kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ আষাঢ় ১৪২৭। ২ জুলাই ২০২০। ১০ জিলকদ  ১৪৪১

Reporterer Diary

করোনার কান্না

ফারজানা লাবনী    

১৬ এপ্রিল, ২০২০ ২২:৫৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনার কান্না

‘আপা আমার ছেলেটাকে বিদেশ পাঠাতে চাইনি। দেশে ভর্তি করেছিলাম। র‌্যাগিংয়ের অত্যাচারে আমার শান্ত স্বভাবের ছেলেটা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। এক বছর লস দিয়ে বাধ্য হয়েই বিদেশে পড়তে পাঠিয়েছি। আমেরিকায় করোনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে! প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। টিকিট কেটেও বিমানে উঠতে পারল না ছেলেটা। করোনার কারণে সব ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। ছেলেটা আমার কাছে আর কোনো দিন আসতে পারবে কি-না জানি না। আপা আমার হাই প্রেসার। ওষুধ খেলেও কমছে না।’ লতা আপা আমাকে মোবাইলে কোনো রকমে এই কথাগুলো বলে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কান্নায় তার কথা আটকে যাচ্ছে।  

লতা আপার একমাত্র ছেলে জাওয়াদ। করোনার মধ্যে আমেরিকায় আটকা পড়েছে। বাংলাদেশে আসার জন্য কাতার এয়ারলাইন্সের টিকিট কাটে। চেকিং, ইমিগ্রেশন, বোডিংসহ সব কাজ শেষ করে রওনা হওয়ার আগ মুহূর্তে জানানো হয় বিমান যাবে না। টিকিটের মূল্য ফেরত না দিয়ে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার যখন বিমান চলবে এই টিকিটে যেতে পারবে।

লতা আপা মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে বললেন, ‘জাওয়াদ সব ফর্মালিটিজ শেষ করে বিমানে ঢুকবে এমন সময় এয়ারলাইন্স জানিয়েছে করোনার কারণে বিমান ছাড়বে না। টিকিটের দামও ফেরত দিচ্ছে না। আমার ছেলে এয়ারপোর্টেই বসে আছে। ওর কাছে খুব সামান্য ডলার আছে’। আমি বললাম, জাওয়াদকে ওর ইউনিভার্সিটির (বিশ্ববিদ্যালয়) সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। তাদের বুঝিয়ে বলা ছাড়াত কোনো উপায় দেখি না।

আপা জানালেন, ইউনিভার্সিটি থেকে দু’টি ফরম দিয়েছিল, একটি দেশে আসলে পূরণ করতে হবে। অন্যটি আমেরিকায় থাকলে পূরণ করে জমা দিতে হবে। জাওয়াদ চলে আসবে বলে দেশে আসার ফরমটি পূরণ করে জমা দিয়েছে। অন্যটি ফেরত দিয়ে দিয়েছে। এখন আমেরিকায় রাত। সকাল না হলে কিছু করা যাবে না। সারা রাত এয়াপোর্টেই থাকতে হবে। আমি লতা আপাকে বললাম, ওর লোকাল (স্থানীয়) গার্জিয়ানকে জানানো হয়েছে?

জাওয়াদের আমেরিকায় আত্মীয় না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থানীয় একটি মহিলাকে অভিবাবক হিসেবে মনোনিত করেছে। লতা আপা বললেন, ‘হ্যাঁ, জাওয়াদ জানিয়েছে। কিন্তু করোনার কারণে জাওয়াদকে তার বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেয়নি।’ আমি বললাম, ‘আপা আল্লাহ্কে ডাকেন।’ 

আমেরিকার ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং প্রথম বর্ষে পড়ে জাওয়াদ বিন মুশফিক। লতা আপার এই একটিই ছেলে। জাওয়াদ এ লেবেল শেষ করে দেশেই একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়রিং এ ভর্তি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় প্রতিদিনই তাকে র‌্যাগিং করা হতো। স্বভাবে শান্ত জাওয়াদকে একদিন আটকে রেখে একের পর এক সিগারেট টানাতে থাকে, কান ধরে উঠ বস করানো হয়। জাওয়াদের অ্যাজমার সমস্যা। র‌্যাগিং এ ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে।

খরব পেয়ে লতা আপা ও কাজল ভাই (লতা আপার স্বামী) ছেলেকে এনে হাসপাতালে ভর্তি করেন। জাওয়াদ শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠলেও র‌্যাগিংয়ের কারণে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে কি করা উচিত আত্মীয় ও পরিচিতজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে বিদেশে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে শেষ পর্যন্ত ৮০ ভাগ স্কলারশিপ পেয়ে আমেরিকার ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পায় জাওয়াদ।

করোনা সংক্রমণ রোধে আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ প্রায় সারা বিশ্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। করোনা সংক্রমণ রোধে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হবে জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আবাসিক হলগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের নিজের বাড়ি-ঘরে চলে যেতে বলেছে।   

