kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

Reporterer Diary

মানুষ শাসন পেলেই শৃঙ্খলভাবে চলে!

আব্দুর রাজ্জাক   

২৮ এপ্রিল, ২০২০ ১৮:১৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মানুষ শাসন পেলেই শৃঙ্খলভাবে চলে!

গত ২৬ এপ্রিল বিকালের ঘটনা। অফিস থেকে বাসায় ফিরছি। উত্তরা রাজলক্ষ্মীর সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখি আলাউদ্দিন টাওয়ারের সামনে টিসিবির (ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ) একটি ট্রাকে ন্যায্য মূল্যে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বিক্রি হচ্ছে। অনেক মানুষ এগুলো কিনছে, কিন্তু কোনো রকম দূরত্ব বজায় রাখছে না। জটলা করে আছে। একজন আরেকজনের গায়ে গা ঘেঁষে, এমনকি গলা ধরেও আছে। এমন অবস্থা দেখে বাসায় যেতে মন সায় দিল না। 

জটলার কাছে গেলাম। গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই আপনারা কি করোনাভাইরাস সম্পর্কে জানেন? এক ভদ্রলোক উত্তর দিল। হ্যাঁ জানি। এটা কে না জানে, সবাই জানে। তাহলে এমন জটলা করে আছেন কেন? একটু দূরত্ব বজায় রেখেও তো এগুলো কেনা যায়! বিরক্ত হয়ে ওই ভদ্রলোক বলল, আপনি দাঁড়ান। আপনি দাঁড়ালে বুঝতে পারবেন যে কেন এভাবে দাঁড়িয়েছি। বললাম, ভাই আপনাদের বাঁচাটা জরুরি। দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ালে আপনাদের জন্যই ভালো। এরপর আমি এক এক করে সবাইকে নিরাপদ দূরত্বে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলাম। প্রথমে কেউ যেতে চাইলো না, নানা অজুহাত দেখাল। বুঝিয়ে বলার পর সবাই দূরে সরে যেতে লাগল। লাইনের একজন আমাকে বলল, আপনি চলে গেলে আবার জটলা হবে। বললাম, ঠিক আছে তাহলে আমিও যাচ্ছি না। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলাম।

আমি সাড়ে চারটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিলাম। বিক্রি প্রায়ই শেষ। লাইনে মানুষ আছে অল্প কয়েকজন। হঠাৎ চোখে পড়ল তিনটা লোক একজন আরেকজনের গলা জড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে বললাম, ভাই আমি অফিস করে বাসায় যাচ্ছিলাম। আপনাদের এই জটলা দেখে এখানে দাঁড়িয়েছি। আপনাদের সচেতন করছি, নিরাপদ দূরত্বে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। যেটা আমার করার কথা না, আপনারা নিজে থেকেই করতে পারতেন। আপনারা একজন আরেকজনকে জড়িয়ে আছেন। আপনারা কি নিরাপদ থাকতে চান না? এদের মধ্যে একজন আমাকে বলল, আমরা তিনজন একই পরিবারের, কোনো সমস্যা নেই। বললাম, একই পরিবারের হলে যে করোনা ছড়াবে না এমন নিশ্চয়তা দিতে পারবেন? লোকটা খেপে গিয়ে আমাকে বলল, কে আপানি? আপনার বাসা কোথায়? আমার দিকে মোটামুটি তেরে আসল। আমি তাকে আর কিছু বললাম না, হতাশ হয়ে বাসায় চলে আসলাম।

উত্তরা আলাউদ্দিন টাওয়ারের সামনে যেভাবে জটলা করে টিসিবির পণ্য বিক্রি হচ্ছে। ঠিক একই চিত্র দেশের অন্যান্য জায়গাও দেখা গেছে। করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা বলছে, একজন ব্যক্তিকে আরেকজনের থেকে নূন্যতম তিন ফিট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। অথচ এই মানুষগুলো আধা ফিট দূরত্বও বজায় রাখতে চায় না। এমন নয় যে যারা টিসিবির পণ্য কিনছে, তারা সবাই অশিক্ষিত। তাদের মধ্যে অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিও রয়েছে। তারা বর্তমান করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে খুব ভালো করেই জানে, কিন্তু মানে না। আবার অনেক জায়গায় প্রশাসনের মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্য দেওয়া হচ্ছে, সেখানে ঠিকই মানছে। তাহলে দেখুন মানুষ নিজে থেকে সচেতন থাকতে চায় না, যদি প্রশাসন বাধ্য না করে। মানুষের এমন মনোভাবের কারণ কী? এর একটি কারণ হতে পারে ‘শাষণ’। মানুষ শাসন পেলেই শৃঙ্খলভাবে চলে। স্বাধীনতা দিলে বিশৃঙ্খল হয়ে যায়। মানুষের এই বিশৃঙ্খলার একটি কারণ হলো শোষণ-বঞ্চনা। ব্রিটিশরা প্রায় দুই শ বছর এ দেশের মানুষকে শোষণ করেছে। ব্রিটিশরা যা বলেছে তাই করেছ এ দেশের মানুষ। এরপর প্রায় ২৪ বছর পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-বঞ্চনার শিকার হয়েছে। এখন আর মানুষ শোষণ-বঞ্চনার শিকার হতে চায় না। মানুষ মনে করে শৃঙ্খলভাবে চললেই প্রতারণার শিকার হতে হবে। তার ন্যায্য অধিকার সে পাবে না। তাই তো তারা বিশৃঙ্খলভাবে থাকতে পছন্দ করে। তারা এতেই অভ্যস্ত।

সে যাই হোক, দেশে একটা মহামারি চলছে। মানুষকে তো সচেতন হতেই হবে। নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে। না হলে এ দেশ করোনামুক্ত তো হবেই না বরং আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। তাই সময় থাকতে সবাইকে সচেতন হওয়া জরুরি। বিশেষ করে টিসিবি কতৃপক্ষর, তাদের ডিলারদের আরো সতর্ক করা দরকার। তারা যেন ক্রেতাদের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পণ্য বি্ক্রি করে।

- আব্দুর রাজ্জাক, পড়ালেখা বিভাগ, কালের কণ্ঠ। 



সাতদিনের সেরা