kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

Reporterer Diary

সাংবাদিক খোকন, অপু ও আসলামের মৃত্যু এবং নিধিরাম সরদারের গল্প

লায়েকুজ্জামান   

৮ মে, ২০২০ ২২:৩১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সাংবাদিক খোকন, অপু ও আসলামের মৃত্যু এবং নিধিরাম সরদারের গল্প

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ঢাকার দু’জন সাংবাদিক। আরেক জনের মৃত্যু হয়েছে করোনা উপসর্গ নিয়ে। তারা হলেন হুমায়ুন কবীর খোকন, মাহমুদুল হাকিম অপু ও আসলাম রাহমান। তিনজনই আমার সাবেক সহকর্মী। খোকন ও আসলাম মানবজমিনে এবং অপু সকালের খবরে থাকতে। তারা বাদেও করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরো বেশ ক’জন গণমাধ্যমকর্মী। খোকন ও অপু সর্বশেষ ছিলেন সময়ের আলো পত্রিকায় এবং আসলাম ছিলেন ভোরের কাগজে। আসলামের হৃদ রোগ ছিল। করোনার বিষয়টি পরীক্ষা করা হয়নি। তবে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। 

দেশে করোনা ঘোষণার পর ঘরের বাইরে এসে কাজ করতে হচ্ছে চিকিৎসক, সাংবাদিক, পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে। তাদের মধ্যে চিকিৎসকরা হচ্ছেন ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধা। তাদের কাজ করতে হচ্ছে একেবারে রোগীর কাছে থেকে। রোগীর সঙ্গে মিশে। কাজের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পরেই অবস্থান সাংবাদিকদের। ঘরে বসে সাংবাদিকতা হয় না, করাও যায় না। খবর সংগ্রহ করতে সাংবাদিকদের ছুটে যেতে হয় জনতার কাছে। কখনো হাসপাতালে, কখনো আক্রান্ত রোগীর কাছে।

সেদিন দেখলাম করোনা রোগীর চিকিৎসাস্থান মুগদা হাসপাতালের সামনে দাড়িয়ে লাইভ দেখাচ্ছিলেন একজন টিভি সাংবাদিক। হঠাৎ করেই হাসপাতালের দোতলা থেকে দৌড়ে নেমে এসে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যান দু’জন করোনা রোগী। তারা হাসপাতালের অবহেলা ও সমস্যার কথা বলতে এসেছেন। হঠাৎ এমন ঘটনা ঘটায় সাংবাদিক ও ক্যামেরা পার্সনের পক্ষে সেখান থেকে সরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ টিভি চ্যানেলটিতে লাইভ অনুষ্ঠান চলছিল। সাংবাদিকদের এমন ঘটনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে মাঝে মধ্যেই। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর হাতে তবু লাঠি আছে এবং পোশাকের কারণে তাদের দেখলে সাধারণ মানুষে ভয়ে কিছুটা সরে যায়। তারপরও অনেক সময়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে মাঝে মধ্যেই আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে নিতে হয়। আবার করোনায় মৃত রোগীর দাফনও করতে হয় তাদের। 

করোনার শুরুতে চিকিৎসকরা বেঁকে বসেছিলেন ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী না পেলে তারা কাজে যাবেন না। সরকারের কাছ থেকে তারা এগুলো আদায় করেছেন। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর অভাব হয়নি। ব্যাতিক্রম সাংবাদিকরা। গোটা কয়েক পত্রিকা মাত্র তাদের ঢাকার সাংবাদিকদেরকে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী দিয়েছে। করোনা এখন ৬৪ জেলাতেই ছড়িয়েছে। জেলার সাংবাদিকদেরও করোনা নিয়ে কাজ করতে হয়, রিপোর্ট পাঠাতে হয়। মাত্র কয়েকটি জেলায় রাজনৈতিক নেতারা সাংবাদিকদের সুরক্ষা সামগ্রী দিয়েছেন। বাকি বিপুল সংখ্যক সাংবাদিকদের কাজ করতে হচ্ছে বিনা সুরক্ষায়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। 

করোনায় তিনজন সাংবাদিকের মৃত্যু আমাকে ব্যক্তিগতভাবে আহত করেছে। তিন জনের সঙ্গেই ছিল ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পরিচয়। খোকন যখন মানবজমিনের ঢাকা অফিসে আমি তখনো মানবজমিনের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি হিসেব ফরিদপুর থেকে কাজ করি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নিউজ করি। ঢাকায় আসলে দেখা হতো-কথা হতো। ঢাকায় চলে আসার পর পুরনো সম্পর্কটা আরো গভীর হয়েছিল। সব সময়ে হাসি লেগে থাকতো মুখে। নিজের সমস্যার কথা সহজে বলতেন না কাউকে। দেখা হলেই একটি কথা বলতেন, বড় ভাই কেমন আছেন। সেই কবে বলেছিলাম কিন্ত এতো পরে ঢাকা এলেন। আপনার তো এখানে থাকার কথা ছিল না। আলোচনা ওঠাতেন আমার এলাকার রাজনীতি নিয়েও। 

আসলামও ছিলেন মানবজমিনে। কয়েক মাস আগে আমরা ঢাকায় কর্মরত বৃহত্তর ফরিদপুরের সাংবাদিকদের নিয়ে একটি সংগঠন করি। এ নিয়ে আসলামের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হলো। আসলাম অনুরোধ করে বলেছিলেন, আমি যেন দায়িত্বে থাকি। না হলে তিনি থাকবেন না। আর অপু-সকালের খবরের আমাদের সবার দাদু। অফিসে কি যে মজা হতো অপুকে নিয়ে। কত কথা। অপুকে কেউ কখনো রাগ করতে দেখেনি। ওর মাথায় চুল ছিল কম। আমরা ঠাট্টা করতাম চুল নিয়ে। অপু এক গাল হাসি দিয়ে বলতো, মাথা হলো চুলের শোরুম। আমি সব চুল শোরুমে রাখি না। চুলের একটা ওজন আছে না। কেন ওজন বয়ে বেড়াবো। এ জন্য অল্প কিছু শোরুমে রেখে বাকিটা বউয়ের কাছে রেখে এসেছি। এ নিয়ে হাসির রোল পড়তো অফিসে। অপু ঢুকলেই শুরু হতো আনন্দ যাত্রা। প্রাণবন্ত হয়ে উঠতো অফিস। আজ সব বেদনায় পরিণত হয়েছে। চোখের সামনে ভাসে মুখগুলো। 

অসহায় মনে হয়। মুষড়ে পড়ি। একা একা ভাবি আজ আমি ওদের নিয়ে লিখছি, কাল হয়তো কেউ আমাকে নিয়ে লিখবে। না হয় আমাকে আবার লিখতে হবে অন্য কোনো পরিচিত মুখ নিয়ে। প্রকৃতি বড় নিষ্ঠুর। তার চেয়ে এক বড় নিষ্ঠুর পেশায় আছি আমরা। কেউ কেউ বলছেন করোনাযুদ্ধ। যদি এটা যুদ্ধ হয় সে যুদ্ধে আমরা সাংবাদিকরা কামানের গোলার সামনে দাঁড়ানো অস্ত্রবিহীন সৈনিক। 

সরকার ঘোষণা করেছে সরকারি কোনো চাকরিজীবী করোনার কাজে গিয়ে মারা গেলে তার পরিবার ৫০ লাখ টাকা পাবে। অন্যদিক গণমাধ্যমকর্মীদের অবস্থা কি। ভোরের কাগজের সাংবাদিক ডিইউজের প্রচার সম্পাদক আছাদুজ্জামান বলছিলেন, আসলামের মৃত্যুর খবর পেয়ে গভীর রাতে ছুটে যান হাসপাতালে। মাদারীপুরে আসলামের লাশ পাঠাতে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার জন্য আবার ছুটে যেতে হয় ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তের বাসায়। আমরা সেই করোনাযোদ্ধা যাদের লাশ গ্রামের বাড়িতে পাঠাতেও হাত পাততে হয়। মৃত্যুর পরে কি হবে? আমাদের মৃত্যু হয় তো সরকারের কাছে একটি সংখ্যা মাত্র কিন্তু স্বজনদের কাছে তো ভরসা ও আশ্রয় হারানোর মতো অবস্থা।

বৃটিশ আমলের কথা। সে সময়ে বাংলার নমসুদ্রকে বীর হিসেবে ধরা হতো। বাংলাদেশের কোনো একটি অঞ্চলে দু’দল নমসুদ্রর মাঝে সংঘর্ষের আয়োজন চলছে। সে সময়ে গ্রাম্য সংঘর্ষ মানে ঢাল-তলোয়ার। এ সময়ে নিধিরাম নামের এক নমসুদ্র লড়াইয়ের জন্য এগিয়ে যাচ্ছেন। তার হাতে কোনো ঢাল-তলোয়ার নেই। তখন ব্যাঙ্গ করে একজন বলেছিলেন, দ্যোখো না, ঢাল নেই, তলোয়ার নেই; আমাদের নিধিরাম সরদার সেজেছেন। সেই থেকে প্রবাদটি চলে আসছে। আমরা গণমাধ্যমকর্মীরা হলাম করোনযুদ্ধে ঢাল তলোয়ার বিহনী এক নিধিরাম। 

সরকার করোনায় প্রণোদনা ঘোষণা করেছে তার মধ্যে গণমাধ্যমকর্মীরা নেই। আমাদের অধিকারের কথা বলার জন্য আদায় করার জন্য আমাদের নেতারা আছেন। আমরা ভোট দিয়ে তাদের নির্বাচিত করি। জানি না এমন দুঃসময়ে নেতারা কি করছেন। শুনলাম নেতারা নাকি চার ভাগে বিভক্ত হয়েছেন। তারা নিজেদের নাম চান, মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় চান। এতেই খুশি তারা। বালাইসাট সাধারণ সাংবাদিক।

একটি বাস্তব সত্য বাংলাদেশে শেখ হাসিনার চেয়ে কোনো সাংবাদিক বান্ধব নেত্রী-প্রধানমন্ত্রী আসেনি। সাংবাদিক দরদি মানবিক শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণ ফান্ড তৈরি করে দিয়েছেন। এ পর্যন্ত সাংবাদিকদের যা অর্জন ওয়েজবোর্ড তা কেবল শেখ হাসিনাই দিয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা নবম ওয়েজবোর্ড গেজেট করার পরও আমরা তা পাইনি আমাদের নেতাদের অনবিজ্ঞতা, দূরদর্শীতা ও পারদর্শীতার অভাব। তারা আদায় করতে পারেননি। কর্মী ছাঁটাইয়ের পর ওই প্রতিষ্ঠানের সামনে গিয়ে দুটি লাফ মারা মানেই অধিকার আদায় নয়, এটা ব্যক্তিগত শো-ডাউন। আপনি নেতা আপনাকে কাজে লাগাতে হবে নানা ইউং।

করোনায় সাংবাদিকদের অবস্থা কি? সেদিন দেখলাম শাবান মাহমুদের কাছে এসেছেন ক’জন সাংবাদিক। ঘরে চাল নেই। কয়েকজন সহকর্মীদের কাছ থেকে টাকা ধার করে শাবান দিলেন তাদের। সে দিন একজন সাংবাদিক লজ্জা চাপা দিয়ে ফোনে বলেই বসলেন, ভাই পারলে আমাকে কিছু ত্রাণ যোগাড় করে দিন। ঘরে চাল নেই। অথচ এ সময়ে বঙ্গবন্ধু কন্যার মতো সাংবাদিক দরদি নেত্রীর কাছ থেকে আমাদের নেতারা কিছুই আনতে পারছেন না। এটা লজ্জার। অপমানের। যা আনবে আবার তাও শুনি নেতারা চার ভাগে বিভক্ত। একজন এগোয় তো বাকিরা পিছায়।



সাতদিনের সেরা