লতা আপার সঙ্গে চার বছর আগে পরিচয়। অনেকবার মোবাইলে কথা হয়েছে। একটিবারের জন্যও আজকের মতো করে কথা বলেননি। প্রত্যেকবার প্রথমে জানতে চেয়েছেন কেমন আছি, কেমন চলছে সবকিছু। এরপর অন্য কথা। লতা আপা বেশ শক্ত মানুষ। সহজে ভেঙে পড়েন না। যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলিয়ে নিতে দেখেছি। আমি রাত ১২টার দিকে লতা আপাকে ফোন দিয়ে জানতে চাইলাম, আপা জাওয়াদের কি খরব? আপা জানালেন, ইউনিভার্সিতে জানানো হয়েছে। এখনো সেখান থেকে কোনো খবর আসেনি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, জাওয়াদের শরীর কেমন আছে? ওর বন্ধুদের মধ্যে কারো সঙ্গে কি যোগাযোগ হয়েছে? 

আপা বললেন, ‘ওর সব বন্ধু, পরিচিতজনরা ইউনিভার্সিটি ছেড়ে যার যার বাড়ি চলে গিয়েছে। ও একা আসতে পারিনি। আমার নরম মনের ছেলেটা বেশ ভেঙে পড়েছে। কান্নাকাটি করছে। রাত থেকে এখন দুপুর পর্যন্ত না খেয়ে আছে।’ আমাদের কথাবার্তা এ পর্যন্ত চলে। পরের দিন সকালে লতা আপাকে আবারো ফোন দিয়ে জানতে চাই কি খবর? 

উত্তরে লতা আপা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই পরিস্থিতিতে জাওয়াদকে আপতত ওর হলে ফিরে যেতে বলেছে। তারা অনলাইনে ওকে অনুমতিপত্র পাঠিয়ে দিয়েছে। জাওয়াদ চলে আসবে বলে আবাসিক হলের স্টোরে ওর বালিশ, কাপড়চোপড়সহ অন্যান্য মালপত্র রেখে এসেছিল। হলে গিয়ে স্টোর থেকে এসব বের করে রুমে এনেছে। সারা ডরমে শত শত শিক্ষার্থী থাকলেও এখন আছে মাত্র ৪০ জন। জাওয়াদ যে ফ্লোরে থাকে সেখানে ও ছাড়া আর কেউ নেই।’

আমেরিকায় হাসপাতালগুলো ভরে উঠেছে করোনা রোগীতে। চারদিকে যেন মৃত্যুর হাতছানি। প্রতিদিন বাড়ছে লাশের মিছিল। বন্ধু, পরিচিতজন ছাড়া রুমে পৌঁছানোর পর লতা আপাকে ভিডিও কল করে খুব কান্নাকাটি করেছে জাওয়াদ। আপা কথা বলতে বলতে কেঁদে উঠলেন। আমি মোবাইলের এ প্রান্ত থেকে বললাম, আপা শান্ত হন। প্লিজ শান্ত হন। ইনশাআল্লাহ্ সব ঠিক হয়ে যাবে। জাওয়াদের সামনে কাঁদবেন না। ওকে মনের জোর দিন।

লতা আপা বললেন, ‘না, না, আমি ওর সামনে কাঁদেনি। আমার ছেলেটার খুব মন খারাপ। দেশে আসার জন্য অস্থির হয়ে আছে।’ লতা আপা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার কোনো অত্মীয়-স্বজন আমেরিকায় নেই। যার কাছে গিয়ে ছেলেটা থাকবে। জানতে চাইলাম, আপা খাওয়া দাওয়ার কি অবস্থা? কিছু শুকনা খাবার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দিয়ে যাচ্ছে। তাই দিয়ে চলে বলে জানালেন তিনি।

জাওয়াদের অ্যাজমা রোগ আছে। এ রোগের কারণে বাংলাদেশে থাকতে অনেকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। শ্বাসকষ্ট শুরু হলে বিশেষ কিছু ওষুধ খেতে হয়। দেশ থেকে আমেরিকা যাওয়ার সময় এসব ওষুধ সঙ্গে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। লতা আপা নিজেই বললেন, ‘সবচেয়ে টেনশনে আছি ওর ওষুধ নিয়ে। আপনিত জানেন ওর শ্বাসকষ্ট আছে। মাত্র তিনটা ওষুধ ওর কাছে আছে। দেশ থেকে আমাদের পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু কিভাবে পাঠাবো? সব বন্ধ। এ পরিস্থিতিতে বাইরে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ আনা খুব জটিল ব্যাপার। ওর শ্বাসকষ্ট উঠলে আমেরিকাতে করোনা না ভেবে বসে।’ 

লতা আপা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘নিঃসঙ্গ ছেলেটা আমার থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এখন। খেয়ে না খেয়ে আছে। কবে আসতে পারবে জানি না। জাওয়াদ বলেছে, আম্মু ভাগ্যে থাকলে আবারো দেখা হবে! কবে ছেলেটাকে আবার বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবো?’

করোনায় সব ওলট পালট! সারা বিশ্ব এখন নতুন হিসাব কষছে। এই পরিস্থিতিতে কি বলে সান্ত্বনা দেব একজন মাকে? মোবাইলটা রেখে দিলাম।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা