kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ আষাঢ় ১৪২৭। ৭ জুলাই ২০২০। ১৫ জিলকদ  ১৪৪১

Reporterer Diary

হাওরের ধানখলা

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

৩০ এপ্রিল, ২০২০ ১২:৫৫ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



হাওরের ধানখলা

বোরো ধান আহরণের এই মৌসুমে এক অভিন্ন চিত্র হাওরজুড়ে। প্রতিটি ধান খলায় (ধান শুকানোর জায়গা) অনন্য দৃশ্যে মন জুড়ায়, ধুলোপড়া চোখে আরাম দেয়। কী দারুণ কষ্টে হাওরের ছায়াহীন বিরান কান্দা-প্রান্তরে সারি সারি খলায় (ধান শুকানোর তৈরি মাঠ) দিন গুজরান করছেন লাখো কৃষক। সেখানে খড়ের অস্থায়ী খলাঘর তৈরি করে রাতে থাকার সাময়িক ব্যবস্থা করা হয়েছে। দিনে টানা পরিশ্রম করে যখন হাঁপিয়ে ওঠেন কৃষক তখন সেই অস্থায়ী খলাঘরে সাময়িক আশ্রয় নেন। আনন্দের সঙ্গে আতঙ্ক, ভীতি ও হাহাকার জুড়ে থাকে ধানখলাকে ঘিরে। 

ধানখলার দৃশ্য হাওরবাসীর চেনা। শত বছর ধরে পরম্পরায় জীবন টেনে নিচ্ছেন তারা। কিন্তু বাইরের লোকসকল যারা, প্রথমে ধানখলা দেখে চোখ ফেরাতে পারেন না সহজে। তাদের চোখ আটকে যায় অলৌকিক মায়াজালে। স্থির চাহনীতে নিজেরা অজান্তেই ডুব দিয়ে থাকেন। খলায় শুকানো ধানের স্তুপ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। কুলায় ধান ওড়িয়ে চিটা ছাড়াচ্ছে কমবেশি সকলেই। শুকানোর জন্য দেওয়া ধান নেড়ে দিচ্ছে কোমল পা। এই মরসুমে হাওরের চেয়ে ধানখলাই মুখরিত থাকে বেশি। আর মুখর করে যারা রাখেন তাদের প্রায় সবাই নারী। হাওরের অর্থনীতিতে যাদের শ্রমের মূল্যায়ণ প্রায় অনুপস্থিত। এ যেন অমর্ত্য সেনের লুকায়িত অর্থনীতির এক প্রোজ্জ্বল দিক। যা যুগযুগ ধরে হাওর আর্তনীতির মূল্যায়নের বাইরেই রয়ে গেছে।

হাওরের মানুষ আমি। জলা-জাঙ্গাল আর কান্দার সঙ্গে শৈশব থেকেই মিতালি। ধানখলায় ছোট বেলা থেকেই ধান পাহারা দেওয়া আর তদারকি দায়িত্বের হাতেখড়ি শুরু হয়েছিল। বৈশাখি ধানের বিনিময়ে বুটমটর (ভাজা ছোলা), গরম জিলাপি, কাটাগজা, নিমকি, রসগোল্লা আর নানা পদের ম-া মিঠাই খেয়েছি কুছিকুছি (ধান-চাল মাপার ছোট ঠুকরি) ধান দিয়ে। ফেরিঅলার হরেক মুধর ডাক আর ম-ামিঠাই আমাদের প্রলুব্ধ করতো। আমরা বড়োদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ম-ামিঠাই বিক্রেতার বস্তায় ভরে দিতাম কুছিকুছি ধান।

হাওরের সেই ধানখলাগুলো এখন মুখর। কাজের সুবাদে বেরুতে হয়। চিরচেনা এমন মুখর রূপ দেখেও নিজে চোখ ফেরাতে পারিনা। এক একটি খলা দেখি, মুগ্ধতায় সিক্ত হই। মনে হয় কোন ধ্যানী শিল্পীর শিল্পিত ছোঁয়ায় অনন্য রূপ নিয়েছে ধানখলা। একেকটি দৃশ্যমুহুর্ত ধরার জন্য শিল্পী যেন অনন্তকাল নির্ঘুম কাটাচ্ছেন। ডুব দিয়ে আছেন অথৈ সুন্দরের মাঝে। তার ধ্যানও যেন ভেঙ্গে যাচ্ছে খলার উস্কে দেওয়া সৌন্দর্য্য।

এখন করোনাকাল। বিশ্বজন স্বেচ্ছায় গৃহবন্ধী। কিন্তু উল্টো চিত্র, দেশের খাদ্য যোগানদাতা হাওরে। সবাই এখন ঘরে ছেড়ে হাওরে। কষ্টের ফসল গোলায় না ওঠলে জীবন তাদের থমকে যায়, আনন্দ ম্লান হয়ে যায়। এইবার বিশ্ব শ্রমসংস্থাসহ অর্থনীতিবিদরা আগাম খাদ্য সংকটের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও আগাম খাদ্যসংকেরট আভাস বুঝতে পেরে বারবার যে কোন মূল্যেই হাওরের ধান কেটে তুলার নির্দেশনা দিচ্ছেন। এই অবস্থায় বাংলাদেশের মানুষের অন্নের জোগানদাতা হাওরবাসীর কি ফসল ঘরে রেখে বসে থাকলে চলে। করোনার চেয়ে তাদের যত ভয় কালবৈশাখী, বজ্রবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলকে। উজানের ঢল মুহুর্তেই এসে ভাসিয়ে নেয় ভাটির ধানচোখের স্বপন। দেখতে দেখতে তলিয়ে যায় একেকটি ফসলী হাওর। তখন এক শব্দহীন কান্না ছাড়া উপায় থাকেনা হাওরবাসীর। আসুন দুইজন কৃষকের বোরো আহরণে নামার কথা শুনি তাদের জবানিতে।

হাওরে শ্রমিকদের সঙ্গে ধান কাটছলেন গৌরারং ইউনিয়নের কান্দিগাও গ্রামের কৃষক আনিসুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আল্লা যুদি আশা ফুরায়, আমরা ধান কাইট্যা তুলমুই, তুলমু। করোনা উরুনা আমাদের আটকাতে পারবেনা, আগে আল্লা বাদে।’ এখান থেকে সরে গিয়ে দেখি, আরেকটি খলায় পরিবারের লোকজন নিয়ে ধান শুকাচ্ছিলেন গৌরারং গ্রামের কিষাণী প্রমিলা দাস। তিনি বলেন, ‘আমরা এত কষ্ট কইরা ক্ষেত কিষ্টি করছি। এখন যুদি ধান না তুলি বাইচ্চা কাইচ্চা কি কইরা লালনফালন করমু। করোনা আইছে তো আমরা কি করমু। খাইতে অইব, বাঁচতে অইব। ইতার লাগি বাইচ্চা কাইচ্ছা লইয়া সবাই লামি গেছি খলাত।’ দেশের অন্ন যোগানদাতাদের কী করোনাভয় মানায়?

খরচা, জোয়ালভাঙ্গা, দেখার হাওর ও শনির হাওর ঘুরে দেখেছি এবার। প্রতিটি ধানখলাতেই এখন নারীদের প্রোজ্জ্বল উপস্থিতি। যারা সাধারণত ঘর থেকে বের হননা, গুরুজনের সামনে আসেন না, পর্দা করেন তারাও ছুটে আসেন ধানের মায়ায়, ঘরের বউ, ঝি সন্তান সন্ততি নিয়ে। কিছু পুরুষও থাকেন। তবে বিভিন্ন বয়সের নারীদের সংখ্যাই বেশি। গ্রীষ্মের রগচটা সূর্যের খরতাপে ঘেমে নেয়ে বাহু ডুবিয়ে খড় শুকাতে দেন তারা। খলায় শুকাতে দেওয়া ধানে নগ্ন পা ডুবিয়ে নাড়ছেন ধান। দু’পা ডুবিয়ে ধান নাড়া আর বাহু ডুবিয়ে খড় নাড়ার দৃশ্যগুলো অতিপ্রাকৃত অনন্য সুন্দর। কোমল পা ডুবিয়ে ধান নাড়ার দৃশ্যটি নুপুরের নিক্কণ বাজায় অনবরত। এই দৃশ্য দেখে যে কোন মুণিঋষির ধ্যান উবে যাবে মুহুর্তেই। ছায়াহীন খলাপ্রান্তরে সকাল সন্ধ্যা এমন অনন্য দৃশ্য দেখা ধান আহরনের এই মওসুমে। শুধু গৃহস্থ গিন্নীরাই নয়। যে শ্রমিককসকল ধান কাটেন তাদের ধানের ভাগ নিতে খলায় আসেন তাদের বউঝিরাও। তারাও খলার কোণ চেয়ে-চিন্তে ধান শুকান। গফসপ করেন সংসারের খুটখাট বিষয়ে। 

মহামারি করোনা তার দাপট দেখাচ্ছে বিশ্বকে। ভয়ে জরোসরো মানুষ বলতে গেলে এখন প্রায় বন্ধী জীবন যাপন করছেন স্বেচ্ছায়। এই দৃশ্য দেশের প্রধান খাদ্যভা-ার হাওরে বলতে গেলে প্রায় অনুপস্থিত। জীবনধারনের নিয়ামক কৃষক করোনাকে পাত্তা না দিয়েই বছরের আহার সংস্থানে নেমেছেন। বজ্রবৃষ্টি আর কালবৈশাখির চোখরাঙানিকেই তার যত ভয়। তাই দ্রুত ধান কেটে, মাড়াই শেষে শুকিয়ে গোলায় তুলতে রাতদিন পরিশ্রম করছেন তারা। 

হাওরের ধানী জমির চেয়েও এখন সবচেয়ে ব্যস্ত ধানখলা। কৃষকের প্রধান প্লাটফরমে রূপ নিয়েছে। এখানে মওসুম শুরুর আগেই মাঠ পরিষ্কার করে গোবর মাটিতে লেপেমুছে ঝকঝকে তকতকে করেন ঘরনীরা। ধান আহরণ পর্যন্ত প্রায় মাসখানেক সময় প্রতিদিন সকালেই নিয়ম করে গোবরপানিতে শলার ঝারু দিয়ে খলা লেপতে থাকেন। ধানখলার পাশেই একসময় সনাতন পদতিতে হালের গরু দিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যাপী মাড়াই করা হতো। সেই দৃশ্য আজ অনুপস্থিত। এখন এসেছে মাড়াই কল। ধানখলার পাশেই মাড়াই শেষে খলায় ধান শুকাতে দেওয়া হয়। অস্থায়ী খলাঘর তৈরি করে ধান তোলা শেষতক এখানেই থাকেন কৃষক। ধানখলাকে কেন্দ্র করে এসময় এক ভিন্নরকম জীবনযাপন করে কৃষক। বৃষ্টি, শিলা ও কালবৈশাখির সঙ্গে নিয়ত সংগ্রাম করেন ধানখলা ও খলাঘরেই সময় কাটে তাদের। এসময় গৃহিণীদের কাজ বেড়ে যায়। বাড়ির কাজ সামলে বাইরের খলায় এসেও সময় দিতে হয়। শুকানো, নাড়া এবং মাথায় বহনের মতো ভারী কাজও করেন তারা। ঋণগ্রস্থ কৃষক এসময় থাকেন দুশ্চিন্তায়। কারণ মওসুমের শুরুতে সুদে ঋণ (লগ্নি) নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। দাদনের পাকা কথা, খলা থেকেই ধান দিতে হবে। তাই দাদনের লোভী লোকজন লাল চোখ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাদের চোখ হাঁটে খলায় খলায়। সেই লোভী চোখের চাহনী বিদ্ধ করে অসহায় কৃষকের বুক। তাদের সামন থেকেই অর্ধেক মুল্যে বস্তা বস্তা ধান নিয়ে যায়...।

