kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

Reporterer Diary

হাওরে খড় সংগ্রহ

শামস শামীম   

১৩ মে, ২০২০ ১২:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হাওরে খড় সংগ্রহ

শৈশবে গরুর রচনা লিখতে যেয়ে জাবরকাটার কথা শুনেছি সকলেই। গবাদিপশু গোখাদ্য খেয়ে রাতে গোয়ালঘরে বসে মনের আনন্দে জাবর কাটতো। সেই জাবরকাটার অন্যতম উপাদান খড় এখন সংগ্রহ করছেন হাওর-ভাটির লাখো কৃষক। বর্ষাকালীন ৬ মাস যখন হাওরের মাঠঘাট ও গোচারণ ভূমি পানিতে টইটুম্বুর থাকে তখন এই খড় খাইয়েই কৃষক লালন পালন করেন হাওরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির চাকা সচল রাখা গবাদিপশু।

বৈশাখি ধান তোলা শেষে তারা খড় শুকিয়ে সংগ্রহ করে লাছি বা বোলা (গম্বুজাকৃতি) দিয়ে খড় সংরক্ষণ করেন। স্বচ্ছল কৃষকরা খড়ের জন্য আলাদা ঘরও তৈরি করেন। খড় সংগ্রহ করতে গিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ধুম খানাপিনারও আয়োজন করা হয়। কৃষকরা পরষ্পরকে সহযোগিতা করেন। রাতে খাশি, পাটা বা রাজহাঁস জবাই করে খাওয়ানো হয় খেড়ের লাছি তৈরিতে সহযোগিতাকারী কৃষককে। আবহমান কাল থেকে বৈশাখি তোলা শেষে খড়ের লাছি প্রদান উপলক্ষে এই খাবারের আয়োজন চলছে। সম্প্রতি কয়েকটি হাওর ঘুরে এই দৃশ্যই দেখা গেল।

সুনামগঞ্জে চলতি বোরো মওসুমে বাম্পার ফলন হয়েছে প্রকৃতির কল্যাণে। রুদ্র প্রকৃতি এবার শান্ত থাকায় নির্বিঘেœ এই করোনা মহামারির দুর্যোগেও সম্পূর্ণ ফসল গোলায় তুলতে সক্ষম হয়েছেন হাওরের প্রায় আড়াই লাখ কৃষক পরিবার। পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হলে খড়ও নষ্ট হয়ে যায়। তখন গবাদিপশুর খাদ্য সংগ্রহের জন্য চিন্তিত থাকেন কৃষক। এ বছর মওসুম ভালো থাকায় ধান তুলে খড়ও শুকিয়ে সংগ্রহ করছেন কৃষক। তাই গোখাদ্য নিয়ে চিন্তা নেই এবার। ২০১৭ সালে হাওরের সম্পূর্ণ ফসলডুবির ঘটনায় খড়ও নষ্ট হয়েছিল। এতে মানুষের সঙ্গে গবাদিপশুরও হাহাকার শুরু হয়েছিল। পানির দামে বাজারে গবাদিপশু বিক্রি হয়েছিল তখন।

সরেজমিন দেখার হাওর, জোয়ালভাঙ্গা হাওর ও খরচার হাওরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে হাওরের ধান কাটা শেষ। ন্যাড়ামাথার ক্ষেত নীরব নিস্তব্ধ। কাটা ধান থেকে ডেম (অঙ্কুর) গজাচ্ছে। কিছুদিন পরে এই ডেমও ধান হিসেবে কাটেন গরিবরা। এ থেকে অল্প হলেও ধান পাওয়া যায়। এখন হাওরের ধান কাটা শেষ হয়ে যাওয়ায়  মাড়াইকৃত খড় ধানখলা, রাস্তার ধারে, জাঙ্গালে এমনকি সদর সড়কেও বিছিয়ে শুকাচ্ছেন শত শত কৃষক। গ্রীষ্মের ভ্যাপসা গরমে সেই খড়ে বাহু ডুবিয়ে নেড়ে দিচ্ছেন কৃষক কিষাণী। অনেকে খড় নাড়ার সনাতন যন্ত্র বাঁশের ওকন দিয়েও নেড়ে দিচ্ছেন। তাদের নোনা ঘামে সিক্ত শরির। খড় নাড়া ও শুকানো শেষ হলে কেউ মাথায় করে, কেউ যান্ত্রিক গাড়ি কেউ বা গরু-মহিষের গাড়ি করেও শুকানো খড় বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। বাড়িতে এনে সেই খড় স্বচ্ছল কৃষকরা খড়ের জন্য তৈরি আলাদা ঘরে এবং প্রান্তিক কৃষকরা লাছি বা বোলা করে সংরক্ষণ করে রাখছেন। একটি লাছি করতে অনেক সময় ব্যয় হয় কৃষকের। খড়ের লাছি করতে কয়েকজন লাছির উপরে ওঠে ভালো করে পা দিয়ে টিপে টিপে শক্ত করে ভিত তৈরি করেন। যাতে সহজে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করতে না পারে। নিচে থাকা লোকজন খড়ের জোগান দেন। এভাবেই শক্তপোক্ত লাছি শেষ হলে নেমে আসেন উপর থেকে।

বর্ষায় ৬ মাস হাওরের মাঠঘাট ও গোচরণভূমি ডুবে থাকে। চারদিক জলের কান্তারে রূপ নেয়। মানুষের চলাচলও সীমিত হয়ে আসে। তখন গবাদিপশুগুলোর গোয়ালঘরে থাকে। এসময় ঘাস পায়না গবাদি পশু। তাই গোয়ালঘরে গবাদিপশু গুলোকে একমাত্র খড় খাইয়েই বাঁচিয়ে রাখা হয়। এখনো হাওরাঞ্চলে খড়ের বিকল্প গোখাদ্য তৈরি না হওয়ায় যুগযুগ ধরে নিজ উদ্যোগে খড় সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেন কৃষক। খড় সংগ্রহে কৃষি বিভাগ বা প্রাণি সম্পদ বিভাগেরও কোন ভূমিকা নেই। এমনকি প্রতি মওসুমে কি পরিমাণ খড় সংগ্রহ করেন কৃষক সেই তথ্যও প্রাণীসম্পদ বিভাগে নেই। খড় সংগ্রহ করতে কৃষক পরুষ্পরের সহযোগিতা নেন। এই সহযোগিতার জন্য ভীষণ খানাপিতার আয়োজন করা হয়। গত ১১ এপ্রিল শাল্লা উপজেলার আঙ্গাউড়া গ্রামে খড়ের লাছি দিয়েছেন কৃষকরা। রাতে সহযোগিতা প্রদানকারী কৃষকদের রাজহাস ও পাঠা বলি দিয়ে খাইয়েছেন। নানা স্বাদের পিঠায় আপ্যায়ন করেছেন তাদের। অন্যান্য এলাকায়ও লাছি উপলক্ষে খানাপিনার আয়োজন চলছে। করোনাভয় উপেক্ষ করেই এবার ফসল তুলি তৃপ্তির হাসি হাসছেন কৃষক। এখন গবাদিপশুর খাদ্য সংগ্রহ করতে পেরেও স্বস্তিতে আছেন তারা।

কৃষকরা জানান, মওসুম ভালো হলে খড়ের লাছি উৎসব করে দিয়ে থাকেন। পরষ্পরকে সহযোগিতা করতে দিন তারিখ নির্ধারণ করে একে অন্যকে লাছি দিতে সহযোগিতা করেন। লাছি দেওয়া শেষ হলে বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে সহযোগিতাকারী কৃষককে আপ্যায়ন করা হয়। কেউ খাশি, কেউ বা রাজহাঁস দিয়ে আপ্যায়ন করেন। নতুন ধানের চালে নানা প্রজাতির পিঠাও তৈরি করে পরিবেশন করা হয়। আবহমান কাল থেকেই এই উৎসব চলে আসছে হাওরে। তবে আগের চেয়ে এখন এমন অনুষ্ঠান কিছুটা কমেছে।

দেখার হাওরের হালুয়ার গাঁও গ্রামের কৃষক সাবিবুর রহমানকে দেখা গেল ওকন দিয়ে তিনি খড় নেড়ে দিচ্ছেন। ধান তুলতে পেরে খুশি তিনি তিনি। বললেন, ‘ধানের খেড় ছারা গরুরে খাবাইবার অন্য কুন্তা নাই। পাইন্যে ধান নিলে খেড়ও নষ্ট অয়। তখন মানুষ গরু হকলতার খাওন থাকেনা। তবে ইবার ধানের হঙ্গে খেড়ও বালা অইছে। ধান কাইট্যা, হুকাইয়া উগারও তুলার পর এখন খেড়ও হুকাইয়া তুলতাছি। বাইরা মাসো এই খেড় খাবাইয়াই আলের গরুবাচুর ফালমু।’

সুনামগঞ্জ জেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান খাননের মুখোমুখি হয়েছিলাম এ বিষয়ে কথা বলতে। তিনি জানালেন, সুনামগঞ্জ জেলায় প্রায় ৯ লাখ গবাদিপশু রয়েছে। এই পশুর প্রধান খাদ্য খড়। হাওরে প্রাকৃতিকভাবেই এই খড় সংগ্রহ হয়। এই খড় বর্ষাকালীন ৬ মাস হালের গবাদিপশুকে খাওয়ানো হয়। তবে কি পরিমাণ খড় হাওর থেকে গোখাদ্য হিসেবে সংগৃহিত হয় তার তথ্য সরকারি এই অফিস থেকে পাওয়া গেলনা।

আবহমান কাল থেকেই কৃষি সভ্যতাকে এগিয়ে নিচ্ছেন এই কৃষকরাই। তারা এখনো সেই চেষ্টাটাই করে যাচ্ছেন। টিকে থাকার জন্য প্রতিদিনই বংশপরম্পরায় শেখা কাজটা নিজেরাই টেনে নিচ্ছেন। 

 



সাতদিনের সেরা