘দ্য গ্লিনার্স অ্যান্ড আই’। সমালোচকদের দৃষ্টিতে এটা সর্বকালের সেরা তথ্যচিত্রের একটি। ষাট ও সত্তরের দশকে বেশ কিছু রাজনৈতিক তথ্যচিত্র বানিয়েছেন। এর মধ্যে ‘ব্ল্যাক প্যান্থারস’, ‘হাই কিউবান!’, ‘ফার ফ্রম ভিয়েতনাম’ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া হিপিশিল্পী ‘আংকেল ইয়ানকো’ তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ২০০৮ সালে নির্মাণ করেন আত্মজীবনীমূলক তথ্যচিত্র ‘দ্য বিচেজ অব অ্যানিয়েস’।

সমসাময়িক ফরাসি চলচ্চিত্রকাররা যেখানে ক্যামেরাকে অস্ত্র হিসেবে ধরে নিয়ে ‘ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ’-এর একেকটি কাল্ট-ফিল্ম বানিয়েছেন, ভার্দা সেখানে ছিলেন উল্টোপথিক। অনেকটাই আত্মমগ্ন এই নির্মাতা চলচ্চিত্রকে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করার ছিলেন ঘোরবিরোধী। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘নিজ ভঙ্গিমায় নার্সিসিজমের ভেতর দিয়ে নয়, বরং সততার ভেতর দিয়ে আমি বরাবরই চলচ্চিত্রে নিজেকে অত্যন্ত যথোপযুক্তভাবে জুড়ে দিয়েছি।’

 

 

মন্তব্য