হাওরে এই মওসুমে করোনাকে তোয়াক্কা না করেই দেশের অন্নসংস্থানের নিশ্চয়তার সংগ্রাম করছেন লাখো কৃষক। দেশবাসী দেখেছে ২০১৭ সনে হাওরডুবিতে কিভাবে দেশে হুহু করে চালের দাম বেড়েছিল। জাতীয় জীবনে এসময় সাংঘাতিক প্রভাব পড়েছিল। সরকার হাওরের দেড় লাখ চাষী পরিবারকে পাক্কা এক বছর প্রণোদনা দিয়েছিল। ধান লাগানোর সময় বিনামূল্যে সার বীজ দিয়েছিল। বহুদিন পরে সরকারও বুঝতে পেরেছিল হাওরের গুরুত্ব। তাই এবারও হাওরের জন্য ধানকাটার চার শতাধিক মেশিন দিয়েছে। ফসল রক্ষার জন্য ১৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। দুই দশক ধরে বাইরের শ্রমিক আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিক সংকটে হাবুডুবু খাওয়া কৃষক বিপাকে পড়েছিল। সরকার বিশেষ ব্যবস্থায় লকডাউনের মধ্যে বাইরের জেলা থেকে আরো সাড়ে ১০ হাজার শ্রমিক নিয়ে এসেছে। তাই শেষ পর্যায়ে আছে এবারের ধানকাটা। কৃষি বিভাগের মতে ৩০ এপ্রিল জেলায় ৬১ ভাগ বোরো ধান কাটা শেষ হয়েছে।

হাওর জেলা সুনামগঞ্জে প্রায় সাড়ে তিন লাখ পরিবার বোরো ধানচাষে জড়িত। এ বছর ২ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। প্রায় সাড়ে ১৩ লক্ষ মে.টন চাল উৎপাদিত হবে এই ধান থেকে। যা স্থানীয় চাহিদা ৫ লাখ মে.টন মিটিয়ে আরো উদ্ধৃত্ত থাকবে সাড়ে ৮ লাখ মে.টন। সরকার কিছু কৃষকের কাছ থেকে ১ হাজার ৪০ টাকা মন দরে মাত্র ২৫ হাজার ৮৬৬ মে.টন ধান কিনবে লটারির মাধ্যমে। এই লটারি ও কৃষক নির্বাচন নিয়ে বিস্তার অভিযোগ আছে। প্রতি বছর ফড়িয়ারা সুবিদা নেয় কৃষকের নাম ভাঙ্গিয়ে। স্থানীয়ভাবে কৃষকের কাছ থেকে ধানসংগ্রহের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু সেই দাবি এখনো নিম্ন কণ্ঠের পর্যায়েই রয়ে গেছে। নির্বাচিত কৃষককে অনেক দূর থেকে এনে শহরের গুদামে ধান দিতে হয়। এতে পদে পদে হয়রানির কারণে সুযোগ নেয় ফড়িয়া। স্থানীয় পর্যায়ে খলা থেকেই বিশেষ ব্যবস্থায় ধান সংগ্রহ করা হলে কৃষক ঠকতোনা, ফড়িয়ারাও পেতোনা সুযোগ।

এবারও ধানচাল সংগ্রহে কৃষক ও মিলারদের বরাদ্দে বৈষম্য রয়েছে। মিলারদের কাছ থেকে ২৯ হাজার মে.টন ধান কিনবে সরকার। কৃষকরা বলছেন, খলা থেকেই ধান সংগ্রহ করা হলে প্রকৃত কৃষকরা উপকৃত হতেন। ফড়িয়ারাও সুযোগ পেতনা। সংকট-ভীতি কাটিয়ে ওঠা সংগ্রামী কৃষকের নিম্ন কণ্ঠের ডাক কে শুনবে?

(শামস শামীম, দৈনিক কালের কণ্ঠের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা