kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

Reporterer Diary

শামসুদ্দীন মোল্লা বেঈমান হননি

লায়েকুজ্জামান   

১০ জুলাই, ২০২১ ১২:৩৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শামসুদ্দীন মোল্লা বেঈমান হননি

ফরিদপুরের শামসুদ্দীন মোল্লা। ভাঙ্গা পাইলট হাইস্কুলে থাকতেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয় তাঁর। দু’জন অজীবন বন্ধু ছিলেন। শামসুদ্দীন মোল্লা কিন্তু খন্দকার মোশতাক হননি, বেঈমান হননি, জিয়া-এরশাদের মন্ত্রী হননি। বরং বন্ধুত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিবাদী হয়েছিলেন। জিয়া শামসুদ্দীন মোল্লাকে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারপরও আপস করেননি। দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। নিজের কর্মীবাহিনী নিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন। এ বছর বঙ্গবন্ধু ও শামসুদ্দীন মোল্লার জন্ম শতবার্ষিকী। আজ ১০ জুলাই বঙ্গবন্ধুর বাল্য বন্ধু শামসুদ্দীন মোল্লার ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি আজীবন বিপ্লবী এ মানুষটিকে। 

   
বঙ্গবন্ধু ও শামসুদ্দীন মোল্লা একই ক্লাসে পড়তেন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে। দু’জনই থাকতেন বেকার হোস্টেলে। বেকার হোস্টেলে তাদের দিনগুলো নিয়ে ‘শতাব্দীর স্মৃতি’বইয়ে লিখেছেন তাঁদের শিক্ষক সাইদুর রেহমান ( যায় যায় দিনের প্রতিষ্ঠাতা শফিক রেহমানের বাবা)। তিনি ছিলেন বেকার হোস্টেলের সুপার। দেশ ভাগের আগে এঁরা ছিলেন যুব মুসলীম লীগের নেতা। মুসলীম লীগে তখোন বহমান ছিলো দুটি ধারা। আবুল হাসিমের নেতৃত্বের অংশটি ছিলো প্রগতিশীল ধারার। বঙ্গবন্ধু-শামসুদ্দীন মোল্লা ছিলেন আবুল হাসিমের সমর্থক। এই আবুল হাসিম হচ্ছেন প্রখ্যাত বাম ধারার নেতা লেখক বদরউদ্দিনের বাবা। তাদের আদি বাড়ি ছিল পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায়। বঙ্গবন্ধু তাঁর অনুসারীরা ভারত ভাগের সময়েই বুঝেছিলেন, যে সোনার পাকিস্তান কায়েম হচ্ছে এতে বাঙালিরা আবার নতুন করে পরাধীনতার শেকলে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর সময়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবদুল মালেক উকিল এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কলকাতা থেকে আসার পথে বঙ্গবন্ধু তাকে বলেছিলেন, মালেক ভাই, চলুন দেশে যাই। এ স্বাধীনতা দিয়ে কোনো কাজ হবে না, আমাদের আবার স্বাধীন হতে হবে। 
 
পাকিস্তানের জন্মের কিছু দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় পাকিস্তান নামের দেশটি আসলে আমাদের নয়। বঙ্গবন্ধু ধীরে ধীরে এগোতে থাকলেন নানা সংগঠন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। প্রথমে গণতান্ত্রিক যুবলীগ, ছাত্রলীগ তারপর আওয়ামী মুসলিম লীগ। 

কলকাতা থেকে ঢাকায় আসার পরও একই রাজনীতির ধারায় জড়িয়ে থাকলেন বঙ্গবন্ধু ও শামসুদ্দীন মোল্লা। ল’পাশ করার পর শামসুদ্দীন মোল্লা চেয়েছিলেন ঢাকাতে প্র্যাকটিস করতে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, না ফরিদপুরে যাও, দল সংগঠিত করতে হবে। শামসুদ্দীন মোল্লা বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে নিয়েছিলেন। ফরিদপুর এসে আওয়ামী লীগ সংগঠিত করতে শুরু করেন। ফরিদপুরে তখোন মুসলীম লীগের জমিদার মোহন মিয়ার প্রতাপ। এ লাঠিয়ালদের বিরুদ্ধে ফরিদপুরে তখন হাতেগোনা কয়েকজন আওয়ামী লীগ করেন। তাদের মধ্যে শামসুদ্দীন মোল্লা, ইমামউদ্দিন আহমেদ, অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন, সৈয়দ হায়দার হোসেন, এসএম নুরুন্নবী এবং ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলী এলাকার কিছু যুবক। এর মধ্যে অম্বিকা হলে আওয়ামী লীগের এক জনসভায় অনেকটা হঠাৎ করে মোহন মিয়ার বিরুদ্ধে ঝাঁঝালো বক্তব্য দিয়ে বসলেন শামসুদ্দীন মোল্লা। সেই থেকে মোহন মিয়া বিরোধী আওয়াজ শুরু হয় ফরিদপুরে। 
  
১৯৭০ সালের নির্বাচনে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন শামসুদ্দীন মোল্লা। বঙ্গবন্ধু তাঁকে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য করেছিলেন। রাজনীতির পাশাপাশি সাংবাদিকতায়ও ছিলেন তিনি। শামসুদ্দীন মোল্লা ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ছিলেন। 

বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী শামসুদ্দীন মোল্লার বড় পরিচয় পঁচাত্তরের পর আওয়ামী লীগের অনেকেই বঙ্গবন্ধুর রক্তের সাথে বেঈমানী করেছে। অনেকে মোশতাক হয়েছে। শামসুদ্দীন মোল্লা মোশতাক হননি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা শহরে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবি করে প্রকাশ্যে মিছিল হয়েছিল। এ মিছিলের নেতৃত্বে দিয়েছিলেন শামসুদ্দীন মোল্লা। শামসুদ্দীন মোল্লার ভগ্নিপতি শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের বাসায় গোপন বৈঠক হতো সে মিছিল আয়োজনের। সব বৈঠকে বর্তমান কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ইসমত কাদির গামাসহ ছাত্রনেতারাও থাকতেন। মিছিলে ছিলেন যশোরের এমপি রওশন আলী, পাবনার অধ্যাপক আবু সাইয়িদসহ অনেকে। এরপর জিয়া সরকার শামসুদ্দীন মোল্লাকে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিলে তিনি ভারতে গিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। যতদিন জীবন ছিল, শামসুদ্দীন মোল্লা বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর আদর্শের প্রতি অনুগত ছিলেন। বেঈমানী করেননি। মৃত্যুবার্ষিকীতে সালাম জানাই প্রিয় নেতা। 

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট



সাতদিনের সেরা