kalerkantho

বুধবার । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৭  মে ২০২০। ৩ শাওয়াল ১৪৪১

Reporterer Diary

ভাবছি পেছনের রাস্তা দিয়ে বাড়ি ঢুকবো

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু   

১৩ মে, ২০২০ ১৫:২১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভাবছি পেছনের রাস্তা দিয়ে বাড়ি ঢুকবো

আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত নই। সামাজিক কোনও সংগঠনের সাথেও সে ভাবে জড়িত হইনি। বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট না থাকায় এলাকায় খুব একটি পরিচিতও নই। যতটুকু পরিচিতি তা সাংবাদিক হিসাবেই। দেখতে দেখতে আমার সাংবাদিকতা পার হলো প্রায় ত্রিশ বছর। এ কারণেই হয়তকিছুটা সম্মানও পাই। চেষ্টা করি এই সম্মাটুকুও যেন হারিয়ে না ফেলি। কিন্তু করোনা সংকটে সেই সম্মানটুকুতেও টানাটানি পড়েছে। 

করোনা বহুবিধ সমস্যা তৈরি করেছে। এর অন্যতম হচ্ছে মানুষের কর্মহীনতা। লকডাউনের ফলে খেটে খাওয়া মানুষদের এখন কাজ নেই। কর্মহীনতায় মানুষকে করেছে অভাবগ্রস্ত। আমার বাড়ির চারপাশে কর্মহীন এমন  অনেকে আমার পরিচিত। রিক্শাচালক, নির্মাণ শ্রমিক, দোকানের কর্মচারী, কিংবা বাসা-বাড়ির গৃহকর্মী। সবাই দিন এনে দিন খায়। এর থেকে কেউ কেউ সামন্যই সঞ্চয় করতে পারে। দীর্ঘ লকডাউনে কাজ না থাকায় ঘরে খাবারেরও টান পড়েছে তাদের। তাই প্রতিদিনই ছুটছে ত্রাণের আশায়। ত্রাণের একটা স্লিপ পেতে ধর্ণা দিচ্ছে রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, বিশিষ্ট লোকজনের কাছে। কখনও পাচ্ছে কখনও বিফল হচ্ছে। এ নিয়ে তাদের রয়েছে রাগ, অভিমান, অভিযোগ। 

আমাদের পৈত্রিক বাড়ি মানিকগঞ্জ শহরের গার্লস স্কুল রোডে রিজার্ভ ট্যাংক লাগোয়া। মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রিজার্ভ ট্যাংক। এটি আসলে একটি পুকুর। একসময় মানিকগঞ্জবাসীর একমাত্র পানীয় জলের আধার। সে কারণেই নাম দেয়া হয়েছিল রিজার্ভ ট্যাংক। এখন অবশ্য মাছ চাষের ফলে বড়সড় একটা নোংরা ডোবায় পরিণত হয়েছে। অবশ্য দুটি সান বাঁধানো ঘাট এখনও অটুট। 

এই ঘাট দুটিতে এখন ভিড় থাকে করোনার কারণে আপাত বেকারদের। তাদের আলাপের অন্যতম বিষয় হচ্ছে ত্রাণ। কে পেল, কে পেল না, কোথায় গেলে ত্রাণ পাওয়া যাবে, কোথায় ত্রাণ দেয়ার কথা আছে এমন হিসাব নিকাশ চলে। আবার ত্রাণের পরিমাণ, গুনগত মান নিযেও চলে সন্তোষ, অসন্তোষ। চিৎকার, চেচামেচি আর অঙ্গভঙ্গিতে হতাশা, ক্ষোভ, রাগের মিশেল অভিব্যক্তি দেখে মনে হতে পারে সিনেমার সুটিং।  
  
এই পুকুরের পাশ দিয়ে আমাকে বাড়িতে যাওয়া আসা করাতে হয়। ফলে দুই বেলা এদের সাথে আমার স্বাক্ষাত অবধারিত। কথাবার্তাও হয়। বলাবাহুল্য বর্তমান প্রসঙ্গ সেই ত্রাণ। সাংবাদিক পরিচয়ের কারণে ওদর কাছ থেকে অভিযোগটাই বেশি আসে। ওই নেতা আমার নাম লিখে নিল তারপরও কেন রিলিফ পেলাম না। ওমুক মেম্বার ভোটের সময় তোয়াজ করে কথা বলে, এখন ফিরেও তাকায় না। ওমুকে দুই দফায় ত্রাণ পেল আমি একবারও পেলাম না। মুখ দেখে দেখে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। বড়লোকরাই পাচ্ছে, গরিবরা পাচ্ছে না। নানা ধরেণের অভিযোগ তাদের। সেই সাথে ত্রাণের স্লিপ যোগার করে দেয়ার অনুরোধও করে আমাকে। 

ওদের ধারণা আমি যেহেতু সাংবাদিক তাই দু চারটা স্লিপ যোগার করা কোনো ব্যপারই না। চেষ্টা করবো বলে আশ্বাস দেই ওদের। করোনা সংকট শুরুর পর থেকে ত্রাণ বিতরণের অনেক নিউজ করেছি। কমবেশি পরিচও আছে ত্রাণ বিতরণের সাথে জড়িত জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক সংগঠনের নেতাদের সাথে। ব্যক্তিগতভাবে যারা ত্রাণ দিচ্ছেন তাদেরও কারও কারও সাথে পরিচয় আছে। মনে একটা সাহস ছিল দু'চারজনকে ধরলে দুচারটা স্লিপ যোগার করা সম্ভব হবে।

কিন্তু মাঠে নেমে দেখলাম ত্রাণের স্লিপ পাওয়া অত সহজ নয়। যার সাথেই যোগাযোগ করি সবাই কোনো না কোনো অজুহাত দেখায়। আহ-হা ভাই দুদিন আগে আসলেন না কেন। অলরেডি সব বিলি হয়ে গেছে। পরের বার যোগাযোগ করবেন। আপনাকে আসতে হবে না, হাতে পেলেই খবর দেব। ভোটার কার্ড দিয়ে লোক পাঠিয়ে দেবেন।      

বুঝতে পারি আমার পক্ষে ত্রাণের স্লিপ যোগার করা সম্ভব হবে না। ত্রাণ কর্তাদের এর চাইতে বেশি অনুরোধ করলে সাংবাদিক হিসাবে যে টুকু সম্মান আছে তাও থাকবে না। কিন্তু পুকুর ঘাটের অপেক্ষমানরা প্রতিদিনই জিজ্ঞাসা করে, ভাই স্লিপ পাইছেন। হচ্ছে, হবে বলে কোন রকমে পাশ কাটাই। ভাবছি এরপর থেকে পেছনের রাস্তা দিয়ে বাড়ি ঢুকবো।

লেখক : মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা