kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ আষাঢ় ১৪২৭। ২ জুলাই ২০২০। ১০ জিলকদ  ১৪৪১

Reporterer Diary

হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের ৫ মে আজ

শত শত লাশ গুম করেছে সরকার, নাকি অপপ্রচার? শুরু হলো অনুসন্ধান

হায়দার আলী    

৫ মে, ২০২০ ১৫:৪০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শত শত লাশ গুম করেছে সরকার, নাকি অপপ্রচার? শুরু হলো অনুসন্ধান

আজ ৫ মে, সাত বছর আগে আজকের এই দিনে রাজধানীর মতিঝিল চত্বরসহ সারাদেশেই চলছিল হেফাজতের তাণ্ডব। ঢাকাসহ আশাপাশের জেলা থেকে মিছিল করে দলে দলে আসেন এবং মঞ্চ বানিয়ে মতিঝিল চত্বরে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন হেফাজত ইসলামের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা। আর হেফাজতের ওই অবস্থানকে সমর্থন দিয়েছিল বিএনপি-জামায়াতসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। দিনভর দফায় দফায় চলতে থাকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে চলতে থাকে হেফাজতের নেতাকর্মীদের সংঘাত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংবাদকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে, দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়, কিন্তু ম্যারাথন চলতে থাকে হেফাজতের অবস্থান কর্মসূচি। নিরুপায় হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নির্দেশে পুলিশ এবং র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানে মতিঝিল চত্বর থেকে রাতের আঁধারে হটানো হয় হেফাজতকে। 

রাতের সেই অভিযানে হেফাজতকর্মীসহ ২৩ জন মারা গিয়েছিলেন, কিন্তু গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়, র‍্যাব পুলিশের অভিযানে হেফাজতের শত শত আলেম ওলামাকে গুলি করে মেরে লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে। লাশগুলো ট্রাকে ভরে রাতের বেলায় পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন জায়গায় মাটিচাপা দেওয়া হয় বলে সারাদেশে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। সারাদেশেই এই গুজবকেই সত্য হিসেবে ধরে নেয় অনেকেই। কিন্তু সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি ছিল, মতিঝিল চত্বরে গুমের কোনো ঘটনা ঘটেনি, কেউ নিখোঁজ হয়নি। ফাঁকা ফায়ার করে, ভয় দেখিয়ে মতিঝিল চত্বর থেকে নিরাপদে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল হেফাজতের নেতাকর্মীদের। কিন্তু সাধারণ মানুষ কোনটা বিশ্বাস করবে-  শত শত আলেম-ওলামাকে গুমের অভিযোগ, নাকি কোনো আলেম-উলামা গুম হয়নি বলে সরকারের দাবি। ঘটনার পর গুজব নাকি সত্য- দ্বিধায় পড়ে যায় আমজনতা।

এমন কঠিন পরিস্থিতিতে কালের কণ্ঠের একজন ক্ষুদে সংবাদকর্মী হিসেবে ভাবতে থাকলাম- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে আসলে কি ঘটেছিল সেই রাতে? ঘটনা সত্য উদঘাটনের জন্য পরের দিন অনুসন্ধানে মাঠে নেমে যাই। হাজার হাজার না হোক অন্তত কয়েকজন নিখোঁজ কিংবা গুম হয়েছেন এমন পরিবারের তথ্য উপাত্ত কিংবা ঠিকানা পেলে নিশ্চয়ই ভালো একটি রিপোর্ট বানানো যাবে। সরকার বলছে কোনো গুম হয়নি, সেক্ষেত্রে প্রমাণ করা যাবে অবশ্যই সেদিন মানুষ গুম হয়েছিল। সেই চিন্তা নিয়ে প্রথমেই যাই রাজধানীর মোহাম্মদপুরের দুটি বড় বড় মাদরাসায়, ওই দুটি মাদরাসার এক-একটিতে দুই থেকে আড়াই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। সেখানে গিয়ে মাদরাসার অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে কোনো নিখোঁজের তথ্য পাইনি, তবে পুলিশের পিটুনিতে আহত হয়েছেন এমন তথ্য পেয়েছিলাম। সেই মাদরাসারই একজন শিক্ষকের সহায়তায় লালবাগ মাদ্রাসায় যাই, সেখানে গিয়েও নিখোঁজের কোনো তথ্য পায়নি। এভাবে একের পর এক রাজধানীর বড় বড় বেশ কয়েকটি মাদাসা চষে বেড়াই। নিহত কিংবা আহত হয়েছেন এমন হেফাজতের কর্মী সদস্যদের নাম ঠিকানা পাওয়া যায়। কিন্তু নিখোঁজ আছেন কিংবা গুম হয়েছেন এমন কোনো সদস্যের নাম ঠিকানা কেউ দিতে পারেননি। ওইসব মাদরাসার প্রধান এবং হেফাজতের নেতাদের কাছে জানতে চাইলাম যারা গুম কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন এমন পরিবারের নম্বর দিন। কিন্তু সেই দিনের ঘটনায় আহত এবং নিহতদের নাম ঠিকানা দিতে পারলেও গুম বা নিখোঁজ আছেন এমন সদস্যদের নাম ঠিকানা দিতে পারেনি মাদরাসার প্রধান এবং হেফাজতের নেতারা। গুম এবং নিখোঁজের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবদকের প্রশ্নের উত্তর নানা কায়দায় এড়িয়ে গেছেন তারা।

একা একা দুদিন অনুসন্ধানের পর ভাবলাম আরো বেশি বেশি মাদ্রাসায় অনুসন্ধান করা দরকার। যদি অন্য কোনো মাদ্রাসায় গুম-নিখোঁজের ঘটনা যদি থেকে থাকে! এমন ভাবনা থেকে ওই সময় আমার সহকর্মী কালের কণ্ঠের সাংবাদিক  জয়নাল আবেদীনকে (বর্তমানে সমকাল পত্রিকায় কর্মরত) অনুসন্ধানের সঙ্গী হিসেবে নেই। আমার প্রিয়ভাজন সাংবাদিক জয়নালকে সঙ্গে নিয়ে আরো বিশদভাবে চলে অনুসন্ধান। দুজন  মিলে পরিকল্পনা করে চষে বেড়াই ঢাকার বিভিন্ন মসজিদ-মাদরাসা, কথা বলি হেফাজতের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে হেফাজত ইসলামের নেতা, মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ বিভিন্ন সেক্টরে। জয়নাল এবং আমি চিন্তা করলাম হেফাজতের সমাবেশে ঢাকা এবং আশেপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও এসেছিলেন নেতাকর্মীরা। তাহলে খোঁজ নেয়া যায় ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও। একপর্যায়ে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, নরসিংদী, গাজীপুর, সাভার, নোয়াখালী ৯টি জেলার কালের কণ্ঠের সংবাদিকরাও অনুসন্ধানে অংশ নিতে বলি এবং তারাও খুবই গুরুত্বসহকারে অনুসন্ধান চালায়। কিন্তু ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫০৪টি মাদরাসায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েও নিখোঁজের কোনো প্রমাণ পায়নি কালের কণ্ঠের এই অনুসন্ধান দলের কোনো সাংবাদিকই। হেফাজতের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা মহানগরের একজন নেতাও তাদের কোনো নেতাকর্মী নিখোঁজ কিংবা গুম হয়েছেন এমন পরিবারের তথ্য-ঠিকানা দিতে পারেননি। 

অনুসন্ধানের শেষ পর্যায়ে খুবই যত্ন সহকারে চার পর্বের ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় কালের কণ্ঠের প্রথম পাতায়। পরপর চারটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর সত্য বেরিয়ে আসে- মতিঝিল চত্বরে হাজার হাজার আলেম-ওলামা গুমের অভিযোগটি ছিল ভিত্তিহীন এবং অপপ্রচার। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এমন অভিযোগ করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিক প্রতিবেদনগুলো ছাপা হওয়ার পর শুধু আমরাই নয়-কালের কণ্ঠের পাঠকসহ যারাই প্রতিবেদনটি দেখেছেন তারাও বুঝতে পেরেছিলেন হেফাজতের সেই ঘটনায় কোনো গুমের ঘটনা ঘটেনি, সে অভিযোগ ছিল মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। 

প্রতিবেদনটির জন্য মিডিয়ার সহকর্মীসহ বিভিন্ন মহল থেকেই অভিন্দনসহ প্রশংসিত হয়েছিলাম। সহকর্মী জয়নাল আবেদীন এবং আমি পেয়েছিলাম বাংলাদেশ ইনেস্কো জার্নালিজম আ্যাওয়ার্ড। প্রতিবছরই আসে ৫ মে, এই দিনটি আসলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হেফাজত ইসলামীর সেই দিনের তাণ্ডবের ভয়ংকর দৃশ্য, হাজার হাজার আলেম ওলামার লাশ গুম করে দেয়া নিয়ে সাংবাদিকদের স্বপক্ষে কত শত যুক্তি। লাশ গুমের গুজবকে সত্য প্রমাণ করতে কিছু সাংবাদিক কৌশলে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন, সেটাও কোনদিন ভুলবো না। সময় হলে কোনো একদিন সেই কথাও তুলে ধরবো। তবে সত্য কখনো চাপা থাকে না, ঠিকই বেরিয়ে আসে। শত শত আলেম-ওলামার লাশ গুম করে ফেলার অভিযোগের তীর যারা আওয়ামী লীগের ওপর ছুড়ে দিয়েছিল, যারা গুজব রটিয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির পায়তারা করেছিল। যারা ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে হেফাজতকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল তারাই এখন রাজনীতির মাঠে নেই, তারাই সময়ের ব্যবধানে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সেই সত্য বেরিয়ে এসেছে, টিকে রয়েছে 'শত শত লাশ গুমকারী' আওয়ামী লীগ। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা